বাইসানগারের কথা যদিও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না, কিন্তু বাবর অবাক হয় না। তার বার্তাবাহকদের বাধা দেয়া হয়েছে জানতে পারার পরে থেকেই সে জানতো এমন কিছু হওয়াটা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। হীরাতে তার আত্মীয়কে যদি সময়মতো সতর্ক করা যেতো তাহলে কি হতো? তাদের পশ্চিম দিকে বিস্তৃত সংস্কৃতিবান, খোলামেলা অপূর্ব সুন্দর প্রাসাদ, প্রাচীন মসজিদ আর মাদ্রাসাগুলো সহসা যেনো একটা ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। বাবরের মরহুম আব্বাজান কখনও কখনও এইসব দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়দের ব্যাপারে আলাপ করতো, বহুদূরে বসবাস করার কারণে তিনি কখনও তাদের সাথে দেখা করতে যাননি। তাদের আরামপ্রীতি, সৌন্দর্যের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি, তাদের পুরুষসুলভ আগ্রাসী মনোভাব আর লড়াকু কুশলতার কমতি নিয়ে তিনি ব্যঙ্গ করতেন এবং তাদের সংস্কৃতিমনা দরবারের দৈন্যতা নিয়ে রসিকতা করতেন-যেখানে একজন দক্ষ যোদ্ধার চেয়ে লেখককে বেশি মর্যাদা দেয়া হয় এবং কবির দল যুদ্ধে জয়লাভ নিয়ে কাব্য রচনা না করে, রসাল সুপক্ক হাঁসের মাংস কিংবা “জীবন বারি” হিসাবে পরিচিত সুরা পানের আনন্দ নিয়ে সাহিত্য রচনায় ব্যস্ত।
কিন্তু তারা কি আসলেই এতোটাই মূর্খ ছিলো? বাবর ভাবে। এতদিন তারা তাদের কমনীয় জীবনযাপন বজায় রাখতে পেরেছিলো। সমরকন্দ, খোরাসান, ফারগানা, কুন্দজ উজবেকদের পদানত হবার পরে তৈমূর বংশীয় শাসকদের ভিতরে কেবল সেই এখন পর্যন্ত জীবিত রয়েছে ভেবে সে চমকে উঠে। একটা বিশাল দায়িত্ব একটা পবিত্র বিশ্বাস রক্ষার দায়িত্ব এখন তার উপরে অর্পিত হয়েছে। তার সেনাবাহিনীর অবস্থা যাই হোক, রসদের সরবরাহ থাকুক বা না থাকুক, তৈমূরের সাম্রাজ্যের টিকে থাকা অংশটুকু রক্ষা করতে বা সেটা করতে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে দেহরক্ষা করতে হলেও তাকে অবিলম্বে সাইবানি খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করতে হবে।
শাহী পরিবার, বিশেষ করে এর রমণীদের উপরে উজবেকদের- যা সম্ভবত সত্যি তাদের প্রকৃতির সাথে সেটা মিলে- অত্যাচারের বিষয়টা আবারও তাকে খানজাদার কথা ভাবতে বাধ্য করে। সে কি এখনও বেঁচে আছে? সে এতোদিন নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করেছে যে, মৃত খানজাদার চেয়ে জীবিত খানজাদা দরকষাকষির ক্ষেত্রে অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। আম্মিজানকে সাহস দিতে সে এই কথাটা তাকে বারবার বলেছে। নিজের মা মারা যাবার পরে, খুতলাঘ নিগার এখন পূর্বের চেয়ে আরও বেশি করে বিশ্বাস করতে চান যে, তিনি আবার খানজাদাকে দেখতে পাবেন। সে তাকে কখনও তার ভয়ঙ্কর ভাবনার কথা বলতে পারবে না যে ছেলেবেলায় সমরকন্দে সে যে নির্যাতন সহ্য করেছিলো, তার প্রতিশোধ নেবার স্পৃহা কখনও প্রশমিত হবার নয়। আর সে নির্যাতন করাটাকে গৌরবের বিষয় বলে মনে করে এবং তৈমূরের বংশের একজন শাহজাদীকে কলঙ্কিত করাটা সে বস্তুত পক্ষে উপভোগই করবে।
“সুলতান…” বাইসানগারের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বরে বাবরের বিক্ষিপ্ত ভাবনার জাল ছিন্ন হয়।
বাবর নিজেকে সংবরণ করে। “আমি সাইবানি খানের কাবুল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবো না। আগামী সপ্তাহে আমরা আমাদের সেনাবাহিনী যে অবস্থায় আছে তাই নিয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবো। আমাদের বর্তমান সৈন্য সংখ্যা এখন কতো?”
“প্রায় আট হাজার।”
উজবেক পঙ্গপালের সাথে কোনোমতেই তুলনীয় না সংখ্যাটা। কিন্তু এসান দৌলত সব সময়ে কি যেন বলতেন?: “যতক্ষণ শ্বাস নিতে পারছো ততক্ষণ হতাশ হয়ো না।”
“সাইবানি খানকে মোকাবেলা করার জন্য আমি এতোদিন ধরে মনে মনে যা ভেবে এসেছি সময় হয়েছে সেটাকে কার্যকরী করার। বার্তাবাহকদের এই মুহূর্তে রওয়ানা হতে বললা- আজ রাতেই সব গোত্রের কাছে, কাফিররাও বাদ যাবে না, তাদের পাঠাও। যারা আমার সাথে এই অভিযানে সামিল হবে তাদের আগামী পাঁচ বছর ফসল আর গবাদি পশুর জন্য কোনো খাজনা দিতে হবে না এবং আমিও তাদের ভালোই পারিশ্রমিক দেব। হিরাতে কি হয়েছে তাদের জানাবে এবং এটাও বলবে যে সাইবানি খান আমাদের সবার শত্রু। উজবেক না এমন সবার সে বিনাশ করবে…”
সেই রাতে, কেবল বাবুরীর সাহচর্যে সে দূর্গপ্রাকারের ছাদে আরোহন করে। স্থানটা তার খুব প্রিয় এবং সাধারণত তার মনকে প্রশান্ত করে তুলে। নিচের তৃণভূমি, যাযাবর পশুপালক আর বণিকের দল রাতের খাবার তৈরির প্রস্তুতি গ্রহণ করতে, রান্নার আগুনে অন্ধকারের মাঝে মাঝে লালচে আভা ফুটে রয়েছে। বাবর তাদের হাসি আর গল্পের আওয়াজ, ভেড়ার নাক ঝাড়া আর উটের কাশির শব্দ শুনতে পায়। দূরে, প্রতিরক্ষা দেয়ালের শক্তিশালী ব্যুহের পেছনে কাবুল শব্দহীন পড়ে আছে। শহরের নাগরিকদের মনে এই মুহূর্তে কি ভাব খেলা করছে? পশ্চিম থেকে আগত সওদাগরী কাফেলা নিশ্চয়ই বাণিজ্য দ্রব্যের সাথে সাথে গুজবও বয়ে আনছে। শহরের মানুষ এতোদিন খোরাসানের বিপর্যয়ের কথা জেনে গিয়েছে। আর এবার সাইবানি খান তাদের শহরের অভিমুখে এগিয়ে আসবে।
বাবুরীকেও বিষণ্ণ দেখায়।
“তোমার আবার কি হলো?” বাবর সহসা আগ্রহী হয়ে উঠে।
“আমি ভাবছিলাম আজ থেকে একমাস বা এক বছর পরে আমরা কি অবস্থায়। থাকবো…”।
“তার মানে তুমি বলতে চাইছো যে আমরা বেঁচেবর্তে থাকবে কিনা?”
