নানীজানকে ছাড়া জীবন সে কল্পনাই করতে পারে না। তাদের সবচেয়ে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে তিনিই পুরো পরিবারটার হাল ধরে ছিলেন। যুক্তি আর প্রজ্ঞা সর্বোপরি সাহস দিয়ে তিনি তাদের আগলে ছিলেন। শীঘ্রই সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতার মুখোমুখি হবে, আর এখনই তিনি চলে গেলেন। সে কিশোর বয়সে তার সাথে কথোপকথনের কথা ভাবে: “নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কখনও ভয় পাবে না। সাহস নিয়ে তার মোকাবেলা করে, তাদের অর্জন করবে। মনে রাখবে, কোনো কিছুই অসম্ভব না…”।
বাবরের একটা ইশারায়, তার নানীজানের প্রিয় তিন পরিচারক- তিনজনের পরনেই তার মতো কালো শোকের আলখাল্লা- নিচু হয় এবং বাবরের সাথে, শবাধারের একটা পায়া কাঁধে নেয়। কাঁধের উপরে তুলে নিয়ে, তার মহলের অন্ধকার, বাঁকান সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে বয়ে নিয়ে খুতলাঘ নিগারের ফোঁপানির শব্দ, তাদের পেছন থেকে ভেসে আসে- উজ্জ্বল লাল কাপড়ে মোড়ানো ঘোড়ায় টানা গাড়ির সমতল পাটাতনে এনে রাখে। এসান দৌলত লাল রঙ পছন্দ করতেন, বলতেন এটা তার শ্রদ্ধেয় পূর্বপুরুষ: চেঙ্গিস খানের রঙ।
বাবর তার সেনাপতি, মোল্লার দল আর আমাত্যদের নিয়ে এসান দৌলতকে তার শেষ বিশ্রামের স্থলে বয়ে নিয়ে যাওয়া গাড়িটা অনুসরণ করে। সে তার আম্মিজানের সম্মতি নিয়ে তাকে পাহাড়ের ধারে তার ফুল, ফল আর ঝর্ণাধারায় সুশোভিত বাগানে সমাধিস্ত করবে বলে ঠিক করেছে। তাকে উর্বর অন্ধকার মাটির গর্ভে শেষবারের মতো শুইয়ে দিয়ে, তার আত্মার শান্তির জন্য মোনাজাত শেষ হতে বাবর অন্তেষ্টিক্রিয়ায় আগত লোকদের দিকে তাকায়। এখানে যিনি শায়িত আছেন, তিনি ছিলেন চেঙ্গিস খানের কন্যা। তার সাহসিকতা ছিলো প্রবাদপ্রতীম। যিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন হতাশা একটা পাপ। আমি তার কথা কোনোদিন ভুলব না। আর একদিন যখন আমি আমার শত্রুদের পরাস্ত করতে পারবো, সেদিন এখানে এসে তাকে শুনিয়ে যাবো আমি কি অর্জন করেছি, আর তার আশীর্বাদ চাইবো।”
***
এসান দৌলত, হিরাতে তাদের শাহী আত্মীয়ের উপরে আপতিত হওয়া ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের কথা জানবার আগেই ইহকালের মায়া ত্যাগ করেছেন। বাবর কয়েক সপ্তাহ পরে অবিশ্বাসের সাথে বাইসানগারের কথা শুনতে শুনতে ভাবে।
“সুলতান, এটাই বাস্তব। উজবেকরা হিরাত দখল করে নিয়েছে। ত্রিশ হাজার যোদ্ধার একটা বিশাল বহর নিয়ে সাইবানি খান মুখতার পাহাড়ের ঢালে তাণ্ডব সৃষ্টি করেছে। শাহী পরিবার আলা কোগরান দূর্গে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু সুলতানের ডেকে পাঠানো অতিরিক্ত সৈন্যবাহিনী তার সাহায্যে পৌঁছাবার আগেই তাদের পরাস্ত করা হয়েছে।”
“শাহী পরিবারের কি খবর?”
বাইসানগার উত্তর না দিয়ে ঠোঁট কামড়ে থাকে। “সাইবানি খান দূর্গ অবরোধ করেছিলো এবং দূর্গের কাছে অবস্থিত ঘোড়ার বাজার থেকে সিঁধ কাটার ফলে দেয়ালের অংশ বিশেষ ধ্বসে পড়ে। ফাটল দিয়ে উজবেক বর্বরের দল পিলপিল করে ভেতর প্রবেশ করেছিলো। তারা শাহী পরিবারের সব পুরুষ সদস্যদের, এমন কি তাদের জীঘাংসার হাত থেকে ছোট ছেলেটাও বাদ যায়নি, নির্বিচারে হত্যা করেছে। সাইবানি খান নিজে ছোট ছেলেটার গোড়ালী ধরে শস্য মাড়াইয়ের মতো শাহী কবরের পাথরের দেয়ালের উপরে তার মাথা আছাড় মেরেছে। মগজ ছিটকে পাথরের গায়ে লেগেছে। আর তারপরে তার প্রাণহীন দেহটা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যদের লাশের স্তূপে ছুঁড়ে ফেলেছে। সে এরপরে লাশগুলো ভিতরে রেখে পুরো দূর্গ জ্বালিয়ে দেবার আদেশ দেয়…”
“আর মহিলাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে?”
“সবাই বলাবলি করছে আলা কোগরান দূর্গে যাদের লুকিয়ে থাকা অবস্থায় তারা খুঁজে পেয়েছিলো- হোক সে কিশোরী বা বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে আসা বৃদ্ধা দাদীমা-সবাইকে জোর জবরদস্তি নগ্ন করে বিজয় উদযাপনের ভোজ সভায় মাতাল দখলদারদের সামনে এমন ভঙ্গিতে নাচতে বাধ্য করা হয়েছে, যে উজবেক সর্দাররা সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটার সান্নিধ্য পাবার জন্য নিজেদের মধ্যে কুকুরের মত খেয়োখেয়ি শুরু করেছিলো এবং কেউ কেউ নাকি ভূড়িভোজ শেষ হবার আগেই প্রকাশ্যে নিজেদের লালসা চরিতার্থ করতে আরম্ভ করে দিয়েছিলো।”
বাবর তার হাতের মুঠো এমন শক্ত করে বন্ধ করে যে মনে হয় তার গাঁটগুলো বুঝি ত্বক ফেটে বের হয়ে আসবে। “আর হিরাতের কি খবর?”
বাইসানগারের সচরাচর শান্ত মুখমণ্ডলে একটা কষ্টের অনুভূতি খেলে যায়। “উজবেকরা শহরে নির্বিচারে লুটপাট করেছে। সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করে তাদের স্ত্রীদের ধর্ষণ করেছে এবং তাদের ছেলেমেয়েদের ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করেছে। আমার যে ভাইয়ের কাছে মাহাম মানুষ হয়েছিলো, তিনি মারা গেছেন। সাইবানি খানের নির্মমতার থাবা থেকে শহরের শিক্ষক আর লেখকরাও রেহাই পায়নি। হিরাতের মাদ্রাসার ভাগ্যবান কয়েকজন শিক্ষককে আজ যে কাফেলাটা এসে পৌঁছেছে, নিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন কবি- বলেছেন গ্রন্থাগারে রক্ষিত সব পাণ্ডুলিপি নষ্ট করে ফেলা হয়েছে এবং সাইবানি খানের নির্দেশে তার হাতে ধরা পড়া এক পণ্ডিতকে ছেঁড়া কাগজের টুকরো গিলতে বাধ্য করা হয়েছে যতক্ষণ না বেচারা শ্বাসরুদ্ধ হয়। আর পুরোটা সময় তাকে ক্রমাগত জিজ্ঞেস করা হয়েছে, “কবিতা খেয়ে বেঁচে থাকতে কেমন লাগছে?”
