“সাইবানি খান।”
বাবর নির্বাক তাকিয়ে থাকে। তারপরে সম্বিত ফিরে পেতে সে মঞ্চ থেকে লাফিয়ে নেমে এসে মির্জা খানের কাধ ধরে প্রচণ্ড ঝাঁকি দিয়ে তার মুখের উপরে চিৎকার করে ওঠে। “সেই উজবেক বর্বরটা, সাইবানি খানের সাথে তুমি হাত মিলিয়েছে আমাদের বংশের জানের শত্রু?”
“সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমার যে জমিদারি সে দখল করেছে সেটা ফিরিয়ে দেবে। আপনার দরবারে শোভাবর্ধক হিসাবে না, সে আমাকে যথার্থ মর্যাদা দেবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। আমি তাকে জানিয়েছিলাম আপনি খোরাসানের সুলতানের সাথে মৈত্রী চুক্তি করার চেষ্টা করছেন। সে সেটা থামাতে চেয়েছিলো। সাইবানি খান প্রথমে খোরাসান, পরে আপনাকে আক্রমণ করবে বলে ঠিক করেছে, আমার সুলতান। সুলতান, আপনি আমাকে এখন তার বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসাবে নিয়োগ করতে পারেন…সাইবানি খান আমাকে বিশ্বাস করে। আপনার পছন্দমাফিক আমি যে কোনো বার্তা তাকে পাঠাতে পারবো…আমরা সম্ভবত তাকে এভাবে ফাঁদেও ফেলতে পারি।”
লোকটার এই নির্লজ্জ কাকুতি মিনতি তার নিঃশ্বাসের সাথে ভেসে আসা বমির গন্ধের মতোই বাবরের গা গুলিয়ে তোলে। সে তার কাঁধ ছেড়ে দিয়ে পেছনে সরে আসে। “এই বিশ্বাসঘাতককে আমার সামনে থেকে নিয়ে যাও এবং দূর্গ প্রকারের উপর থেকে মাথা নিচের দিকে করে তাকে ছুঁড়ে ফেলল। তাতেও যদি ব্যাটা না মরে, তবে আবার তুলে এনে আবার নিচে ছুঁড়ে ফেলবে। তারপরে তার শবদেহটা বাজারের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে যাতে চিল কুকুর তার লাশটা ভক্ষণ করে।”
“সুলতান বখশ দেন…” মির্জার পায়ের নরম চামড়ার নাগরা উষ্ণ হলুদ প্রস্রাবে ভিজে উঠে এবং ধীরে ধীরে পাথরের মেঝেতে একটা ছোটখাট জলাশয়ের জন্ম। দেয়। সে সহসা আবার বমি করে এবং বমির সাথে যোগ হওয়া নতুন আরেকটা গন্ধ বাবরকে বলে যে মির্জা খানের উদর আর তার নিয়ন্ত্রণাধীন নেই।
“বেল্লিকটাকে আমার সামনে থেকে নিয়ে যাও!” বাবর দরবারের প্রহরীকে চিৎকার করে আদেশ দেয়। “আমার আদেশ যেনো এখনই কার্যকর করা হয়।”
এক ঘণ্টা পরে, বাবর কাফিরদের প্রাণদণ্ডাদেশ কার্যকর করা দেখতে বের হয়। তার লোকদের সাথে হারামজাদারা এমন আচরণ করেছে যে, সে বিশ্বাসঘাতকদের জন্য সবচেয়ে পুরাতন আর ভীতিকর শাস্তি তাদের জন্য বরাদ্দ করেছে। শহরের দেয়ালের নিচে তাদের তীক্ষ্ণ কাঠের দণ্ড, যাকে অনেক স্থানে শূল বলে, তাতে বিদ্ধ করা হবে। নগরদূর্গে তাদের মরণ চিৎকার পৌঁছাবে না। সে এজন্যই কৃতজ্ঞ। মাহাম, খুতলাঘ নিগার বা তার নানীজান যেনো তাদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মরণ চিৎকার শুনতে না পায়। যদিও এখন সে ভাবে, এসান দৌলত সম্ভবত তার মতোই চোখের পলক না ফেলে পুরো ব্যাপারটা তাকিয়ে দেখতে পারবে।
মির্জা খানের প্রতি তার ক্ষোভ আর তার লোকদের সাথে এমন নির্মম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনের জন্য কুফরীদের প্রতি তার ক্রোধের কারণে সে কোনো ধরণের করুণা প্রদর্শন করে না। সে তাকিয়ে দেখে সাজাপ্রাপ্ত লোকগুলোকে ন্যূনতম কাপড় পরিহিত অবস্থায় অপেক্ষমান শূলের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জল্লাদের দল তাদের জোব্বার উপরে চামড়ার তৈরি কালো আলখাল্লা জড়িয়ে রেখেছে- যা শীঘ্রই রক্তে লাল হয়ে উঠবে- মুরগী ধরার মতো একজন একজন করে বন্দিদের শূলে উঠাচ্ছে। কোনো কোনো বন্দির পায়ুপথে শূলের তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ প্রবিষ্ট করান হয়। আবার কাউকে শহরবাসীদের বুনো উল্লাসের ভিতরে শিককাবারের মতো আড়াআড়ি গাথা হয়। বাবর শহরবাসীর দোষ দেখে না- প্রতিবার যন্ত্রণাক্লিষ্ট দেহের নরম মাংসে তীক্ষ্ণ শূল গেথে গিয়ে রক্ত ঝিটকে বের হলে, সন্তুষ্টি ছাড়া সে আর কিছুই অনুভব করে না। সে মির্জা খানকেও একই শাস্তি পারলে দিতো- কেবল রাজপরিবারে জন্ম হওয়াতে বেজন্মাটা বেঁচে গেছে।
সেই রাতে বাবর একেবারে মনমরা হয়ে থাকে। হুমায়ূন আর তার সদ্য জন্ম নেয়া ভাই কামরানকে, যার মাথা ভর্তি ঝাড়র মতো কালো চুল একেবারে ড্যানডেলিয়ন ঔষধি গাছের পাতার মতো কোমল, পাশাপাশি শুয়ে থাকতে দেখেও-দু’মাস আগে গুলরুখের গর্ভে জন্ম নিয়ে এখনই বেশ শক্ত করে বাবরের বুড়ো আঙ্গুল আঁকড়ে ধরতে পারে- তার চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে না। এমনকি মাহামের কামাতুর দেহের উষ্ণ আমন্ত্রণ সেদিন তার আসন্ন বিপদের পূর্বানুভব কাটাতে পারে না। সে প্রস্তুত থাকুক বা না থাকুক একটা ঝড় আসছে। গৌরবান্বিত বিজয় আর অমর খ্যাতি এবং পরাজয় আর বিস্মৃতির অতলে অখ্যাত মৃত্যু। কেবল তারই না তার পুরো পরিবারের, নির্ভর করছে তার সিদ্ধান্তের উপরে যা নিতে সে শীঘ্রই বাধ্য হবে…
*
এক মাস পরে, বাবরের পরিবারে বয়ে আসা দৈবদূর্বিপাক নিজের উপস্থিতি এমন এক আঙ্গিক থেকে জানান দেয় যা তার অসম্ভব কল্পনাতেও ছিলো না। শবযানের কাঠের পাটাতনে শুয়ে থাকা এসান দৌলতের মৃতদেহটা একেবারে বাচ্চা একটা মেয়ের মতো দেখায়। কর্পূর পানির তীব্র গন্ধ তার পরিচারিকার দল যা দিয়ে তাকে শেষবারের মতো গোসল করিয়েছে। তার মামূলী সুতির কাফন ভেদ করে যেনো উঠে আসে। বাবর ঝুঁকে তার নানীজানের মৃতদেহের দিকে তাকাতে, সে নিজের অশ্রু সংবরণ করতে পারে না। কিভাবে যেনো তার মনে হয়েছিলো নানীজানের মানসিক শক্তি আর একাগ্রতার বরাভয় বুঝি আজীবন সে লাভ করবে। কোনো শেষ ইচ্ছার কথা না বলে- না কোনো শেষ আদেশ, কোনো বিচক্ষণ পরামর্শ ছাড়াই ঘুমের ভিতরে সহসা এমন প্রশান্তিময় মৃত্যুর ধারণাটাই তার অগ্রহণযোগ্য অবাস্তব মনে হতে থাকে। কিন্তু গত কয়েক মাসের কথা চিন্তা করতে, এখন সে বুঝতে পারে অনেক আগে থেকেই তিনি তাকে ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছিলেন- অনিশ্চয়তা আর অস্পষ্টতা এবং এস্তব্যস্ততার একটা প্রবণতা যা আগে কখনও তার ভিতরে লক্ষ্য করা যায়নি। তার স্মৃতি কেমন যেনো বিক্ষিপ্ত আচরণ করছিলো- বাবরের শৈশবের কথা তিনি প্রাঞ্জল স্পষ্টভাবে বলতে পারতেন। কিন্তু কেউ যদি তাকে বেমক্কা প্রশ্ন করতে গতকাল তিনি কি করেছেন, তাহলেই অনিশ্চয়তার মেঘ এসে তাকে ঘিরে ফেলতো।
