বাবুরী সর্দারকে সেখানে কবন্ধ করার উদগ্র বাসনা অনেক কষ্টে দমন করে। সর্দারের গোড়ালীর সাথে কব্জি দেহের পেছনে টেনে মুরগী বাঁধার মতো বাঁধে। আর বাকী কুফরী যাদের সে খুঁজে পায় সবাইকে খেদিয়ে নিয়ে কাবুলের দূর্গপ্রাসাদে। নিয়ে আসে। সে মাত্র কয়েকঘন্টা আগে এসে পৌঁছেছে। প্রাসাদের নিচের অন্ধকার কারাকক্ষে কে তাদের এমন নৃশংস কাজ করতে প্ররোচিত করেছিলো, সেটা তাদের। দিয়ে কবুল করাতে বেশি কসরত করতে হয়নি।
বাবর নির্বিকার কণ্ঠে তার অমাত্যদের উদ্দেশ্যে কথা বলে। “আমি আমার সামনে আপনাদের উপস্থিত হতে বলেছি একটা ষড়যন্ত্রের সাক্ষ্যপ্রমাণ শুনতে। এই ছিন্ন। মস্তকগুলো খোরাসানের সুলতানের কাছে পাঠানো আমার বার্তাবাহকদের। তাদের হত্যা করা হয়েছে এমন একজনের আদেশে যাকে আমি বিশ্বাস করতাম। যার ধমনীতে আমারই রক্ত বইছে…তাকে নিয়ে আসা হোক।”
প্রহরী পরিবেষ্টিত অবস্থায় মির্জা খানকে প্রবেশ করতে দেখে উপস্থিত সবাই আঁতকে উঠে। তৈমূরের বংশধর হিসাবে তাকে রেয়াত করে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়নি। তার পোশাক-পরিচ্ছদ বা অবয়বের ভিতরে ভীতিকর বা বিনয়ী কোনো কিছুই প্রকটিত নয়: তার গলায় একটা কলাই করা হার ঝুলছে এবং মুক্তার কারুকাজ করা পরিকরের সাহায্যে পরণের বেগুনী রঙের রেশমের জোব্বা দিয়ে তার গাট্টাগোট্টা শরীর বেশ ভালোভাবেই আবৃত। তার অভিব্যক্তি ঔদ্ধত্যপূর্ণ।
মির্জা খান গলিত মাথা দুটোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখে, যেনো সেগুলো তার লাল নাগরায় লেগে থাকা ধূলিকণা ছাড়া কিছু না। নিজের হাত দিয়ে বুক স্পর্শ করে, কিন্তু আর কোনো কথা বলে না।
“আমার বার্তাবাহকদের যারা খুন করেছে পাহাড়ের কুফরী কুকুরের দল- তারা তাদের অপরাধের কথা কবুল করেছে। তারা আপনার নাম বলেছে মূল চক্রান্তকারী হিসাবে…”
“আমরা সবাই, কুচক্রী দলও বাদ যাবে না, নির্যাতনের মুখে অনেক কথাই স্বীকার করব…”
“কখনও কখনও সত্যি কথাটাও…তারা বলেছে বার্তাবাহকদের লাপাত্তা করার জন্য আপনি তাদের অর্থ দিয়েছেন- যাদের ভিতরে একজন কোনো এক সময়ে আপনার নিশান বাহক ছিলো- শিবার্তু গিরিপথে প্রবেশের পরে আপনি তাদের উপরে চড়াও হবার আদেশ দিয়েছিলেন এবং খোরাসানের সুলতানের কাছে আমার পাঠানো বার্তা যেটা তারা বহন করছিলো সেটা চুরি করতে বলেছিলেন। তাদের নাম খরচের খাতায় তুলে দিয়ে আপনি বলেছিলেন বন্দিদের সাথে তারা মর্জিমাফিক আচরণ করতে পারে। ব্যাটারা আহাম্মক বলেই নিজেদের অপকর্মের প্রমাণ হিসাবে কর্তিত মস্তকগুলো সংরক্ষণ করেছিলো…”
মির্জা খান অবজ্ঞার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকায়। “কাফিররা মিথ্যা কথা আর ছলনার জন্য বিখ্যাত…”
“আমার অশ্বশালার প্রধান তাদের নগণ্য দ্রব্যাদির ভিতরে এটা খুঁজে পেয়েছে।” একজন পরিচারক বাবরের হতে ফুলের ছোপ তোলা রেশমের একটা বটুয়া ধরিয়ে দেয়। বটুয়াটার দড়ি খুলে বাবর ভেতর থেকে হাতির দাঁতের তৈরি টুকরো বের করে যার তলদেশে একটুকরো অনিক্স সংবদ্ধ রয়েছে। “আপনার সীলমোহর। মির্জা খান। যে শিল্পী আপনার নাম উৎকীর্ণ করেছে সে দারুণ একটা কাজ করেছে দেখেন কি পরিষ্কার করে আপনার নাম আর পদবী এখানে দেখা যাচ্ছে। ভাড়াটে গুণ্ডাদের কাছে ষড়যন্ত্রে নিজের সংযুক্তির প্রমাণ পাঠিয়ে আপনি বোকামী করেছেন। কিন্তু আমি সবসময়ে জানতাম আপনার ঘিলুতে হলুদ পদার্থ কম আছে…”
মির্জা খানের চেহারায় ভয়ের অভিব্যক্তি এবার ফুটতে শুরু করে। কুলকুল করে ঘাম তার সুগন্ধি মাখানো দাড়ি বেয়ে নামতে থাকে এবং বেগুনী রেশমের জোব্বার বগলের নিচে গাঢ় দাগ দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে উঠে।
“আমি একটা ব্যাপার কেবল বুঝতে পারছি না, কেন?”
লাইলাকের একটা রুমাল দিয়ে মির্জা খান দ্রুত তার মুখ মুছে। কিন্তু কথা বলা থেকে বিরত থাকে।
“তুমি যদি আমার প্রশ্নের উত্তর না দাও, তবে আমি বাধ্য হব তোমাকে নির্যাতন করার আদেশ দিতে।”
“আপনি সেটা পারেন না- আমি তৈমূরের বংশধর, সম্পর্কে আপনার ভাই।”
“আমি পারি এবং প্রয়োজন হলে সেটা করবোও। তুমি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার সময়েই তোমার অধিকার হারিয়েছ।” বাবরের শীতল শব্দগুলো শেষ পর্যন্ত মনে হয় মির্জা খানের ঔদ্ধত্যপনা ঘুচিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারে তার চারপাশে জাল ক্রমশ গুটিয়ে আসছে।
“সুলতান…” প্রথমবারের মত মির্জা খান তাকে এই উপাধিতে সম্বোধন করে।
“আমার সামনে আর কোনো পথ ছিল না। আমি যা করেছি বাধ্য হয়েই করেছি…”
“একজন মানুষের সামনে সবসময়েই বেছে নেবার সুযোগ থাকে। তুমি কার পক্ষের হয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলে?”
মির্জা খান সহসা বমি করতে শুরু করে। তার ঠোঁটের কোণে হলুদ বমির সরু একটা ধারা বের হয়ে এসে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তার বেগুনী আচকানের দফারফা করে দেয়। সে মুখটা মোছে, মাথা তুলে করুণ দৃষ্টিতে বাবরের দিকে তাকায়। “আমরা একই রক্তের উত্তরাধিকারী, এটা ভুলে যাবেন না…”
“আমার সেটা মনে আছে আর আমি আজ সেজন্য লজ্জিত। আবার জানতে চাইছি কার কাছে নিজের মাথা বিক্রি করেছো?”
মির্জা খানকে দেখে মনে হয় সে আবার বমি করবে। কিন্তু সে বহুকষ্টে একটা ডোক গিয়ে এবং বিড়বিড় করতে থাকে।
“উত্তর দাও।”
