বাবর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবুরীর হাতে শূন্য থালাটা দিতে হুমায়ুনের ক্ষীণ কান্নার শব্দ শোনা যায়। বাচ্চাটাকে মখমলের গালিচা থেকে তুলে সে দু’হাতে উঁচু করে ধরে। যাতে তার সব অমাত্য আর সর্দাররা তাকে দেখতে পায় এবং তাদের নতুন শাহজাদাকে স্বীকার করে।
বাবরের দরবার হলের রাজকীয় মঞ্চের ডান দিকে দেয়ালের অনেক উঁচুতে মার্বেলের জাফরির ভিতর দিয়ে মাহাম, তার আম্মিজান আর নানীজান তাকিয়ে রয়েছে। তারা তাকে প্রথাগত উপহার সামগ্রী গ্রহণ করতে দেখে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে কথিত রৌপ্য মুদ্রা, রেশমের বাণ্ডিল, অভিজাত লোকদের দেয়া ঘোড়া আর শিকারী কুকুরের দল। উপজাতি সর্দারদের নিয়ে আসা ভেড়া আর ছাগলের পাল।
হুমায়ূন মধ্যরাতে ভোজসভা আর আনন্দ উদযাপন শেষ হবার অনেক আগেই মাহাম আর তার দাই-মায়ের, উজ্জ্বল চোখের এক তরুণী যে সদ্য নিজের ছেলেকে দুধ ছাড়িয়েছে, তত্ত্বাবধায়নে ফিরে যাবে। তৈমূরের বংশের কারো দাইমা হতে পারার সম্মানই আলাদা, আর সেটা সবাই হতে চায়। সে তার নতুন প্রাপ্ত দায়িত্ব বেশ ভালোভাবেই পালন করবে।
পুরুষ অতিথিদের হাসির শব্দে তার কল্পনার রেশ ছিন্ন হয়। তখনও বাইসানগারের কোলে থাকা মখমলের নীল গালিচায়, হুমায়ূন প্রাণপণে মোচড়াতে মোচড়াতে হলুদ প্রস্রাবের একটা বৃত্তচাপ নির্গত করে।
“সে যেনো এভাবেই আমাদের সব শত্রুকে মুতে ভাসিয়ে দেয়!” তুমূল হৈচৈয়ের ভিতরে বাবর চেঁচিয়ে উঠে বলে। কিন্তু সে এর সাথে আরও কিছু বলতে চায়। ঠিক এখনই কথাগুলো বলবার তার ইচ্ছা ছিলো না, কিন্তু কেনো জানি একটা নতুন সংকল্প- তাকে তাড়িত করে। সে ইঙ্গিতে সবাইকে চুপ করতে বলে।
“আপনারা সবাই আজ এখানে সমবেত হয়েছেন আমার ছেলের সম্মানে, আমার বংশের শুভাকাক্ষি হিসাবে- যা তৈমূরের বংশ। আমার সময় হয়েছে তৈমূরের পাদিশাহ উপাধি, পৃথিবীর ঈশ্বর, গ্রহণ করবার। আমি, আমার ছেলে হুমায়ূন এবং আমার এখনও ভূমিষ্ঠ না হওয়া সন্তানেরা, আমাকে এর যোগ্য বলে প্রতিপন্ন করবে এবং আমাকে যারা সমর্থন জানাবে সবাই এই গৌরবের অংশীদার বলে গণ্য হবে।
৩.৩ চেঙ্গিসের যোগ্য তনয়া
১৭. চেঙ্গিসের যোগ্য তনয়া
ছয় মাস পরের কথা। বাবর তার সোনার গিল্টি করা সিংহাসনে নির্বিকার মুখে বসে আছে। তার চারপাশে সব অমাত্য অবিচল ভঙ্গিতে শক্ত হয়ে বসে আছে। এরই মাঝে বাবুরী তার বয়ে আনা বস্তাটা বাবরের সামনে রাখে।
“সবাইকে দেখাও।”
বাবুরী তার নীল রঙের পরিকর থেকে খঞ্জরটা বের করে, বস্তার সেলাই খুলে ভেতরে কি আছে দেখায়: রক্ত জমাট বাঁধা দুটো ছিন্ন মস্তক, এবং বেগুনী-নীল ছোপ ধরা। যার পচনক্রিয়া অনেক আগেই শুরু হয়েছে। পরিক্ষয়ের পূতিগন্ধে বমি উদ্রেককারী মিষ্টি মিষ্টি আর পচা- পুরো ঘরটা ভরে যায়। গলার কাছের এবড়োথেবড়ো পেশী, যেখানে একটা ভোঁতা কিছু দিয়ে গলা থেকে মাথাটা কেটে নেবার চিহ্ন স্পষ্ট বোঝা যায়, বলে যে মাথাগুলো যাদের তারা সহজে মৃত্যুবরণ করেনি। স্যাইয়েদিমের একদা সুদর্শন মুখাবয়ব, তরুণ নিশান-বাহক, বাবর নিজে যার হিমদষ্ট হাত কর্তনের সময়ে তাকে চেপে ধরে রেখেছিলো, তার ফুলে ওঠা মুখ কোনোমতে চেনা যায়। তার ফুলে টসটস করতে থাকা ঠোঁট বেঁকে গিয়ে পুঁজ জমে পেকে ওঠা মাড়িতে তখনও সন্নিবিষ্ট সাদা দাঁতের সারি দেখা যায়। অন্য মাথাটা যে কার বাবর সেটা ঠিক চিনতে পারে না- বাইসানগারের অধীনস্ত এক সৈনিক-কিন্তু স্যাইয়েদিমের মতো তার মৃত্যুরও বদলা নেয়া হবে।
মৃত সৈন্য দু’জনকে বাবরের একটা বার্তা খোরাসানের সুলতানের কাছে তার অনেক দূরের আত্মীয়, যার দরবার হিরাতে অবস্থিত। সেখানে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। সেই বছর কাবুলে সবচেয়ে বড় সওদাগরী কাফেলা নিয়ে আসা বণিকেরা বলাবলি করছিলো, হিন্দুকুশের অপর প্রান্তে সাইবানি খান আবার একটা বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করেছে। কেউ কেউ বলে কাবুলের পশ্চিমে সমৃদ্ধ খোরাসান তার লক্ষ্য। আবার কারো মতে সে কাবুলেই হামলা করবে। বাবর খোরাসানের সুলতানকে সতর্ক করে বার্তাটা পাঠালেও, তাতে তাদের মাঝে মৈত্রীর একটা ইঙ্গিতও দেয়া হয়েছিলো। মুশকিল হলো বার্তাটা আদতে কোথাও পৌঁছায়নি….
ভেড়া চোর কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটা নিয়মতান্ত্রিক অভিযানের সময় কপালগুণে বাবুরী বার্তাবাহকদের ভাগ্যে কি ঘটেছে সেটা জানতে পারে। তাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত গ্রামের মাটির বাড়িগুলো তল্লাশি করার সময়ে সে বার্তাবাহকদের ছিন্ন মুণ্ডগুলো একটা বিশাল মাটির পাত্রে নীল ডুমো মাছির ভনভন ভীড়ের মধ্যে খুঁজে পায়। তাদের সাথে দেয়া দশজনের রক্ষীবাহিনীর বাকি সবার মাথাও কাছেই পড়ে রয়েছে। গ্রামের মোড়লের কাছ থেকে বাবুরী যতোটুকু জানতে পারে, সেটা হলো কফুরীরা তাদের হত্যা করার আগে কেবল পৈশাচিক আনন্দ লাভ করতে তাদের উপরে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের কারো কারো জিহ্বা কেটে ফেলা হয়, কিন্তু বার্তাবাহকদের একজনের সাথে তারা যা করেছে সেটা শুনে। সে কেঁপে উঠে। সেই বেচারা ধরা পড়ার সময়ে সংঘটিত যুদ্ধে পেটে তরবারির আঘাত পেয়েছিলো। কুফরী জানোয়ারগুলো এরপরে তার পেটে হাত ঢুকিয়ে ক্ষতস্থানটা আরো চিরে সেটার ফাঁক দিয়ে আংশিক নাড়ীভুড়ি বের করে আনে এবং সেই বার্তাবাহক যখন যন্ত্রণায় চিৎকার করছে তখন একটা খুটির সাথে তার সেই আংশিক বের হওয়া নাড়ীভুড়ি বেঁধে দিয়ে বেচারাকে বাধ্য করে খুঁটির চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচতে। সে ঘুরতে থাকলে বাকী নাড়ীভূড়িও পেট থেকে নাটাইয়ের সুতা খোলার মতো বেরিয়ে আসতে থাকে, যতক্ষণ না মৃত্যু এসে তার যন্ত্রণার নিবৃত্তি ঘটায়।
