*
১৫০৮ সালের এক শীতের সন্ধ্যাবেলা। বাবর দূর্গপ্রাসাদের প্রাকার বেষ্টিত ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিঃশ্বাস অনবরত একটা কুয়াশার মেঘের জন্ম দিচ্ছে। সে তার পরণের আলখাল্লাটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নেয়। কাবুলের আকাশ বছরের এই সময়ে প্রায়ই যেমন হয়ে থাকে- নির্মেঘ এবং তারার দল এমন উজ্জ্বলভাবে চমকায় যে তাকিয়ে থাকতে যেন কষ্ট হয়। এক ঘণ্টা আগে, সে ঠিক এখানে দাঁড়িয়ে থেকে শাহী জ্যোতিষের সাথে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলো। “সন্তান যদি আজ রাতে ভূমিষ্ট হয়, গ্রহমণ্ডলী যখন মীনের বলয়ে অবস্থান করছে, সে আপনার বংশের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে।” বৃদ্ধ লোকটা বলে, গ্রহ-নক্ষত্রের মানচিত্রের গোছা আঁকড়ে ধরা তার বয়সের ছোপ পরা হাত ঠাণ্ডায় কাঁপতে থাকে। বাবর তাকে আর তার সব পরিচারকদের যেতে বলে- এমনকি বাবুরীকেও। কি হচ্ছে না জানা পর্যন্ত সে একা থাকতে চায়। ছাদের এই স্থানে তাকে অন্তত মাহামের যন্ত্রণাক্লিষ্ট আর্তনাদ শুনতে হচ্ছে না…তার প্রসব বেদনার পনের ঘণ্টা অতিক্রান্ত হতে চলেছে। নিজের সবটুকু আত্মসংযম খরচ করে সে তার কাছে ছুটে যাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখে। আর সেটা একজন পুরুষের জন্য শোভনীয় কোনো স্থানও না। তার নানীজান দূর্গ মাথায় তুলে তাকে ধমকে কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে বলে, সবকিছু মেয়েদের হাতে ছেড়ে দিতে বলেন। সে মাহামের মুখটা, বিশাল দরজা তার মুখের উপরে বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে যাবার আগে একঝলকের জন্য দেখতে পায়। ঘামে ভেজা, ব্যথায় কুঁচকে আছে, কামড়ে ধরা ঠোঁট রক্তাক্ত।
“ছেলে বা মেয়ে যাই হোক কোনো ব্যাপার না। কিন্তু মাহাম যেন বাঁচে,” সে নিজেকে প্রার্থনা করতে দেখে। “আর কাউকে যদি ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তবে সেটা যেন মাহাম না হয়…” হেকিম বেশ কয়েকদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে বাচ্চার আকৃতি বেশ বড়- সম্ভবত মাহামের ক্ষুদ্র অবয়বের তুলনায় একটু বেশিই বড়।
গুলরুখও গর্ভবতী। তার সন্তান ভূমিষ্ট হতে এখনও পাঁচ মাস বাকী। কিন্তু এখনই সে তরমুজের মতো ফুলে উঠেছে এবং তাকে চমৎকার স্বাস্থ্যবতী দেখায়। কিন্তু গর্ভধারণের ফলে মাহাম কেবল ক্রমাগত অসুস্থই হয়েছে। সে প্রথমদিকে কিছুই খেতে পারেনি এবং গুলরুখের মতো বিকশিত হবার বদলে তার মুখ ক্রমশ শুকিয়ে গিয়েছিলো। তার লম্বা-পাপড়িযুক্ত চোখের নিচের পেলব ত্বকে কালশিটে পড়ার মতো বৃত্তাকার কালো দাগ যেনো কেউ এঁকে দিয়েছে।
বাইসানগারও মাহামের অবস্থা দেখে শঙ্কিত হয়ে উঠেন। সেই তার একমাত্র জীবিত সন্তান। তার জন্যও কঠিন সময় গিয়েছে…
“সুলতান…দ্রুত আসেন…” মাহামের এক পরিচারিকা হাঁফাতে থাকে এবং দম ফিরে পাবার জন্য আকুপাকু করার ফাঁকে কোনোমতে কথা বলে। সে পাথরের চৌকাঠ-যার ভিতর দিয়ে সে উপস্থিত হয়েছে সেটা ধরে নিজেকে সুস্থির করতে চেষ্টা করে। বাবরের মনে হয় সে বুঝি এখানে নেই, অনেক দূর থেকে সবকিছু দেখছে…”সুলতান, আপনার একটা পুত্র সন্তান হয়েছে…”
“কি বললে তুমি…?”
“রাণীমা, আপনার স্ত্রী একটা পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে…তিনিই আমাকে বলেছেন আপনাকে খুঁজে বের করতে…আর বলতে যে সব কিছু ঠিক আছে…”
“আর আমার স্ত্রী…সে কেমন আছে?”
“তিনি ভয়ানক ক্লান্ত। কিন্তু তিনি আপনাকে খুঁজছেন।” এই প্রথমবারের মতো পরিচারিকাটা তার মুখের দিকে তাকায় এবং সুলতানের চেয়ে একজন উদ্বিগ্ন পিতাকে দেখতে পেয়ে সে তার ভীরুতা ঝেড়ে ফেলে হাসে। “সুলতান, সত্যি বলছি, সব কিছু ঠিক আছে এবং আপনি রাণীমার কাছে যেতে পারেন।”
পরিচারিকাটা বাঁকানো সিঁড়ি বেয়ে জেনানামহলের দিকে দ্রুত হেঁটে যায়। কিন্তু বাবর সাথে সাথে তাকে অনুসরণ করে না। মুহূর্তের জন্য সে নির্মল আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে, সৌভাগ্যের প্রতীক ক্যানোপাস খুঁজে। হিন্দুকুশের বরফাবৃত গিরিপথের উপরে সে যে মুহূর্তে তারাটাকে আলোকবর্তিকার মতো চমকাতে দেখেছিলো, তখন থেকে নিশ্চিতভাবে প্রতি পদক্ষেপে তারাটা তাকে পথ দেখিয়ে চলেছে। বাবর তারাটা খুঁজে পেতে, নিরবে নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
***
সাদা পাগড়ী আর কালো আচকান পরিহিত মোল্লার দল তাদের প্রার্থনা শেষ করতে বাবর বাইসানগারের কোলে নীল মখমলের গালিচায় নিধিরাম সর্দারের মতো শুয়ে থাকা তার পাঁচদিনের পুত্র সন্তানের মাথার উপরে ধরে থাকা জেড পাথরের থালা থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বর্ণ আর রৌপ্য মুদ্রা ছিটিয়ে দেয়।
“তুমি আমার প্রথম ভূমিষ্ট আর প্রিয়তম পুত্র সন্তান। আমি তোমার নাম রাখলাম, হুমায়ুন, সৌভাগ্যবান একজন। আল্লাহতা’লার কৃপায় তোমার জীবন সৌভাগ্যপূর্ণ হোক, আর আমার বংশে তোমার হাত ধরে সম্মান আর মর্যাদার আগমন ঘটুক।” নিজের আত্মজের কুচকানো ত্বকের ক্ষুদে মুখের দিকে তাকিয়ে যে স্নেহপরায়ণতা তার ভিতরে জন্ম নেয়, যার সাথে বাবরের আগে কখনও পরিচয় ছিলো না। সে পুত্র সন্তান কামনা করে অনেক পুত্র সন্তান- বংশ পরম্পরায় যারা তার রক্ত বহন করবে। কিন্তু পিতৃত্বের স্বাদ কেমন সেটা ভাববার অবকাশ সে আগে পায়নি। সে ভাগ্যবান যে, তাকে এখন কোনো বক্তৃতা করতে হবে না- তার কণ্ঠস্বর হয়তো তার বশে থাকতো না, বা চোখের কোণে জমে উঠা অশ্রুও সে সংবরণ করতে ব্যর্থ হতো।
