“নববধূ ভালোই আছেন…”
“খোদা, আপনার কি শরীর খারাপ, কি প্রশ্নের কি উত্তর…?” বাবুরী কপট চোখ কপালে তুলে বলে।
“হ্যাঁ।” বিয়ের মাসখানেক হতে চলেছে, কিন্তু বাবর এখনও মাহামের প্রতি তার অনুভূতির কথা আলোচনা করতে অনীহা বোধ করে। এমন কি বাবুরী যার সাথে সে সবকিছু আলোচনা করে, তার সাথেও না। আলাপের মোড় ঘুরিয়ে দিতে আগে থেকেই তার মাথায় ঘুরতে থাকা বিষয়টা সে উত্থাপন করে। “কাবুলের অভিজাত মহল থেকে আমি আরেকজন স্ত্রী গ্রহণ করতে চাই। প্রজারা সেটাই চায় এবং এর ফলে তাদের সাথে আমার একটা আত্মীয়তার সম্পর্কের সৃষ্টি হবে।”
“আপনি কাউকে পছন্দ করেছেন?”
“আমি এসব ঝামেলায় নেই। আমি আম্মিজান আর সেই নাচুনে বুড়ির উপরে দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছি। দু’জনে শাহী জেনানামহলে সম্ভাব্য উপযুক্ত পাত্রীদের ডেকে এনেছেন…”
“আর আপনার পক্ষ হয়ে পছন্দের ভীষণ দায়িত্ব পালন করছেন?”
“বাহ্, তোমার দেখি ভালোই বুদ্ধি খেলছে আজকাল। আর তারা অতঃপর সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। গতরাতে নানীজান মেয়েটার নামও আমাকে বলেছিলো…কিন্তু বাবুরী এবার ধানাইপানাই ছাড়ো, চাঁদ? তোমারও বিয়ে করার সময় হয়েছে? তুমি কি সন্তানের পিতা হতে চাও না?”
“আট বছর বয়স থেকে আমি একা…বন্ধন, বিয়ে এসব ভাবনা আমাকে আকৃষ্ট করে না। আমি শয্যায় বৈচিত্র পছন্দ করি এবং সেই সাথে এটা পছন্দের যে স্বাধীনতা নিয়ে আসে।”
“তুমি তোমার যতোগুলো স্ত্রী চাও গ্রহণ করতে পারো। তুমি এখন আর সেই গরীব লোকটি নও…”
“আপনি বুঝতে পারবেন না। পরিবার, উত্তরাধিকার, সাম্রাজ্য- এসব আপনার জগতের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। বহু আগে আরম্ভ হওয়া একটা গল্পের অংশ হিসাবে আপনি নিজেকে দেখতে অভ্যস্ত এবং আপনার মৃত্যুর পরেও যা চলতে থাকবে আর সেখানে আপনার ভূমিকা সবসময়ে স্মরণ করা হবে। মানুষ আমাকে মনে রাখলো কিনা, সেটা আমি খোঁড়াই পরোয়া করি। তারা কেন আমাকে মনে রাখবে?”
“সব মানুষই চায় পৃথিবীর বুকে নিজের ছাপ রেখে যেতে। উত্তরসূরীরা যাতে তার কথা বলার গর্ব অনুভব করে…এটা কেবল রাজার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য না…”
“তাই নয় কি? আমার মতো লোকেরা ইতিহাসের গর্ভে দ্রুতই হারিয়ে যায়। আমরা ইতিহাসের উপাদান হিসাবে তুচ্ছ। আমি একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করি…আপনার ঐ রোজনামচায় আপনি আমার বিষয়ে কি লিখেছেন…” সাম্প্রতিক সময়ে কি আমার কথা আদৌ উল্লেখ করেছেন?” বাবুরীর ঘন নীল চোখ ঝিকিয়ে ওঠে।
বাবর সহসা বুঝতে পারে রাজার ভাগ্য, গৌরব বা খ্যাতির কোনো সম্পর্ক নেই বিষয়টার সাথে। ব্যাপারটা তারচেয়ে অনেক সরল কিছু একটা। বাবুরী, বেচারা বাবুরী আসলে ঈর্ষান্বিত। সে ছিলো বাবরের ঘনিষ্ট সহচর, বিশ্বস্ত বন্ধু, একমাত্র ব্যক্তি যার কাছে বাবর কিছুই এতোদিন গোপন করেনি। মাহামের প্রতি বাবরের আবেগ সেটা বদলে দিয়েছে। সত্যি কথা বলতে, গত কয়েক সপ্তাহ বাবুরীর কথা তার সামান্যই মনে পড়েছে। আর বাবুরী- প্রাপ্তবয়স্ক একটা লোক, যুদ্ধক্ষেত্রে তার মতো পরীক্ষিত আর প্রশংসিত যোদ্ধা- এতে মনে কষ্ট পেয়েছে। বাজারের সেই অরক্ষিত বাচ্চা ছেলেটা, যে উচ্ছিষ্টের জন্য লড়াই করেছে এবং বাহুবলের উপরে নির্ভর করে বেঁচে থেকেছে। তর্জনগর্জন করা নিজের প্রতি অতি আস্থাবান লোকটার খোলসের নিচে আজও বেঁচে আছে।
বহুবছর আগে ওয়াজির খান বাবুরীর সাথে তার ক্রমবৃদ্ধিমান অন্তরঙ্গতার বিষয়ে তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন এবং সেই পোড়খাওয়া লোকটা নিজের ঈর্ষা আর অপাংক্তেয় অনুভূতির কথা অকপটে স্বীকার করেছিলেন। ওয়াজির খানের আহত অভিমান প্রশমিত করতে সে যে কথাগুলো বলেছিলো, বাবর দেখতে পায় আজও সে ঠিক সেই কথাগুলোই আবার বলছে। “তুমি আমার সবচেয়ে প্রধান ইচকিস, আমার নিকটতম, সবচেয়ে বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা আর আমার একমাত্র বন্ধু। এই কথাটা কখনও ভুলে যেও না।” সে আলতো করে বাবুরীর কাঁধ স্পর্শ করে।
বাবুরী কাঁধের হাতটার দিকে তাকায় কিন্তু সেটা স্পর্শ থেকে মোচড় খেয়ে সরে যায় না। বাবর ভাবে, ঠিক যেনো একটা গোয়াড় স্ট্যালিয়নকে বশ মানানো। বশ মানার যতো বছরই হোক বন্যতার সামান্য ছিটেফোঁটা সব সময়েই রয়ে যায়। কিন্তু বাবুরীর কোমল হয়ে চোখের দৃষ্টি বলে দেয় তার কথাগুলো মলম হয়ে জায়গামতো প্রলেপ দিয়েছে। “বেশ, এবার তাহলে আপনার পরবর্তী স্ত্রীর কথা বলেন। কে সেই ভাগ্যবতী?” এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বাবুরী জানতে চায়।
“বাহলুল আইয়ুবের নাতি, গুলরুখ। তার বয়স উনিশ বছর এবং আমার নানীজান আমাকে বলেছেন, আমার অনেক সন্তান সে গর্ভে ধারণ করতে পারবে।”
“আচ্ছা তাহলে সেই আহাম্মক গ্রান্ড উজির আপনার শ্বশুর হচ্ছেন।”
“হ্যাঁ।”
“বেশ তাহলে তো হয়েই গেলো বাবাজীর ক-কথার জ্বালায় আর টিকতে হবে না কাউকে। আর আপনিও তার কথা এড়িয়ে যাবার অ-অজুহাতও পাবেন না।”
“সে একটা প্রাচীন সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান। তৈমূরের সেনাবাহিনী যখন কাবুলে এসেছিল তখন তারই এক পূর্বপুরুষ কাবুলের গ্রান্ড উজিরের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো।”
“তাই তো বলি, তৈমূর কেনো বেশিদিন এখানে অবস্থান করেননি। তা হবুবধূ দেখতে কেমন?”
বাবর কাঁধ ঝাঁকায়। “গুলরুখ? আমি তাকে দেখিনি। সময় হলে আমি আমার দায়িত্ব পালন করবো। কিন্তু মাহাম সবসময়ে আমার প্রথম স্ত্রীর মর্যাদা পাবে…”
