*
পাঁচ হাজার উট আর দু’হাজার খচ্চরের কাফেলার কাছ থেকে যেমনটা প্রত্যাশিত ঠিক তেমনটাই ধূলোর মেঘ পশ্চিমাকাশে ঘনিয়ে উঠতে দেখা যায়। এই বিশাল জটলার মাঝেই কোথাও মাহাম আছে। হিরাত থেকে পূর্বে তার যাত্রা নিরাপদ করার লক্ষ্যে সে যদিও রক্ষীবাহিনী পাঠিয়েছিলো। কিন্তু সে পরে সিদ্ধান্ত নেয় বৃহত্তর নিরাপত্তার স্বার্থে রক্ষীবাহিনী কাফেলার সাথেই যোগ দেবে।
রাতের আগেই তার হবু স্ত্রীর দূর্গে পৌঁছে যাবার কথা। পুরু গালিচা পেতে, রেশমের পর্দা দিয়ে সজ্জিত করে, সবোকৃষ্ট গোলাপজল আর চন্দনকাঠের সুবাসে তার জন্য নির্ধারিত কক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেই সাথে সেখানে রাখা হয়েছে তার বিয়ের উপহার- আয়েশাকে সে যে ভারী সোনার কণ্ঠহার আর বাজুবন্ধ দিয়েছিলো। এবং সে যেটা আবার ফেরত পাঠিয়েছিলো সেসব না। তার কোষাগারের সর্বোত্তম নমুনা। মূল্যবান পাথরখচিত সূক্ষ্ম কারুকাজ করা সোনার মণিহার আর মানতাসা। আচ্ছা মাহাম এখন কি ভাবছে? সে কল্পনা করতে চেষ্টা করে। নিজের বাবার সাথে, যাকে সে এতো বছর দেখেনি তার সাথে মিলিত হতে পারার কারণে উৎফুল্ল? শীঘ্রই যাকে স্বামী হিসাবে বরণ করতে হবে, সে বিষয়ে একটা শঙ্কা তার ভিতরে কাজ করছে…?
সূর্যাস্ত যাবার ঠিক আগে, বাবর পুনরায় দূর্গপ্রাকারে দাঁড়িয়ে গোধূলির ধূসর আলোয় তাকিয়ে দেখে, কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের তোরণদ্বার অতিক্রম করে পাত্রীপক্ষ ভেতরের আঙ্গিনায় প্রবেশ করে। কাফেলাটার সাথে আগত বিশেষ যত্ন নিয়ে পর্দা দেয়া গরুর গাড়ির বহরের দিকে বাইসানগার উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে এগিয়ে যায়। যেখানে তার মেয়ে আর তার পরিচারিকার দল ভ্রমণ করছে। বাবর ভাবে সেও যদি দেখতে পেতো! কিন্তু বিয়ের অনুষঙ্গ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অগত্যা তাকে অপেক্ষা করতেই হবে…।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেদিন থেকে এক সপ্তাহ পরে শাহী জ্যোতিষের গণনা করা শুভ দিনে শুরু হয়। একটা মখমলের চাঁদোয়ার নিচে বাবর আর মাহম পাশাপাশি এসে বসলে মোল্লার দল তাদের দাম্পত্যজীবন যেনো সুখের হয় সেজন্য মোনাজাত করে। নববধূ বেচারা হাঁসের নীল ডিমের মতো রঙের রেশমের কারুকাজ করা কয়েক পরত নেকাবের আড়ালে ঢাকা পড়ে রয়েছে। যেটা আবার মূল্যবান পাথর সজ্জিত সোনার ঝালর দেয়া টুপির নিচে থেকে বের হয়ে এসেছে। যা যখন সে মাথা নাড়ছে কাঁপছে আর ঝলসে উঠছে- বিয়েতে খুতলাঘ নিগারের উপহার। বাবর নববধূকে বিয়ের ভোজসভায় নিয়ে যাবার জন্য তার হাত ধরতে, কোনো ধরণের দ্বিধা, কোনো ধরণের অনীহা অনুভব করে না বরং একধরণের উৎসুক কাঁপুনী যা কামনাতাড়িত একটা অনুভূতিতে তাকে জারিত করে তোলে।
সেই রাতে, বাসরঘরে, বাবর পরিচারিকাদের দেখে তাকে নিরাভরণ করতে। বরাবরের মতো স্বল্পবাক আর অমায়িক, কিন্তু সেই মুহূর্তে বাবরের মনে হয় মিচকে শয়তান, বাইসানগার ইচ্ছে করেই কখনও বলেনি তার মেয়ে এতো সুন্দরী। কিন্তু পরমুহূর্তে তার মনে হয় আহা বেচারা (এখন বেচারা!) মেয়ে যখন ছোট ছিলো তখন ত কে দেখেছে তারপরে আর দেখেনি তিনি (?) কিভাবে জানবেন? নববধূর ডিম্বাকৃতি মুখে বাদামী বর্ণের পটলচেরা চোখই কেবল নজর কাড়ে। আর তার কালো চুলের ঢল কোমর ছাড়িয়ে নিতম্বের ভাঁজ স্পর্শ করেছে। তার দেহাবয়ব ক্ষুদ্রাকৃতি কিন্তু সুগঠিত। মুক্তার মত দীপ্তিময় বর্তুলাকার, উন্নত স্তনযুগল, সুরু কোমর আর কটিদেশের জটিল বাকের দখল বুঝে নিতে গিয়ে বাবর মালিকানার অচেনা আবেগ আর যেকোনো মূল্যে সেটা রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষায় আপ্লুত হয়ে উঠে। নববধূকে কেউ আঘাত করতে পারে এই ভাবনাটার কল্পনা তাকে এতোটাই ক্রোধান্বিত করে তোলে যে সে বাধ্য হয় নিজেকে মনে করিয়ে দিতে যে তেমন কোনো সম্ভাবনার উদয় হয়নি আর কখনও হবেও না- তাকে আগলে রাখার জন্য সে সবসময়ে তার পাশে থাকবে…
পরবর্তী দিনগুলো যেনো আঙ্গুলের ফাঁক গলে গড়িয়ে পড়া পানির মতো বয়ে যায়। আয়েশার সাথে তার দৈহিক মিলনের পুরোটাই ছিলো শারীরিক চাহিদা নির্ভর। অন্য কোনো কিছুর কোনো ভূমিকা সেখানে ছিলো না। ফারগানার বাজারে আর বেশ্যালয়ে সে আর বাবুরী যখন বিচরণ করেছে তখন ইয়াদগারের মতো মেয়েদের সাথে তার ফষ্টিনষ্টি কখনও ভালো কোনো শিকার বা উপাদেয় খাবারের চেয়ে বেশি কিছু ছিলো না- কেবল ফুর্তিতে সময় কাটানোই তখন মূখ্য ছিলো।
মাহামের কাছে যাবার জন্য এসান দৌলতকে আজকাল আর চৌকিদারের ভূমিকা নিতে হয় না। আয়েশার কাছে তাকে পাঠাতে তিনি একটা সময়ে যে মূর্তি ধারণ করতেন। অবশ্য অনেক সময়ে এমনও হয়েছে, সদ্য মিলন শেষে, মাহামের নিখুঁত স্তনে কালো চুলের বাধভাঙা ঢল তাকে নিমেষেই কঠিন করে তুলেছে। তাকে তখন আলতো করে নিজের কাছে টেনে এনে, তার অরক্ষিত কটিদেশের মসৃণ বাঁকে হাত বুলিয়ে, দুষ্টু মেয়েটার অধীর আকুতি অনুভব করেছে এবং দ্রুত হয়ে উঠা নিঃশ্বাসের শব্দ তাকে বলে দিয়েছে আবেগের তাড়না দু’পক্ষেই প্রবল।
*
“নববধূ কেমন আছেন? হাকিমের কাছে আপনি এখনও যাননি দেখে আমি বেশ অবাক হয়েছি। আমি শুনেছিলাম জ্বালাপোড়া আর নববিবাহিতদের গোপন অঙ্গের ঘর্ষণজনিত ক্ষত নিরাময়ে ধন্বন্তরী একটা মলম তার কাছে আছে…”
