বাবরকে অবশ্য এছাড়া নিজের লোকদের কথাও ভাবতে হবে। তাদের অবশ্যই মর্যাদা আর পদবী বাড়িয়ে পুরস্কৃত করতে হবে এবং সেই সাথে লুটের মালের ন্যায্য অংশ দিতে হবে।
সে বাবুরীকে অশ্বশালার নতুন আধিকারিক করেছে-আলী ঘোসতকে বরখাস্ত করার পরে থেকেই পদটা খালি ছিলো। তার রসিকতা আর গর্ববোধ দুটোই ভালোভাবে আলোড়িত হয়েছে এর ফলে। তার অবর্তমানে কাবুলের দায়িত্বে থাকা আর এতোদিন বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্বপালনকারী বাইসানগারকে নিয়ে সে কি করবে ভেবে পায় না। তার যদি নিজের মেয়ে বা ভাস্তি থাকত তাহলে সে তাদের মাঝ থেকে একজনকে খুশি মনে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে পারতো। সমরকন্দের এক প্রাচীন অভিজাত পরিবারের সন্তান বাইসানগার এবং বাবর যদি কখনও সেখানে ফিরে যেতে পারে তবে ব্যাপারটা সেখানকার লোকদের প্রীত করবে। সে যতোই বিষয়টা নিয়ে ভাবে ততোই সেটা তার মনে ধরে… বাইসানগারকে সে কদাচিত নিজের পরিবার সম্পর্কে বলতে শুনেছে এবং নিশ্চিতভাবেই তার পরিবারের কেউ সমরকন্দ থেকে তার সাথে আসেনি। অবশ্য তার মানে এই না যে, তার কেউ নেই। এতো ঝামেলা না করে জিজ্ঞেস করলেই ল্যাঠা চুকে যায়। বাইসানগারকে নিজের কামরায় ডেকে পাঠিয়ে সে সরাসরি কাজের কথা পাড়ে। “আমি আপনার কাছে বিশেষভাবে ঋণী। আপনি সমরকন্দে যে মুহূর্তে আমারে কাঁধ আঁকড়ে ধরেছিলেন তারপরে থেকে আপনি সর্বদা আমার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন…”
‘সুলতান, আমি তৈমূরের বংশের প্রতি বরাবরই বিশ্বস্ত থেকেছি এবং আগামীতেও থাকবো।’
“আর এজন্যই আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাই। আমার আম্মিজানের ইচ্ছা আমি শীঘ্রই আবার বিয়ে করি। আমিও ঠিক করেছি তাই করবো- সেটা দেখে যাবার জন্য যদি তিনি বেঁচে নাও থাকেন। তারপরেও এবং বাইসানগার মেয়েটা যদি আপনার বংশের কেউ হয়, তবে আমি নিজেকে সম্মানিত মনে করবো। আমি এই কথাটা বলবার জন্যই আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম…”।
বাইসানগারকে বিস্মিত দেখায়। বাবর এই প্রথমবারের মতো তার ধীর-স্থির, আবেগবর্জিত, সামান্য রসকষহীন সেনাপতিকে- যে লোকটা, তার ডান হাত পঙ্গু হওয়া সত্ত্বেও বাম হাতের বরাভয়ে বিপক্ষের যোদ্ধাদের মাঝ দিয়ে অনায়াসে সাঁতার কাটার মতো পিছলে বের হয়ে যেতে সক্ষম- ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খেতে দেখা যায়।
“সুলতান, আমার একটা মেয়ে আছে, কিন্তু গত দশ বছর আমি তাকে দেখিনি। আমার স্ত্রী তাকে প্রসব করার সময়ে মারা যায়। সাইবানি খান আপনার চাচাজানকে হত্যা করার পরে এবং সমরকন্দের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত মনে হতে, আমি হিরাতে আমার ভাইদের কাছে নিরাপত্তার স্বার্থে মেয়েটাকে পাঠিয়ে দেই। তার এখন সতের বছর বয়স হয়েছে।”
“তার নাম কি?”
“সুলতান, তার নাম মাহাম।”
“আপনি কি তাকে আনবার জন্য লোক পাঠাবেন? আপনি কি আমার সাথে তার বিয়েতে সম্মতি দেবেন?”
“সুলতান, সেটা আমার সৌভাগ্য।”
“আমি তাকে আমার একমাত্র স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে পারবো না। মৈত্রীর বন্ধন গড়ে তোলার জন্য আমি বাধ্য হব আরও স্ত্রী গ্রহণ করতে। কিন্তু বাইসানগার আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে, তার সাথে সবসময়ে ভালো ব্যবহার করবো, আর সে আমার প্রথম স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করবে।”
*
“সুলতান, উঠুন।” বাবর তার কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করতে সহজাত প্রবৃত্তির বশে বালিশের নিচে রাখা খঞ্জরের বাঁট আঁকড়ে ধরে। তারপরে বুঝতে পারে একটা নারী কণ্ঠ তার ঘুম ভাঙিয়েছে। মেয়েটার হাতে ধরা মোমের আলো থেকে নিজের চোখ আড়াল করে বাবর ফাতিমার গোলাকার সাদাসিধে মুখ দেখতে পায়।
প্রাসাদ রীতিনীতির-এবং নিরাপত্তার দিক থেকেও, একটা বিরল বিচ্যুতি বলতে হবে ঘটনাটাকে। তারপরে তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন আরেকটু হলে বন্ধ হবার মতো উপক্রম হয়। ফাতিমা এতো রাতে নিশ্চয়ই আম্মিজানের কক্ষ থেকে আসছে। সে নিজের নগ্নতার ব্যাপারে একেবারে বেখেয়াল অবস্থায় বিছানা থেকে লাফিয়ে নামে। “কি হয়েছে? আম্মিজান কেমন আছেন…?”
ফাতিমা কাঁদছে, কিন্তু সেটা বেদনার না আনন্দের অশ্রু। “বিপর্যয় অবশেষে কেটে গেছে- হাকিম বলেছেন এ যাত্রা মালকিন বেঁচে যাবেন।”
বাবর এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে, আল্লাহতালার কাছে শুকরিয়া আদায় করে। তারপরে ফাতিমার রক্তিম বিভ্রান্তি খেয়াল করে এবং সে চোখ সরিয়ে রেখেছে দেখে। বাবর ত্রস্ত হাতে নিজের আলখাল্লা খুঁজে। সে আলখাল্লাটা কোনোমতে জড়িয়ে নিয়ে, সরু অলিন্দ দিয়ে দৌড়ে গিয়ে, দ্বাররক্ষীদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে, রূপার কারুকাজ করা দরজা হুড়মুড় করে খুলে মায়ের কক্ষে প্রবেশ করে। পক্ক কেশ হেকিম জিহ্বা দিয়ে প্রতিবাদসূচক শব্দ করে। কিন্তু বাবর তখন সেসব দেখার মতো অবস্থায় নেই। এসান দৌলত তার মেয়ের মুখ তখন একটা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছিলেন এবং তিনি যখন তাকে সম্ভাষণ জানাবার জন্য ঘুরে তাকান, বাবর তার। চোখেমুখে স্বস্তির একটা অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে।
বাবর এবার তার আম্মিজানের দিকে তাকায়। তার একদা মসৃণ ত্বক বৃত্তাকার লাল দাগে ফেটে আছে এবং ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল এবং তার দিকে তাকাতে দৃষ্টির উজ্জ্বলতা আরো বৃদ্ধি পায়। খুতলাঘ নিগার দুহাত প্রসারিত করতে, বাবর তার শয্যার পাশে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে আলিঙ্গন করার সুযোগ আম্মিজানকে দেয়। টের পায় সে আবার তার সেই ছোট্ট বাবরে পরিণত হয়েছে এবং গভীর স্বস্তির একটা রেশ তাকে আপ্লুত করে তোলে।
