“এই রোগটা কখন ছড়িয়েছে?”
“প্রায় এক সপ্তাহ আগে। তিনি জ্বরের ঘোরে কেবল আপনার কথাই বলছেন। আমি গুপ্তদূত পাঠিয়েছিলাম আপনার খোঁজে। কিন্তু আপনি কেনদিক থেকে ফিরে আসবেন- কবে নাগাদ ফিরে আসবেন সে সম্বন্ধে কোনো ধারণা না থাকায়। আল্লাহতালার অশেষ মেহেরবানী আপনি ফিরে এসেছেন…”
একটা শীতল অসাড়তা বাবরের দেহ আর মনকে যেনো আড়ষ্ট করে তুলে। স্তম্ভিত। অবস্থায় সে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে, লাগাম এক সহিসের হাতে ধরিয়ে দিয়ে আঙ্গিনা অতিক্রম করে ধীরে ধীরে জেনানামহলের দিকে এগিয়ে যায়। সে লম্বা রূপালী আস্তরণযুক্ত গাঢ় নীলকান্ত মণির কারুকাজ করা দুই দরজা বিশিষ্ট প্রবেশদ্বারের দিকে এগিয়ে যেতে যেখান দিয়ে তার আম্মিজানের কামরার দিকে যাওয়া যায়। বাবরের পুরো শরীর কাঁপতে থাকে এবং সে অসুস্থবোধ করে।
তার শৈশবের কথা মনে পড়তে থাকে। পোষা বেজীকে বিরক্ত করার জন্য খানজাদা তাকে মারায় খুতলাঘ নিগার তাকে তিরস্কার করছেন। আম্মিজান পালকযুক্ত ফারগানার মুকুট তার মাথায় পরিয়ে দিচ্ছেন আর তার সদ্যমৃত আব্বাজানের আলমগীর তার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে তার নামে খুতবা পাঠ হবার অব্যবহিত আগে। কিন্তু এসব ছাপিয়ে তার মুখে ফুটে থাকা কষ্ট সে দেখতে পায়। যখন সে তাকে বলেছিলো খানজাদাকে সাইবানি খানের হাতে সমর্পিত করতে হবে। অসুস্থতার অনেক আগেই সেই ঘটনা তার মাঝ থেকে জীবনীশক্তি শুষে নিয়েছে… নিজের উপর ক্রোধে বাবর মাথা নিচু করে।
পরিচারিকার দল দরজা খুলে দিতে, অসুস্থ কামরার বদ্ধ, ভারী বাতাস- ঘামের সাথে চন্দনকাঠ, কর্পূরের মিশ্রিত গন্ধ- তার নাকে এসে ধাক্কা দেয়। সে ভেতর থেকে বীণার বিষাদময়, মিষ্টি সুর ভেসে আসছে শুনতে পায়। সে ভেতরে প্রবেশ করতে এসান দৌলতকে তার অসুস্থ মেয়ের পাশে বীণার উপর মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখে। “নানীজান…”
তিনি মুখ তুলে তাকান। কিন্তু বাজনা সাথে সাথে বন্ধ না করে রাগটা শেষ করে বীণাটা তার পাশে অধোমুখে, কষ্ট চেপে রাখা মুখের ফাতিমার হাতে দেন। “সঙ্গীত যেনো বেচারীকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। আমি ভেবেছিলাম তোমার বোধহয় আসতে দেরি হয়ে যাবে। হাকিম নিদান দিয়ে দিয়েছে…”
বাবর তার আম্মিজানকে চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকতে দেখে। তার মুখে আর গলার কাছের যতোটুকু সে দেখতে পায় লাল রাগী চাকায় ভর্তি হয়ে আছে। সে তার কাছে এগিয়ে যেতে চাইলে এসান দৌলত হাত নেড়ে তাকে দূরে থাকতে বলে। “জ্বরটা মারাত্মক। বিশেষ করে অল্পবয়স্কদের ক্ষেত্রে। বাবর তার দিকে তাকায়। সে আরেক পা সামনে এগিয়ে আসলে, এসান দৌলত তার বয়সের তুলনায় অনেক ক্ষিপ্র গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে ধেয়ে এসে বাবরের বাহু আঁকড়ে ধরে। “হাকিম তার সাধ্যমত চেষ্টা করছেন আর আমিও আছি। আমরা এখন কেবল অপেক্ষা আর দোয়া করতে পারি। এখন তুমিও যদি আক্রান্ত হও তবে কি কোনো লাভ হবে? তোমার আম্মিজান আর আমার জন্য তুমি যা করতে পারো, সেটা হলো বেঁচে থাকা, বহাল তবিয়তে।”
“কিন্তু আমি কি কিছুই করতে পারি না?”
“একটা জিনিস আছে করবার মতো। তোমার আম্মিজানের যখন জ্ঞান থাকে তখন সে সামান্যই কথা বলে। কিন্তু জ্বরের ঘোরে সে অনেক কিছুই বলে। জ্বরের ঘোরে সে কেবল আল্লাহতালার কাছে একটা কথা জানতে চেয়েছে, তার কোনো নাতি নেই কেন, কেন তোমার একজন উত্তরাধিকারী নেই। আমি তাকে বলতে চাই, তুমি আবার বিয়ে করবে এবং সুস্থ হয়ে সে তোমার আত্মজদের কোলে নিয়ে খেলতে পারবে। তার আত্মা হতাশায় ছেয়ে গেছে। লড়াই করার কোনো ইচ্ছাই তার ভিতরে কাজ করছে না। আমি তাকে কিছু একটা বলতে চাই যা তার ভিতরে বাঁচার আশা জাগিয়ে তুলবে…”
“আপনি তাকে বলবেন সে যা বলবে আমি করতে রাজি আছি। আম্মিজানকে বলবেন যে, তাকে অবশ্যই সুস্থ হয়ে উঠতে হবে, আমার বিয়ের ভোজসভায় নাচবার জন্য এবং তার অবশ্যই অসংখ্য নাতিনাতনি হবে… তাকে বলবেন আমার এখনও তাকে দরকার আছে…”
এসান দৌলত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপরে-সন্তুষ্ট হয়ে তার হাত ছেড়ে দেয়। “এখন যাও। আম্মিজানের শরীরের খবর আমিই তোমাকে জানাবো।”
অশ্রু দমন করে কোনোমতে বাবর নিজের কক্ষে ফিরে আসে। এসান দৌলত আর তার মায়ের কথায় যুক্তি আছে- সে তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। এখন সে যখন কাবুলে থিতু হয়ে বসেছে, তখন আরেকজন স্ত্রী গ্রহণ করতে বাধা কোথায়: তার প্রজারাও নিশ্চয়ই উত্তরাধিকারী দেখতে চায়। আর তাছাড়া বিয়ের ফলে মৈত্রী জোরদার হয়। কিন্তু সেসব এখন অপ্রাসঙ্গিক তার আম্মিজানের সুস্থ হয়ে উঠবার জন্য যদি তাকে দশটা স্ত্রী গ্রহণ করতে হয়, বিশটা সে তাই করবে…।
পরবর্তী কয়েকটা দিন মন্থর গতিতে কেটে যায়। বাবর সংবাদের অপেক্ষায় থাকে। সবসময়ে একই খবর সে শুনতে পায়- “অবস্থা অপরিবর্তিত আছে।” অভিযান থেকে ফিরে আসবার পরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার মনোযোগ দাবি করেছিলো। উপজাতি সর্দার যারা তার সাথে অভিযানে গিয়েছিলো তারা নিজেদের প্রাপ্য ভাগ। নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছে এবং অভিযানে প্রাপ্ত সম্পদ ভাগ করে দেবার জন্য সে বাবুরীকে দায়িত্ব দিয়েছে। তার দরবারের মুনশীরা শীঘ্রই হিসাব রাখতে শুরু করবে, কতগুলো ভেড়া বা ছাগল, কত গাঁইট উলের কাপড় এবং কত বস্তা শস্য বিলিয়ে দেয়া হয়েছে।
