এটা সত্যি, গত কয়েক সপ্তাহ পশ্চিমে ক্রমাগত আফগান উপজাতিদের পাহাড়ী এলাকা আর তাদের পাথরের তৈরি আশ্রয়স্থলে হামলা- সাঙগারস ঈগলের বাসার মতো যা তারা পাহাড়ের উঁচুতে সতর্কতার সাথে নির্মাণ করে সাফল্যজনক বলে প্রতিয়মান হয়েছে। কাটা মুণ্ডের কয়েকটা স্তূপ তৈরি হতেই বেশিরভাগ গোত্রের লড়াইয়ের শখ উবে গিয়েছে এবং অন্তত দশজন সর্দার তাদের প্রথা অনুযায়ী চার হাতপায়ে ভর দিয়ে, মুখে ঘাস নিয়ে তার প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছে। যার মানে “আমি এখন আপনার গরুর মতো। আমার সাথে আপনার যা ইচ্ছা আচরণ করতে পারেন।”
কিন্তু সে কেবলই ভেড়া, গরু, উট, চিনি, সুগন্ধি কন্দ আর কাপড়ের গাইট লুট করতে পেরেছে। তার লোকেরা আপাতদৃষ্টিতে সন্তুষ্ট। কিন্তু কাবুল থেকে এতো হ্যাপা সামলে কয়েক হাজার লোক আর অগণিত ভারবাহী পশু নিয়ে আসাটা বাবরের কাছে অপব্যয় বলে মনে হয়। তার আরও অসন্তুষ্টির কারণ ইত্যবসরে সিন্ধু নদীর পানি বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। যার ফলে নদী অতিক্রম করে হিন্দুস্তানের গভীরে অভিযান শুরু করতে পারে। উত্তরের সীমানা বরাবর পাহাড়ী আর সমতলের লোকদের বশ মানানো তার কাছে মর্যাদাহানিকর বলে প্রতিয়মান হতে আরম্ভ করেছে। অবশ্য এসব সত্ত্বেও এবারের অভিযানে একটা উদ্দেশ্য অন্তত হাসিল হয়েছে, কপালের ঘাম চোখে গড়িয়ে পড়ার আগে মুছতে মুছতে বাবর ভাবে। তার সৈন্যদের একটা মহড়া হয়ে গেলো। সেই সাথে তার নিজেরও-একটা বড় অভিযানের প্রস্তুতি হিসাবে।
সে এখন তার লোকদের লম্বা সারি, পেছন পেছন আসা ভারবাহী ঘোড়া, গাধা আর উটের বহর গজনী নদী বরাবর উত্তর-পশ্চিম দিকে বেঁকে গিয়ে সওয়ারন গিরিপথের দিকে এগিয়ে চলেছে। যা তাদের পুনরায় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আল্লাহতা’লা সহায় থাকলে তারা শীঘ্রই কাবুলের দেখা পাবে এবং উত্তরের পাহাড় থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাসের পরশ তাদের শুষ্ক, রোদেপোড়া ত্বকে অনুভব করবে। সেখানে পৌঁছে সে আবার নতুন করে পরিকল্পনা করবে।
“ওটা কি?” বাবুরীর তীক্ষ্ণ চোখ দিগন্তের কাছে কিছু একটা দেখতে পায়। ঠিক তাদের মুখের সামনে একটা বিশাল কমলা রঙের গোলকের মতো। সূর্য অস্ত যাবার কারণে ঠিকমতো দেখা যায় না। কিন্তু বাবর তার ঘোড়ার লাগাম জিনের সাথে বেঁধে দু’হাত দিয়ে চোখের সামনে একটা আড়াল তৈরি করে। সেও কিছু একটা দেখতে পায়- আলো পড়ে খুব সম্ভবত ধাতব কিছু একটা চমকাচ্ছে। কিন্তু তারা আরও সামনে এগিয়ে আসতে দেখা যায় আকাশ আর দিগন্তের মাঝে ঝুলে থাকা পানির একটা বিশাল বিস্তার।
পানির উপরিভাগে লালচে আলো এই আছে এই নাই ভঙ্গিতে চমকায়। সম্ভবত অস্তমিত সূর্যের প্রতিফলন। না…বাবর তার পাশে বাবুরীকেও অসাধারণ দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থেকে আঁতকে উঠতে শোনে। হাজার হাজার লম্বা পায়ের লাল পালকের পাখি তাদের ডানা ঝাপটাচ্ছে, আকাশে উড়তে প্রাণবন্ত আকাশের গায়ে রক্তের একটা ঝাপটার মতো দেখায় তাদের। ভয়ঙ্কর সুন্দর একটা দৃশ্য।
গরমের তাণ্ডব সত্ত্বেও, বাবর উত্তেজনায় কেঁপে উঠে…দক্ষিণের ভূখণ্ডের চমক এখনও তার জন্য শেষ হয়নি। পাখিগুলোর মতোই, সেও এলাকাটা ত্যাগ করছে কিন্তু তাদের মতোই সে আবার ফিরে আসবে। আর মানুষ তখন সে দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠবে।
৩.২ এক সৌভাগ্যসূচক জন্ম
১৬. এক সৌভাগ্যসূচক জন্ম
গ্রীষ্মের দাবদাহ কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের নিচে অবস্থিত তৃণভূমির ঘাস পুড়িয়ে সোনালী বর্ণে পরিণত করেছে। তার ক্লান্ত ঘোড়ার খুরের নিচের মাটি শক্ত হয়ে আছে। হ্রদের পানির পরিমাণ কমে গিয়েছে এবং কাদার ফাটা আস্তরণের মাঝে সবুজ শ্যাওলার শুকনো দাগযুক্ত একটা স্তর কিনারায় দেখা যাচ্ছে পানিতে কেমন একটা পচা গন্ধ। প্রায় পাঁচ মাস অনুপস্থিতির পরেও অবশ্য তার চিন্তার কেন্দ্রে কেবলই তার আম্মিজান আর নানীজানের ভাবনা ঘুরপাক খায়। তাদের কাছে হিন্দুস্তানের সীমান্তে তার অভিযানের অভিজ্ঞতার কথা শোনাতে সে ব্যাকুল হয়ে আছে। বাবর তার সেনাপতিদের ছাউনি ফেলার আদেশ দিয়ে ভারবাহী পশুগুলোর পিঠ থেকে বোঝা নামাতে বলে। সেসব বিতরণ না করা পর্যন্ত পাহারা দেবার। বন্দোবস্ত করে সে দূর্গের র্যাম্প দিয়ে দুলকিচালে ঘোড়া নিয়ে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যায়।
অন্ধকারাচ্ছন্ন তোরণদ্বারের নীচ দিয়ে আলোকিত আঙ্গিনায় উপস্থিত হতে, দূর্গ প্রাকারের উপর থেকে বাদ্যবাদকের দল প্রথা অনুসারে তাকে বাজনা বাজিয়ে ফিরে সুলতানের মতো অভিবাদন জানায়। বাবর তার রেকাব থেকে পা নামিয়ে নিয়ে। সন্তুষ্টির সাথে একটা শ্বাস নেয়। এখানে ফিরে আসতে পেরে তার ভালোই লাগছে। তারপরে সে হন্তদন্ত হয়ে বাইসানগারকে এগিয়ে আসতে দেখে তাকে অভিবাদন জানাতে। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বাবর বুঝতে পারে কোনো একটা দুঃসংবাদ তার জন্য অপেক্ষা করছে। “কি হয়েছে বাইসানগার? কি ব্যাপার?”
“সুলতান আপনার আম্মিজান অসুস্থ। এখানকার লোকেরা যাকে ছোপযুক্ত জ্বর বলে। পূর্বের সওদাগরদের সাথে এখানে এসেছে, তিনি সেই জ্বরে আক্রান্ত। শহরে রোগ একটা মহামারীর সৃষ্টি করেছে এবং প্রাসাদের জেনানামহলেও ছড়িয়ে পড়েছে। হাকিম তার রক্তপাত ঘটিয়েছে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এখন তরমুজের রস দিয়ে তার রক্ত শীতল করতে তিনি চেষ্টা করছেন, কিন্তু তার প্রাণসংশয়ের আশঙ্কা করছেন আমাদের হেকিম…তার দু’জন পরিচারিকা ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে একজন কয়েক ঘণ্টা আগে।”
