পেছনে বাবুরী আর দেহরক্ষীর দলকে নিয়ে বাবর পাথরের উপর দিয়ে পিছলে নিজের শিকারের পেছনে ধাওয়া করে। পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে বাবর লোকটা আধা দৌড়ে আধা হেচড়াতে হেচড়াতে পাথরের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যেতে দেখে। তীরটা ডান বাহুতে কাঁধের ঠিক নিচে বিদ্ধ হয়েছে। দ্রুত দৌড়ে বাবর তার কাছে পৌঁছে একটা লাফ দিয়ে লোকটাকে নিয়ে পাথরের উপরে আছড়ে পড়ে। শীঘ্রই তার দেহরক্ষীর দল এসে উপস্থিত হয় এবং লোকটাকে বেঁধে ফেলে।
বাবর উঠে দাঁড়িয়ে নিজের আলখাল্লা থেকে ধূলো ঝাড়ে। “তুমি কে?”
“পিখী, গাগিয়ানিসদের সর্দার…” লোকটা হাঁফাতে হাঁফাতে বলে।
“তুমি এখানে কি করছিলে?”
পিখীর চোখ- পাহাড়ী বিড়ালের মতো অনেকটা দেখতে- পিটপিট করে। কিন্তু সে যদি মিথ্যা বলতে চেয়েও থাকে কিন্তু সেটা অবান্তর ভেবে বিরত থাকে। “গিরিপথের দিকে আপনাদের গতিবিধির উপর নজর রাখছিলাম।”
“আর সেটা তুমি কেনো করছিলে?”
“এখানে পাঠানরা থাকে যারা লুটপাটের মতো কাফেলার সন্ধান দিতে পারলে আমাকে আর আমার লোকদের পুরস্কৃত করে। গত বছর ফসল ভাল হয়নি। তার উপরে শীতকালটাও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে…আমার লোকেরা কখনও সচ্ছল ছিল না। কিন্তু এবছর আমি যদি লুটপাটের সন্ধান না দিতে পারি তবে আমাদের সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে।”
“আমি একজন সুলতান, আমার সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছি… উটের বহর নিয়ে আসা কোনো হোতকা সওদাগর না।”
“আমি কি ব্যাটার গলা ফাঁক করে দেবো?” বাবুরী কোমর থেকে খঞ্জর বের করে গুপ্তচরদের স্বাভাবিক শাস্তি কার্যকর করতে প্রস্তুত।
“না…আমার মাথায় আরেকটা ভালো বুদ্ধি এসেছে।”
বাবর আবার পিখীর দিকে তাকায় যে সম্ভবত সর্দার হিসাবে মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে। “তুমি এই পাহাড় ভালো করে চেনো আর তুমি বাঁচতেও চাও?”
“হ্যাঁ অবশ্যই দুটোই চাই- আর তাছাড়া আমি আপনার নিরাপত্তা বেষ্টনী অনায়াসে অতিক্রম করেছি, তাই না?”
“তোমার জীবন বাঁচাবার বিনিময়ে তুমি গিরিপথের আশেপাশে তোমার মিত্রদের খবর পাঠাবে যে, আমি সুলতান বাবর গিরিপথ দিয়ে আসছি। আমাকে যদি কোনো গোত্র আক্রমণ করার দুর্মতি দেখায় তবে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে…আর তুমি আমাদের পথপ্রদর্শক হবে। কোনো ধরণের ঝামেলা পাকাবার চেষ্টা করলে আগে তুমি মারা পড়বে। পরিষ্কার বোঝাতে পেরেছি?”
*
পিখীকে বখশ দেবার সিদ্ধান্ত লাভজনক প্রতিপন্ন হয়। তিনটা লম্বা যাত্রার মাধ্যমে সে পুরো বহরটাকে খাইবার গিরিপথের ববফাবৃত, জনশূন্য আঁকাবাঁকা পাথুরে খাঁজের ভিতর দিয়ে পার করে নিয়ে আসে। জামের মাটির তৈরি বসতবাটির বসতিতে তারা নেমে আসতে বাতাস ততক্ষণে উষ্ণ হয়ে উঠেছে এবং আরো তিনদিনের ক্রমাগত যাত্রা তাদের সিন্ধুর কাছে পৌঁছে দেয়। বাবর প্রশস্ত নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। বরফ গলা পানিতে এতটাই পূর্ণ হয়ে আছে যে, দু’তীর ছাপিয়ে তার স্রোতধারা বয়ে চলেছে। তার পৃথিবী আর হিন্দুস্তানের উষ্ণ রহস্যময় ভূমির মাঝে সীমানা চিহ্নিত করে এই নদীটা বয়ে চলেছে…
“এটাই তাহলে সিন্ধু নদী?” বাবুরী তার পাশে একটা গাট্টাগোট্টা খোঁজা করা ঘোড়ায় উপবিষ্ট। যা পানি খাবার জন্য অস্থির ভঙ্গিতে মাথা নাড়াচ্ছে।
“হ্যাঁ।” বাবর প্রমত্তা নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকে তার মাঝের পূর্বেকার উল্লাস অনেকটাই কমে এসেছে। আমরা এখানে নদী অতিক্রম করতে পারবো না। আমাদের বেশিরভাগ ঘোড়া আর মালপত্রের দশা তাহলে আর দেখতে হবে না… আমরা সর্বসান্ত হব। পিখীকে আমার কাছে পাঠাও। আমার লোকদের লুটপাটের সামান্য সুযোগ অন্তত আমার দেয়া উচিত।”
দশ মিনিট পরে আদিষ্ট লোকটা তার সামনে হাজির হয়, মাথার খয়েরী মখমলের টুপি তার হাতে ধরা।
“আমরা এখানে নদী পার হতে পারবো না। আমাকে হয় পানি কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, নতুবা এমন একটা স্থান খুঁজে পেতে হবে যেখানে আমাদের ঘোড়াগুলো নিরাপদে সাঁতরে ওপারে যেতে পারবে।”
পিখী কাঁধ ঝাঁকায়। “নদী এ বছর বেশ প্রমত্তা, দেখতেই পাচ্ছেন। পানি কমতে কমতে তাও কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার। ততোদিন অন্যকোনো জায়গা দিয়ে অতিক্রম করা অসম্ভব ব্যাপার।”
“নৌকার বন্দোবস্ত? নদীতে কোনো জেলে দেখছি না কেন?”
“মাঝি ছিলো, সুলতান কিন্তু গিরিপথ দিয়ে আপনার আগমনের সংবাদ পেয়ে দেখতেই পাচ্ছেন ব্যাটারা নৌকা নিয়ে ভেগে গিয়েছে…”
বাবর গালবকে। “নদীর পানি কমার অপেক্ষা থাকার সময়ে আমরা এপার দিয়ে আর কোথায় যেতে পারি?”
“কোহাট এখান থেকে দু’দিনের যাত্রা পথ। শস্য আর গবাদিপশুতে সমৃদ্ধ একটা বসতি।” পিখীকে ধূর্ত দেখায়। “সেখানের বাসিন্দারা আমার জাত শত্রু। গত বছর গ্রীষ্মে পাহাড়ে তারা আমার গ্রামে হামলা করেছিলো। আমার লোকদের খুন করে, মেয়েদের তুলে নিয়ে যাবার সময়ে আমাদের গবাদিপশুর পালও তাড়িয়ে নিয়ে যায়। তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারলে আমার ভালোই লাগবে।”
“আমাদের সেখানে নিয়ে চলো, তারপরে তুমি মুক্ত।”
*
এই নিয়ে দশবার, বাবর নিজের আহাম্মকির জন্য গাল দেয়। মাত্র এপ্রিল মাস, কিন্তু এখনই সূর্যের উত্তাপ তাকে আর তার লোককে পাগল করে তুলেছে। বাতাসের আর্দ্রতায় বৃষ্টির প্রতিশ্রুতি যা স্থানীয় লোকদের মতে কয়েকদিনের ভিতরে বৃষ্টি হয়ে ঝরতে শুরু করবে। বর্মের নিচে তারা ঘেমে অস্থির হতে থাকে।
