তার কথা শেষ হতে, এসান দৌলত সম্মতির সাথে মাথা নাড়েন। কিন্তু খুতলাঘ নিগারকে কিছু একটা বিচলিত করে তুলে। সোনালী জরির কারুকাজ করা তাকিয়া, যেখানে তিনি হেলান দিয়ে ছিলেন সেখান থেকে ধীরে ধীরে উঠে বসে, মাথা নাড়তে থাকেন, যেনো কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছেন না। তাকে কাঁদতে দেখে বাবর চমকে উঠে- তিনি কান্না মোছার কোনো চেষ্টাও করেন না। তার সামনে তিনি প্রবলভাবে কাঁপতে থাকেন এবং হাত দিয়ে নিজের মাথার লম্বা চুল মোচড়াতে থাকেন যেখানে এখন সাদার ছোপ দেখা দিয়েছে।
“মেয়ে…” এসান দৌলতের কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায়।
বাবর তার আম্মিজানের হাত ধরে তাকে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করে। যেনো তিনি একটা বাচ্চা মেয়ে আর সে তার বাবা। “আমাকে বলেন কি হয়েছে?”
“খানজাদা- বাবর তুমি তোমার প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেছো? তুমি কথা দিয়েছিলে তাকে উদ্ধার করবে। দক্ষিণে কেন তুমি তোমার সময় নষ্ট করছো…”
তিনি তাকে আঘাত করলেও হয়তো বাবর এতটা কষ্ট পেতো না। লজ্জা, হতাশা আর বেদনার একটা পরিচিত রঙে তার চেহার লাল হয়ে উঠে। তার কথা আমার সবসময়ে মনে আছে। আমি আমার প্রতিশ্রুতি রাখবো। কিন্তু এখনও সময় হয়নি। সাইবানি খানকে মোকাবেলা করতে হলে আমাকে আরও সৈন্য আরও অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। এবারের অভিযানে হয়তো আমি সেটা অর্জন করতে পারবো। কিন্তু আমি শপথ করছি যতো শীঘ্রই সম্ভব আমি খানজাদাকে খুঁজে বের করবো…”
তার আম্মিজানের ফোঁপানি ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়ে আসে এবং তার শরীর শান্ত হয়। বাবর তার কপালে আলতো করে চুমু দেয়। কিন্তু তিনি তার ভেতরে যে অশান্তির আগুন জ্বেলে দিলেন, সেটা প্রশমিত হতে অনেক সময় লাগবে…
আগামী সপ্তাহগুলোতে সে হিন্দুস্তান অভিযানের প্রস্তুতিতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। সে একই পথ ধরে যাবে- কাবুল নদী বরাবর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এগিয়ে গিয়ে খাইবার গিরিপথ অতিক্রম করবে- এক শতাব্দি আগে তৈমূর যে পথ দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
বরফ পড়া শুরু হবার আগের স্বল্প সময়ে, তৃণভূমি সাদা হয়ে উঠতে আর দৃশ্যপট ঝাপসা হতে শুরু করতে, যখন বোঝা দুস্কর কোথায় পর্বতমালা শেষ হয়েছে, আর কোথায় ধূসর আকাশ শুরু হয়েছে। বাইসানগার আর বাবুরী লোকদের অভিযানের জন্য প্রশিক্ষিত করে তাদের নিজস্ব বাহিনী আর স্থানীয় উপজাতিগুলো থেকে সংগৃহীত নতুন সৈন্য। উপজাতি লোকগুলো খারাপ না… বাবর তাদের ঘোড়ার পিঠে সওয়ার অবস্থায় খড়ের নিশানায় তীর ছুঁড়তে বা বর্শা দিয়ে দ্রুত বেগে ঘোড়া দাবড়ে তরমুজ আর ভেড়ার মাথা বিদ্ধ করতে দেখে ভাবে…কিন্তু কে জানে তাদের ভাগ্যে কি অপেক্ষা করছে?
অনেক রাত বাবর ভ্রাম্যমাণ বণিকদের ঝুলেপড়া মুখের অবিশ্বাসী শ্রোতাদের সামনে বিচিত্রসব প্রাণীর গল্প বড়াই করে বলতে শুনেছে- এমনকি দানবের গল্প হিন্দুস্তানের বটগাছের অরণ্যে ঘুরে বেড়ায়। যাদের উধ্বমুখী শুড় অসতর্ক পথিকের গলা টিপে ধরে দম আটকে ফেলে। নগ্ন সাধু সন্ন্যাসীর দল, মুখে ছাই ভস্ম মাখা প্রতিমা পূজারীর দল, যারা অন্ধকার গুহায় বাস করে আর জীবনেই চুল দাড়ি কাটে না। বেশিরভাগটাই বালখিল্যসুলভ অর্থহীন…কিন্তু সে তারপরেও খারাপ কিছুর জন্যই প্রস্তুত থাকতে চায়।
শেষ পর্যন্ত জানুয়ারী মাস আসতে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। যদিও চারপাশে এখনও পুরু বরফ জমে আছে। কিন্তু শীতের ভয়ঙ্কর তুষারঝড় শেষ হয়েছে এবং তারা ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারে।
ছয়দিন একটানা অগ্রসর হয়ে অগ্রসর হবার গতি নির্দিষ্ট করেছে ঢোলের শব্দ বাবর তার দু’হাজার সৈন্যের শক্তিশালী বহর নিয়ে খাইবার গিরিপথের মুখে এসে উপস্থিত হয়। কিন্তু সাতদিনের দিন, সূর্য যখন মাথার উপরে ক্রমশ রুক্ষ্ম হয়ে ওঠা ভূপ্রকৃতি থেকে রঙের স্পর্শ শুষে নিচ্ছে, বাবরের মনে হয় সে ঠিক তার সামনে ডানদিকের পাহাড়ে কিছু একটা নড়াচড়া দেখতে পেয়েছে। সে তীক্ষ্ণ চোখে সেদিকে তাকিয়ে থেকে থামবার নির্দেশ দেয়।
“কি ওটা?” বাবুরীর কথার মাঝেই পাহাড়ের নিচের ঢাল বেয়ে নুড়ি পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ হয়।
“আমি জানি না। আমি সারির চারদিকে রক্ষামূলক বেষ্টনীতে প্রহরী নিয়োগ করেছি। তারপরেও গুপ্তঘাতক কিভাবে বেষ্টনীর ভিতরে প্রবেশ করেছে? চলো আমরা সামনের পাহাড়ে উঠে ভালো করে দেখি…”
বাবর তার ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামে। “তোমরা তীর তৈরি রাখো, আর আমাদের রক্ষা করো।” সে তার দেহরক্ষীদের উদ্দেশ্যে বলে। বাকিরা সবাই আমাদের সাথে এসো।”
কয়েক মিনিট পরে, বাবর জনমানবহীন, বিরাম পাথুরে চূড়ার দিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকে। কিছু নেই, খালি ফাঁকা সব। মানুষ বা পশুর পাল যাই থাকুক পগাড় পাড় হয়ে গিয়েছে। তারপরে সে আবার দূরবর্তী কিনার থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার আওয়াজ পায়। সে আড়াআড়ি দৌড়ে গিয়ে বাদামী জোব্বা আর ঢোলা পাজামা পরিহিত একজনকে নুড়ি পাথরের উপর দিয়ে পাগলের মতো পিছলে পালিয়ে নেমে যেতে দেখে। বাবর নিমেষে তার ধনুক নামিয়ে, লোকটাকে লক্ষ্য করে একটা তীর ছুঁড়ে মারে। লোকটা চিৎকার করে উঠে এবং পাহাড়ের পাদদেশে পাথুরে ভূমিতে কোনোমতে লুকিয়ে পড়ে।
