“সত্যি কথা হলো আমি অস্থির হয়ে উঠেছি- অসন্তুষ্ট। কাবুল ঠিকই আছে, কিন্তু আমি আরো চাই। প্রতিদিন আমি যখন ডায়েরী খুলে বসি কিছু লিখতে, আমি ভাবি ভবিষ্যতের পাতায় আমি কি লিখবো…সেখানে কি মহান কোনো গৌরব, মহান। কোনো বিজয়ের কথা লেখা হবে, নাকি সেগুলো ফাঁকাই থাকবে…? আমার বিশ্রাম নেবার সময় নেই, আমাকে শক্ত করে নিয়তির হাল ধরতে হবে। আমি আমার জীবনের সময়গুলো উল্লেখিত কিছু না করে বৃথাই নষ্ট করতে চাই না।”
“আপনি ঠিক কি করবেন বলে ভাবছেন…? সাইবানি খানকে আক্রমণ করবেন?”
“আমার সেনাবাহিনী আক্রমণের যোগ্য হয়ে উঠলে তোমার পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করবো না। কিন্তু এখনই না। তাকে এখন আক্রমণ করলে আহাম্মকি করা হবে…”
“তাহলে আপনি কি করতে চান?”
বাবর আরেকটা লম্বা চুমুক দেয়, টের পায় সুরাটা ভেতরে প্রবেশ করে তার বাচন শক্তি আর কল্পনাকে মুক্ত করে। সহসা তার মনের গভীরে থাকা একটা ধারণা স্ফটিক স্বচ্ছ রূপ লাভ করে। “হিন্দুস্তান… আমি সেখানেই যেতে চাই। রেহানার গল্প তোমার মনে আছে? আমি যদি সম্পদ কুক্ষিগত করতে পারি, তৈমূর যেমন করেছিলেন। তাহলে সাইবানি খান বা পারস্যের শাহ্ কেউ আমার সামনে দাঁড়াতে পারবে না।” সে তার আসনে বসে উত্তেজনায় দুলতে থাকে। বাবুরী তার কাঁধে একটা হাত রেখে তাকে সুস্থির করতে চায়। কিন্তু সে এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দেয়। সে তার কল্পনার চোখে রুবির চোখযুক্ত সোনার হাতিটা দেখতে পায়…
“আপনার উচিত হবে নিজের সহজাত অনুভূতি অনুসরণ করা।”
বাবর ঝাপসা চোখে তার দিকে তাকায়। “কি…?”
“আমি আপনাকে বলতে চেয়েছি নিজের অনুভূতির কথা শুনতে… আপনার তথাকথিত ভাগ্য যার কথা বলতে আপনি ভীষণ পছন্দ করেন সেটা আপনাকে কোথায় নিয়ে যায় দেখা যাক…”
বাবুরীর কণ্ঠস্বর যদিও অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে বলে মনে হয় এবং চারপাশের হট্টগোলের ভিতরে যা অনেকটাই হারিয়ে যায়। কিন্তু বার্তাটা পরিষ্কারভাবে বাবরের ভিতরে প্রবেশ করে। তার সুরার নেশা নিমেষে ঘুচিয়ে দেয়…হ্যাঁ, সে একটা বাহিনী নিয়ে কাবুল নদী বরাবর দক্ষিণে হিন্দুস্তানের দিকে এগিয়ে যাবে। সে প্রশস্ত সিন্ধুর দিকে তাকিয়ে দেখবে, অন্য তীরের অবিশ্বাস্য সম্পদের কথা বিবেচনা করবে, এবং সম্ভবত নিজের জন্য কিছু দখলও করতে পারে।
***
বাবরের অনুরোধে শাহী জ্যোতিষী গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান পর্যালোচনা করে দেখেন। রাতের পরে রাত তারা তাদের চার্ট পর্যবেক্ষণ করেন আর কাবুলের উপরের অন্ধকার আকাশ আলোকিত করে থাকা তারকারাজির অসম্ভব জটিল বিন্যাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন। জানুয়ারি মাসে, সূর্য যখন কুম্ভরাশিতে অবস্থান করছে তখন অভিযান শুরু করার একটা শুভ সময় তারা দাড়িতে টোকা দিতে দিতে। অবশেষে খুঁজে পান। বাবর ঠিক বুঝতে পারে না তাদের ভবিষ্যদ্বাণী সে নিজে বিশ্বাস করে কিনা, কিন্তু তার লোকেরা করে। অজানা অঞ্চলে তাদের অভিযানে গ্রহ-নক্ষত্রের বরাভয় রয়েছে এটা মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। জ্যোতিষদের পরামর্শ অবশেষে তাকে অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করবে: আগামী কয়েকটা মাস সে সেনাবাহিনী গঠন আর অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।
*
শরতের শেষ ফলটাও কাবুলের চারপাশের বাগান থেকে সংগৃহীত হবার পরেই কেবল কিশম থেকে বাবরের আম্মিজান আর নানীজান এসে পৌঁছান। সে আরও আগেই তাদের আনতে লোক পাঠাতে চেয়েছিলো কিন্তু হাজারা বিদ্রোহের কারণে সে সতর্কতা অবলম্বন করে। কিন্তু তূর্যধ্বনি আর তোরণদ্বারের উপরে ঢাকের আওয়াজের মাঝে তারা তাদের দলবল নিয়ে দূর্গপ্রাসাদে প্রবেশ করতে তার মনটা গর্বে ভরে উঠে। খুতলাঘ নিগারের স্বাস্থ্য অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছে এবং দীর্ঘ ভ্রমণের ধকলের কারণে তাকে ক্লান্ত আর দুর্বল দেখায়- বাবর দেখে ফাতিমার উপরে তিনি ভীষণভাবে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন- কিন্তু এসান দৌলত বরাবরের মতোই প্রাণবন্ত রয়েছেন।
তারা নিজেদের কক্ষের অবস্থান গ্রহণ করা মাত্র তিনি দু’হাতে তার মুখ ধরে তাকিয়ে থাকেন। “আমার বাছা দেখছি পুরুষ হয়ে উঠেছে, তার মুখ ছেড়ে দিয়ে সন্তুষ্টির সাথে মাথা নেড়ে তিনি বলেন। “খুতলাঘ দেখো তোমার ছেলে গত কয়েক মাসে কেমন বদলে গিয়েছে- দেখো তার কাঁধ কেমন চওড়া হয়ে উঠেছে।” তিনি তার বুকে চাপড় দিয়ে তার বাহুর উধ্বাংশে আঙ্গুল দিয়ে খোঁচা দিয়ে দেখেন। যেনো কেনার আগে ঘোড়া খুটিয়ে পরখ করছেন। “সিংহের মত পেশী।”
খুতলাঘ নিগার তার দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু কিছু বলে না। তিনি আগের চেয়ে অনেক নিরব হয়ে গেছেন- আব্বাজানের আকস্মিক মৃত্যুর পরে তাকে যে মহিলা ফারগানার সিংহাসনের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিলেন সেই মানসিকভাবে শক্তিশালী মহিলা যেনো অন্য কেউ ছিলো- দু’বছর আগেও পাহাড়ে পাহাড়ে অবিশ্রান্ত ঘুরে বেড়ান সেই মহিলার চেয়ে এখন তিনি অনেক দুর্বল একজন।
“আপনাদের দুজনের সাথে আমার জরুরি কথা আছে। আসছে জানুয়ারি মাসে আমি কাবুল ত্যাগ করে দক্ষিণে আমার বাহিনী নিয়ে হিন্দুস্তানে আমার ভাগ্য পরীক্ষা করতে যাবো। আমার অবর্তমানে বাইসানগার রাজপ্রতিভূর দায়িত্ব পালন করবে…”
