বাবুরী চলে যাবার পরেও বাবর চুপ করে অনেকক্ষণ ভাবে। তারপরে বাবুরী এসে বিঘ্ন ঘটাবার আগে সে যা লিখছিলো সেটা শেষ করার জন্য আবার লেখনী তুলে নেয়: “এই সাম্রাজ্য লেখনী না তরবারির সাহায্যে শাসিত হবে।”
*
শিকারীদের দণ্ড থেকে ইতিমধ্যে ছয়টা ছাল ছাড়ানো হরিণ ঝুলছে, কিন্তু নীলগাইটা হল বোনাস। বাবর এন্টিলোপের নীলচে-ধূসর চামড়া, কালো কেশর আর গলার নিচে লম্বা, পুরু, রেশমী লোমের আবরণ সম্পর্কে আগে পড়েছিলো, কিন্তু নিজে কখনও চোখে দেখেনি। তার সাম্রাজ্যের পূর্বদিকে ওক আর জলপাই গাছের ঘন অরণ্যে আত্মগোপন করে থাকা প্রাণীর দল- তীক্ষ্ণ কণ্ঠী ময়না, ময়ূর, বানর, আর জমকালো তোতাপাখি- তাকে বিমোহিত করে। বাবুরী হাজারা বিদ্রোহ দমন করে আসার পরে সে এই এলাকায় বিজয় উদযাপনের জন্য শাহী শিকারের আয়োজন করেছিলো বলে সে নিজের কাছেই কৃতজ্ঞ বোধ করে। পাঁচদিন আগে বাবুরী তার লোকদের নিয়ে কাবুলে ফিরে এসে বাবরের পায়ের কাছে আরগুনের কাটা মাথাটা অর্পণ করেছিলো। এখন সেও নীলগাইটার দিকে তাকিয়ে আছে।
‘তোমার পালা।” বাবর ফিসফিস করে বলে। সেটাই উপযুক্ত পুরষ্কার হবে।
বাবুরী জুনিপারের ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নীলগাইটার দিকে নীলচোখে তাকিয়ে থাকার অবসরে ধনুকে তীর যুক্ত করে ছিলাটা কানের কাছে টেনে আনতে থাকে, যতক্ষণ না মনে হতে থাকে যে ধনুকটা ভেঙে যাবে।
বাবর তাকিয়ে দেখে সাদা পালকযুক্ত তীরটা অসন্দিগ্ধ এ্যান্টিলোপটার কোমল গলায় আমূল বিদ্ধ হয়, কোনো ধরণে শব্দ বা লম্বা পাপড়িযুক্ত চোখে কোনো পলক না ফেলে মাটিতে একপাশে কাত হয়ে উল্টে পড়ে। মুহূর্তের জন্য বাবর কোনো শরাহত প্রাণী দেখতে পায় না। তার চোখে ওয়াজির খান ভাসতে থাকে, গলায় উজবেক তীর বিদ্ধ হয়ে ঘোড়া থেকে খরস্রোতা নদীতে পিছলে পড়ছেন এবং চোখ ঘুরিয়ে নেয়। আবেগ আর স্মৃতি কখন মানুষকে তাড়িত করবে কিছু বলা যায় না। এই একটা বিষয় সে এতোদিনে ভালোই বুঝতে পেরেছে। “চমৎকার। তোমার নিশানভেদের দক্ষতা অসাধারণ।”
“বাজারের বালকের তুলনায় বলছেন…’
কাবুল বিজয় উদযাপনের পরে সেদিন রাতের ভোজসভাটা ছিলো সবচেয়ে জৌলুসময়। মশালের কমলা আলোতে, সাধারণ দূর্গ যেটাতে সে এবার শিকারের জন্য এসে উঠেছিলো, তার আঙ্গিনায় একটা পাইনকাঠের মঞ্চে বাবর উপবেশন করে তার পাশে ছিলো বাবুরী। বাবর শীঘ্রই উলুসের আদেশ দেবে- বিজয়ীর অংশ- বাবুরীকে প্রথম ভেড়াটা পরিবেশন করতে বলে। সে কাবুলের তীব্র লাল সুরা তার উদ্দেশ্যে পান করে বাবুরীকে কোর বেগী, যুদ্ধক্ষেত্রে তার পারদর্শিতার জন্য, ধনুকের সর্দার উপাধিতে ভূষিত করবে।
কিন্তু সেদিন গভীর রাতে, মোষের শিং আর রূপা দিয়ে তৈরি দুই হাতল যুক্ত পানাধার থেকে পান করতে করতে, মাঠের অন্যপ্রান্ত থেকে তার লোকদের হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ আর বীরত্ব গাঁথার আওয়াজ এবং বিছানায় তাদের প্রবল নাক ডাকার শব্দের মাঝে, সে টের পায় নিজের ভেতর অসন্তোষ ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে। সুরার পরিমাণের সাথে ঠিক যখন অন্য শাসকরা সন্তুষ্টি বোধ করবে। বাবুরী হাজারাদের বিদ্রোহ দমন করেছে এবং পথের পাশে তাদের ছিন্ন মস্তকের যথেষ্ট বড় স্তূপ তৈরি করেছে, যা পথিকদের মনে ভয় আর ভবিষ্যত বিদ্রোহীদের প্রশমিত করতে সাহায্য করবে। কাবুল তার স্বর্গ তার সম্মানের শান্তি প্রলেপ-এখন নিরাপদ। তার রাজধানীকে সুশোভিত করতে সে নিত্য নতুন উদ্যান আর ভবনরে নকশা পরিকল্পনা করছে। কিন্তু তারপরেও সে কেন শান্তি পাচ্ছে না? কারণ উচ্চাশা তার অন্তরকে কুরে কুরে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত, সুখ শান্তি সব হরণ করে নিচ্ছে।
সুরার পাত্রে আরেকটা লম্বা চুমুক দিয়ে, বাবর ভাবতে থাকে। আর কয়েকদিন পরেই তার আম্মিজান আর নানীজান কিশিম থেকে এখানে এসে পৌঁছাবেন। আম্মিজান তার সাথে মিলিত হতে পেরে যারপরনাই আনন্দিত হবেন সত্যি, কিন্তু তার মনে অব্যক্ত প্রশ্নটা তিনি ঠিকই বহন করে যাবেন-কবে বোনকে উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি সে পূর্ণ করবে। এসান দৌলতের তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টিতে সে একই প্রশ্ন দেখতে পাবে যা তাকে বিব্রত করছে: এর পরে কি? নতুন কোনো অভিযান? কখন এবং কোথায়? তৈমূর কিংবা তার পরম শ্রদ্ধেয় চেঙ্গিস খান কখনও একই স্থানে বেশিদিন কাটাননি। নিজের অর্জন কখনও তাদের সন্তুষ্ট করেনি, কোনো সন্দেহ নেই এসব কথাই বৃদ্ধা তাকে আবার মনে করিয়ে দেবেন…
“আপনাকে দেখে অভিযানের আগে কারো প্রিয় ঘোড়া খোঁড়া হয়ে গেলে যেমন দেখাবে, অবিকল সেই রকম দেখাচ্ছে।” বাবুরীর অস্থিসর্বস্ব মুখ সুরার প্রভাবে চকচক করছে এবং হাজারাদের বিরুদ্ধে সাহসিকতা আর চাতুর্য দেখাবার পুরষ্কার হিসাবে বাবরের দেয়া সোনার মালা তার গলায় লটকে আছে।
“আমি ভাবছিলাম… দশ বছর আগে আমি যখন একেবারেই ভাবিনি তখন আমি সুলতান হই। কিন্তু আমি সবসময়ে ভেবে এসেছি- সুলতান হবার আগে নিয়তি আমার ভাগ্যে বিশেষ কিছু রেখেছে…” বাবুরীর চিরাচরিত সন্দিহান অভিব্যক্তি বাবর অগ্রাহ্য করে। সে যেভাবে বেড়ে উঠেছে সেটা বেচারা কিভাবে বুঝবে, যেখানে তার প্রিয় জন্মদাতা যাকে তুমি ভালোবাস সে কেবল সম্ভাব্য মহত্ত্বের আর এখনও অর্জিত হয়নি সেই সম্ভাবনার কথা বলেন…
