*
“আপনি কি করছেন? আমি এই নিয়ে তিনবার দেখলাম আপনি কাগজে কি হিবিজিবি দাগ কাটছেন।” বাবুরীর ছায়া বাবরের কাগজের উপরে পড়ে।
“এটা একটা দিনলিপি। আমি সমরকন্দ যখন সাইবানি খানের কাছ থেকে দখল করি, তখনই ঠিক করেছিলাম আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখবো… কিন্তু শহরটার কর্তৃত্ব হারাবার পরে…আমি যখন প্রাণে ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, আমি এই লেখার কাজটা তখন বন্ধ রেখেছিলাম…”
“আপনি কেনো বন্ধ করেছিলেন? আপনি হয়তো মনে শান্তি পেতেন…”
বাবর তার লেখনী নামিয়ে রাখে। “কিছু বিষয় আছে যার সাথে মানিয়ে নেয়াটা খুবই কষ্টকর ছিলো- খানজাদার পরিণতি, ওয়াজির খানের মৃত্যু…আর আমি যখন ভবঘুরে জীবনযাপন করছি তখন ব্যর্থতা ছাড়া, বেঁচে থাকবার প্রাণান্তকর প্রয়াস ছাড়া এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় আধবাটি বজরার গুড়ো কেমন মুখরোচক মনে হয়, এসব ছাড়া আমি আর কি লিখতাম? এসব কথা লিখে কোনো প্রশান্তি লাভ করা যায় না…কেবল লজ্জাই প্রকট হয়ে উঠে…কেবলই আত্ম-বঞ্চনা যা থেকে তুমি একবার আমাকে রক্ষা করেছিলে…”
“আর এখন?”
“আমি এখন আবার সুলতান হয়েছি…আমার মনে হয়েছে আমার স্মৃতিকথার এখন কিছুটা হলেও মূল্য রয়েছে…কিন্তু এর সাথে আরো কিছু আছে। হিন্দুকুশ পর্বতমালা অতিক্রম করে আসার সময় তোমার কি মনে আছে আমরা ক্যানোপাস তারা কেমন উজ্জ্বল হয়ে চমকাতে দেখেছিলাম। সেই মুহূর্তে, আমি শপথ নিয়েছিলাম আমি যদি কাবুল অধিকার করতে পারি। তাহলে আমি আর কখনও আমার অভিমন্ত্রণ হারাবো না। সাইবানি খানের মতো খুনী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্পর্ক আর বিদ্রোহী প্রজাদের আর কখনও আমার আশেপাশে ভিড়তে দেব না। আমি নিজের নিয়তির নিয়ন্ত্রক হবো। আমি এটা অর্জন করতে পারবো বলে আমার মনে হয়েছে…”
“আর আপনি কি এসবই লিখে রাখছেন?”
“একরকম সেটাই বলতে পারো…আমি চাই আমার সন্তান, তাদের সন্তানরাও যেন জানতে পারে আমার সাথে কি হয়েছিলো। আমার শক্তি আমার অর্জনের কথা সেই সাথে আমার ভুলের কথাও…আমার ব্যর্থতা…আমার ভাবনা…বেঁচে থাকার জন্য আমি কি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলোম…আজ থেকে আমি সবকিছু লিপিবদ্ধ করতে চাই- ভালো অথবা খারাপ- সতোর আর নিষ্ঠার সাথে…”
“গতরাতে আপনি নেদারি মেয়েটার সাথে কতবার মিলিত হয়েছেন সেটাও?”
“সেটাও…একটা মানুষ নানা কারণে গর্বিতবোধ করে থাকে…” বাবর খিকখিক করে হেসে উঠে। কিন্তু পরমুহূর্তে সে বিষণ্ণ হয়ে উঠে। সে তার উজিরের সাথে আজকের আলোচনার কথাটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না। “বাহলুল আইয়ুব আজ আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন।”
“সেই বকরবাজ বৃদ্ধার মতো কথা বলতে থাকা লোকটা, সে-সে কি চায়?” বয়স বা মর্যাদার প্রতি বাবুরীর বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই। আর গ্রান্ড উজিরের তীক্ষ্ণ, কম্পিত কণ্ঠস্বর আর কথা বলার সময়ে হাত নাড়া নকল করতে সে পছন্দই করে। “সে খারাপ খবর নিয়ে এসেছে। যদিও সেটা অপ্রত্যাশিত ছিলো না। কাবুলে প্রবেশ আর নির্গমনের পথে সওদাগরী কাফেলা আক্রমণ করছে। হাজারারা- আমার নির্দেশ সত্ত্বেও যে কাফেলাগুলোকে কোনোভাবে বিরক্ত করা যাবে না। আর আমার জরিমানা বাবদ ধার্য করা মেষ আর ঘোড়ার পাল দিতেও তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে…মুহাম্মদ-মুকিম আরগুনের কাছে জরিমানা আদায়ের তাগাদা জানাতে ওয়ালি গুল গিয়েছিলো। সে আজ ফিরে এসেছে…তার কান কেটে দিয়ে হাজারারা আমার শাসনের প্রতি তাদের অনীহা জানিয়ে দিয়েছে…”
“তাহলে বলতেই হবে মুহাম্মদ-মুকিম আরগুন তাকে যেমন দেখায় তারচেয়েও মস্ত বড় আহাম্মক…”
“তার ঔদ্ধত্য তার মস্তিষ্কের চেয়েও বড় আর হাজারারা একটা শৃঙ্খলাহীন গোত্র। আমি যদি তাদের দ্রুত শায়েস্তা না করি, তাহলে অন্য আরো অনেক ক্ষেত্রে বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। আমি ইতিমধ্যে আমার করণীয় ঠিক করেছি…বার্তাবাহকের কান কাটার অপরাধে বন্দি সব হাজারা যযাদ্ধাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। তৈমূর যতো বড় তৈরি করেছিলেন আমি তারচেয়েও বড় কর্তিত মুণ্ডের পিরামিড তৈরি করববা…”
“আমাকে আদেশ দিন একটা বাহিনী নিয়ে আমি নিজে যাই। আমি হারামজাদাদের পাহাড়ের কোটর থেকে তাড়িয়ে বের করে আনবো আর তাদের দেহ কবন্ধ করব…”।
বাবর তার বন্ধুর দিকে তাকায়। তার আন্তরিকতায় কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই: আবেগে তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে আর চোখের পাতায় একটা উদগ্র দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। সে একজন ভাল সৈন্য কিন্তু আগে কখনও নেতৃত্ব দেয়নি।
“তুমি ঠিক জানো নেতৃত্ব দিতে পারবে?”
অবশ্যই। কেবল আপনারই নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস নেই অন্য কারোও…”
বাবর কিছুক্ষণ চিন্তা করে। আরো অনেকে হয়তো বিড়বিড় করবে, অবাক হবে তাদের বাদ দিয়ে বাবুরীকে মনোনীত করায়। এমনকি বাইসানগারও হয়তো ব্যাপারটা মেনে নিতে চাইবে না। কিন্তু নিজের অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়ে বাবুরীকে সে যে সুযোগের জন্য মরীয়া হয়ে আছে দিতে আপত্তি কোথায়?
“ঠিকাছে। তুমিই যাবে।”
“আর আপনার আদেশ কোনো দয়া দেখানো চলবে না?”
“মুহাম্মদ-মুকীম আরগুন আর তার স্যাঙাতদের প্রতি কোনো ধরণের করুণা দেখাবে না। তবে মেয়েমানুষ আর বাচ্চাদের কোনো ক্ষতি কোরো না।”
“আমি আপনাকে নিরাশ করবো না।” বাবুরীর চোখের নিচের উঁচু হাড়ের জন্য তার চেহারায় একটা শিকারী নেকড়ের মতো অভিব্যক্তি ফুটে উঠে।
