“সবসময়ে এভাবেই বিষয়গুলো চলে এসেছে…”
“কিন্তু আমি আপনাকে পরিষ্কার করে বলেছিলাম, ঘোড়ার ব্যাপারীদের সাথে ন্যায্য আচরণ করতে। আপনি আমার কথা অমান্য করেছেন…”।
আলী ঘোসত মাথা তুলে তাকিয়ে শুকনো ঠোঁট জিহ্বা দিয়ে ভেজাতে চেষ্টা করে। “সুলতান, চেঙ্গিস খানের আমল থেকে আমার লোকদের মাঝে প্রচলিত প্রথা সম্পর্কে সুলতান আপনি জানেন। দরবারের সর্বোচ্চ অমাত্য নয় বার আদেশ অমান্য না করা পর্যন্ত শাস্তি পায় না।”
“আর আপনি কমপক্ষে বারোবার আমার আদেশ অমান্য করেছেন…আমার কাছে পুরো বিবরণ আছে।”
ঘোড়ার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত অমাত্য আরো নতজানু হয়ে যায়। বাবর তার নতজানু হয়ে থাকা মাথার দিকে তাকিয়ে থাকে মোটা পেষল গর্দানটা জল্লাদের খড়গের কাছে কেমন অরক্ষিত মনে হয়। আলী ঘোসতও নিশ্চয়ই জানেন পৃথিবীর বুকে তার অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। সে এখন কি ভাবছে?
দীর্ঘ মন্দ্র নিরবতায় বাবরের মনে হয় তার চারপাশের সব পারিষদবর্গ তাদের নিঃশ্বাস চেপে রেখেছেন।
“আপনাকে দরবারের কাজ থেকে বরখাস্ত করা হলো। আজ সূর্যাস্তের পরেও যদি আপনাকে কাবুলে দেখা যায়, তাহলে কেউ আপনার মৃত্যু ঠেকাতে পারবে না। আমার সামনে থেকে একে নিয়ে যাও।”
“আপনার উচিত ছিলো তাকে প্রাণদণ্ড দেয়া।” বাবুরী পরে বাজপাখি উড়াতে তারা শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত প্রাসাদ থেকে বের হলে বলে। বাবরের বাজপাখি একটা সোনালী শেকল দিয়ে তার দস্তানার কব্জির সাথে আটকানো, মাথায় পরানো হলুদ চামড়ার টোপরের নিচে অস্থিরভাবে পাখিটা মাথা নাড়ছে, বুঝতে পেরেছে শীঘ্রই আবার সে আকাশে উড়বার সুযোগ পাবে।
“তুমি কথাটা বলছো কারণ আলী ঘোসতকে তুমি অপছন্দ করতে…সে তোমাকে বেধড়ক পিটিয়েছিলো…”
“সে আমাকে আরো বলেছিলো ঘোড়ার লাদি পরিষ্কার করাই আমার পক্ষে উপযুক্ত কাজ…না, অবশ্যই আমি তাকে পছন্দ করি না। আপনি জানেন বুড়ো ছাগলটাকে ঘৃণাই করি। সে ছিলো একজন উদ্ধত, আত্মগর্বী শূরন্মন্য যে তার উধ্বতনদের তোষামদ করে, আর অধস্তনদের সবসময়ে তোপের মুখে রাখে। কিন্তু আমি কথাটা, সেজন্য বলিনি। আপনার নিজের লোকেরা আর কাবুলের বাসিন্দারা এর ফলে মনে করবে আপনি আবেগপ্রবণ আর দুর্বল।”
বাবর ঘোড়র উপরে ঝুঁকে বসে বাবুরীর কব্জি আঁকড়ে ধরে। “কেউ যদি এমনটা ভাবে তাহলে ভুল করবে। তাকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়ে আমি বরং সাহসের পরিচয় দিয়েছি। তার প্রাণদণ্ডের আদেশ দেয়াটাই আমার পক্ষে সহজ ছিলো। আমার যখন মাত্র বারো বছর বয়স, তখন আমি আমার মরহুম আব্বাজানের কুচক্রী উজির কামবার আলীর গর্দান নিজে নিয়েছিলাম। কিন্তু আলী ঘোসত, আমি যখন সিংহাসনবিহীন অবস্থায় ভবঘুরে জীবনযাপন করেছি, তখন আমার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছে এবং সেজন্য সে সামান্যই অর্জন করেছে। সে যাই হোক, ভবিষ্যতে আমার কোনো লোক যদি আমার আদেশ অমান্য করে- সে যেই হোক- নির্ঘাত মারা পড়বে।”
*
যদিও সেটা ছিলো বসন্তের শুরুর দিকে, কিন্তু কাবুলের লোকেরা উত্তরের হিমশীতল এই বাতাসকে পারওয়ান বলতো। শহরের আস্তানার নিচের হ্রদের গাঢ় সবুজ পানিতে তখনও সাদা বরফের ছিটেফোঁটা দেখা যেত আর লতাগুল্মের আড়ালে আশ্রয় নেয়া হাঁসের পালকে আলোড়িত হয়। কিন্তু বরফ এ বছরের মতো গলে গিয়েছে। তৃণভূমি আর পশুচারণভূমিতে আবার নতুন প্রাণের আগমনী ধ্বনিত হচ্ছে। পাহাড়ের পাদদেশ লাল টিউলিপ ফুলে ভরে উঠেছে আর জঙ্গলে বিরহকাতর বনমোরগ সঙ্গীর খোঁজে অনরবত ডেকে চলেছে। কৃষকরা গরম কাপড়ে দেহ। ভালমত আবৃত করে দ্রাক্ষাকুঞ্জের সারি সারি গাছের যত্ন নেয়। কয়েকমাসের ভিতরে যা সোনালী রঙের মিষ্টি আব-আরে ভরে উঠবে যা থেকে প্রস্তুত সুরা গ্রীষ্মকালে আর্মত্যরা পাহাড় থেকে নিয়ে এসে সংরক্ষণাগারে রক্ষিত বরফের। সাহায্যে উপভোগ করবেন।
বাবর নেকড়ের চামড়ার কম্বলের নিচে থেকে নিজের দেহ বের করে আনে। এখনও রাতেরবেলা উষ্ণতার জন্য কম্বলটা তার দরকার হয়। যদিও নেদারি মেয়েটা সে যেখান থেকে এসেছে সেই পাহাড়ে সংগৃহীত উজ্জ্বল তামাটে রঙের মধুর মত তার ত্বক- সকাল পর্যন্ত সে তার সাথে বিছানায় অবস্থান করে, রক্ত উষ্ণ রাখার জন্য যা যথেষ্ট। আজ পরে কোনো সময়ে সে হয়ত বাবুরীর সাথে শিকারে যাবে। যদিও অল্পই শিকার পাওয়া যায়। পাহাড়ী ভেড়ার পাল তাদের শীতকালীন আর গ্রীষ্মকালীন চারণভূমির মাঝে আনাগোনা করছে আর মাঝে মাঝে বন্য গাধার দেখা পেলে বেশ ভালোই আমোদ হয়।
অথবা সে সম্ভবত কাবুলের উপরে পাহাড়ের অবস্থিত তৃণভূমিতে তৈরি করা বাগান প্রদর্শনে যেতে পারে। পাটমুনিষের দল ইতিমধ্যে মাটি পরিষ্কার করতে শুরু করেছে এবং শীতল মাটি খুড়ে পানি সরবরাহের নালা, কেন্দ্রীয় জলাধার এবং কাছের নদী থেকে পানি এনে ঝর্ণা তৈরির কাজ শুরু করেছে। শীঘ্রই তার সাম্রাজ্যের পূর্বদিক থেকে নিয়ে আসা টক-চেরীর চারা, আপেল, ডালিম আর লেবুর চারার সাথে রোপিত হবে। উর্বর ভূমিতে গাছগুলো দ্রুত বেড়ে উঠবার কথা। তার আম্মিজান আর নানীজান তার কাছে এসে পৌঁছাবার আগেই আশা করা যায় দেখার মতো একটা বাগান তৈরি হবে।
বাবর কম্বলটা ছুঁড়ে ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙে। তার কক্ষের পূর্বদিকের চন্দনকাঠের দরজায় খোদাই করা জাফরির ভিতর দিয়ে সূর্যের আলো ভিতরে প্রবেশ করছে। দরজাটা খুলতে অন্যপাশে একটা পাথরের বারান্দা রয়েছে যেখান থেকে নিচের আঙ্গিনা দেখা যায়। বহু শতাব্দি ধরে কাবুলের সুলতানেরা উৎসবের সময়ে এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রজাদের দর্শন দিতেন। সেই অধিকার সেও লাভ করেছে ভাবতেই তার ভালো লাগে।
