ইমাম নতুন প্রার্থনা শুরু করতে, বাবর মনোযোগ দিয়ে শুনে:
পরম করুণাময়, আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন
যার কাছ থেকে ইচ্ছা সেটা কেড়েও নেন।
যাকে ইচ্ছা করেন তাকে সমৃদ্ধি দান করেন।
এবং যাকে ইচ্ছা করেন তাকে ধ্বংস করে দেন।
সকল পবিত্রতার উৎস কেবল আপনিই।
আপনিই সবশক্তিমান। আল্লাহতা’লা আসলেই সর্বশক্তিমান আর তিনি বাবরের প্রতি সদাশয়।
৩.১ তৃতীয় খণ্ড – তরবারির বরাভয়ে শাসন
তৃতীয় খণ্ড – তরবারির বরাভয়ে শাসন
১৫. ধনুর্ধর সর্দার
শহরের কোষাগার বাবর যেমনটা আশা করেছিলো তারচেয়েও বেশি সম্পদে পূর্ণ ছিলো। শহরদূর্গের আস্তাবলের নিচে পুঁতে রাখা সিন্দুক হাজারারা খুঁজে পাবে না
বলে ওয়ালি গুল যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো কার্যত তাই হয়েছে। “সুলতান, ব্যাটারা যদি কেবল ঘোড়ার লাদি সরিয়ে দেখতো, তাহলেই তারা হয়তো সিন্দুক দেখতে পেতো, কিন্তু এমন কাজ করাটা হাজারীদের মর্যাদার পক্ষে অচিন্তনীয়।” বৃদ্ধ লোকটা পুরোটা সময় আনন্দে খিলখিল করে হাসতে থাকে যখন ভৃত্যেরা হাঁটু পর্যন্ত গভীর তাজা ধোঁয়া উঠতে থাকা ঘোড়ার লাদি আর খড়কুটো সরিয়ে গোপন দরজা আর সিঁড়ির ধাপ উন্মোচিত করে যা আটটা ভূগর্ভস্থ কক্ষের দিকে নেমে গেছে। পুরু লোহা দিয়ে বাঁধানো ওক কাঠের দরজার পেছনে পর্যাপ্ত সোনা আর রূপার মোহর ছিল যা দিয়ে বাবর তার লোকদের ভালোমত পুরস্কৃত করতে পারে। নতুন লোক নিয়োেগ করতে পারে। আর তার নতুন সাম্রাজ্যের সৌন্দর্যবর্ধন করতে পারে।
সে পর্যালোচনা করতে থাকা বিশাল পরিকল্পনার ছকটা গুটিয়ে রাখে। নকশাটায় কাবুলের কেন্দ্রস্থলে সদ্যপ্রাপ্ত সম্পদের কিছুটা ব্যয় করে সে যে বিশাল গম্বুজযুক্ত মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছে। সেটা চারকোণা প্রকোষ্ঠের আকারে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাকে যদিও কাবুল আর এর চারপাশে বিশাল অঞ্চলে এখানকার সর্দারটা আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছে এবং তার নতুন প্রজারা তাকে স্বাগত জানিয়েছে সমতলে বসবাসকারী আইমাক, পাসাহিস, তাজিক, বারাকিস, এবং পাহাড়ের হাজারা আর নেগুডারিস, এবং কাবুলের বাসিন্দা- এদের ভিতর ফারগানার গোত্রগুলোর চেয়ে ঈর্ষা আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কার্যত বেশি। তাদের মনে করিয়ে দিতে কোনো ক্ষতি নেই- তার মতো সুন্নী মুসলমান- আল্লাহতালার ইচ্ছা যে সে তাদের শাসক হবে।
আর তাছাড়া শহরটায় তার নিজের একটা স্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়ার অনুভূতিই আলাদা- এমন একটা সৌধ যা আগামী শাসকদের তার কথা মনে করিয়ে দেবে। সমরকন্দে যা তৈরি করার সুযোগ সে পায়নি। সেখানে সে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারেনি। আর তাছাড়া তৈমূরের দ্বারা আগেই সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলা শহর সে কিভাবে নতুন করে অলঙ্কৃত করতো। কাবুলে অবশেষে সে সুযোগ পেয়েছে। তৈমূরের উত্তরসুরী শাহজাদার মহিমায় শহরটাকে সাজিয়ে তোলার এমন একটা স্থান যেখানে শিল্পী আর সাহিত্যিকেরা এসে মিলিত হবেন।
এখন অবশ্য তাকে কিছু অপ্রিয় কাজ করতে হবে। একমাস আগে বাইসানগার তাকে বলেছিলো আলী ঘোসত- বাবরের অশ্বশালার প্রধান, যাকে সে সেনাবাহিনীর রসদের প্রধান ভারপ্রাপ্ত অমাত্য নিয়োগ করেছিলো- কাবুলে নির্দিষ্ট কিছু ঘোড়া আর ঘোড়ার খাদ্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে তাদের প্রতি বেশি উদারতা দেখিয়েছেন। বাবরের প্রত্যক্ষ আদেশের বিরুদ্ধে এটা। সে স্থানীয় লোকদের কাছে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, সে তাদের সাথে নায্য আচরণ করবে। এখন আলী ঘোসতের লোভের কারণে, সুলতান এতো সহজে তার কথার বরখেলাপ করেছেন বলে তারা যে ফিসফিস শুরু করেছিলো তার যথোপযুক্ত প্রমাণ পাবে…।
কোনো পদক্ষেপ নেবার আগে বাবর আরো প্রমাণ চেয়েছিলো- সে ছোটবেলা থেকেই আলী ঘোসতকে চেনে, এই লোকটার কাছেই সে ঘোড়ায় চড়া আর পোলো খেলা শিখেছিলো। কিন্তু বাইসানগার যখন আরো প্রমাণ হাজির করায়, তাকে এখন ব্যবস্থা নিতেই হবে। সে তার খিলানাকৃতি দরবার মহলের দিকে এগিয়ে যায়। যেখানে তার গিল্টি করা সোনার সিংহাসনের দুপাশে তার পারিষদবর্গ মর্যাদা অনুসারে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সবচেয়ে বয়স্ক আর মর্যাদাবান তার সিংহাসনের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়ে। বাবর বাইসানগারকে ইঙ্গিত করে। “রসদের দায়িত্বপ্রাপ্ত অমাত্যকে নিয়ে আসা হোক।”
সে চোখেমুখে নির্বিকার অভিব্যক্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখে, আলী ঘোসত তার পরিচিত প্রগতজানু হাঁটার ভঙ্গিতে এখন শিকলের কারণে অনেক বেশি প্রকট পা হেচড়ে হেচড়ে এগিয়ে আসে। তাকে আপাতদৃষ্টিতে অবজ্ঞাপূর্ণ দেখালেও বাবর জানে লোকটা ভেতরে ভেতরে শঙ্কিত। তার মুখে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট এবং ভীতচকিত চোখে উপস্থিত অমাত্যদের দিকে তাকাতে তাকাতে সে সিংহাসনের দিকে এগিয়ে আসে। সে পুরোটা সময় একবারও বাবরের দিকে তাকায় না এবং তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীরা তাকে তাদের বর্শার উল্টোদিক দিয়ে ধাক্কা দেবার আগেই সে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে।
“আপনি জানেন আপনার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আনা হয়েছে…”
“সুলতান আমি-”
“আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”
“হ্যাঁ, সুলতান।”
“আর সেটা কি সত্যি?”
