তার লোকেরা সমরসজ্জায় তার পেছনে বিন্যস্ত হয়, বাবর ধীরে ধীরে শহর অতিক্রম করে দূর্গপ্রাসাদের দিকে এগিয়ে যায় এবং তারপরে দাঁড়িয়ে পড়ে। নিজের। লোকদের শহর কিংবা দূর্গপ্রাসাদ থেকে আকস্মিক কোনো আক্রমণ মোকাবেলার। জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকতে বলে, সে কাশিমকে তার কাছে ডেকে পাঠায়। “আরো একবার আমার দূতের দায়িত্ব তোমাকে পালন করতে হবে। একদল প্রহরী নিয়ে দূর্গপ্রাসাদে গিয়ে মোহাম্মদ মুকুইম আরগুনকে আমার চুড়ান্ত হুঁশিয়ারী পৌঁছে দিয়ে এসো। সূর্যাস্তের ভিতরে সে যদি বন্দিদের মুক্তি দিয়ে শহর আর দূর্গপ্রাসাদ ত্যাগ করে, তাহলে সে নিরূপদ্রবে কোনো ক্ষতি স্বীকার না করেই ফিরে যেতে পারবে। সে যদি এটা মানতে রাজি না হয়, তবে আমি তাকে কোনো রেয়াত করবো না।”
বাবর চারজন সৈন্য নিয়ে কাশিমকে দূর্গপ্রাসাদের দিকে দুলকিচালে ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে দেখে। দূতের দায়িত্ব পালন করা সব সময়েই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কাশিম এর আগেও এমন পরিস্থিতিতে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে এবং বাবর নিশ্চিত এই দফা তাকে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে না…আরগুনের সাহস হবে না তার কোনো ক্ষতি করার। ইত্যবসরে অন্য কিছু কাজ সম্পন্ন করতে হবে। সে বাইসানগারকে ডেকে পাঠায়। “আমি চাই শহরের লোকেরা আমার আদেশের কথা জানতে পারুক। আমার বার্তার প্রতিলিপি আমি লিপিকরদের তৈরি করতে বলেছি। আপনার সেরা ধনুর্ধরদের বলেন তীরের মাথায় বেঁধে সেগুলো শহরে ছুঁড়ে মারতে, যাতে লোকেরা পড়তে পারে তাতে কি লেখা রয়েছে।”
এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। একটাই অসুবিধা, বড্ড মাছি এখানে। তাদের কারণে তার ধূসর ঘোড়াটা অস্থির হয়ে উঠেছে এবং লেজ দিয়ে অনবরত পিঠের দুপাশে আঘাত করছে। সে জিন থেকে নেমে আসে এবং দুপায়ে বাঁধন জড়িয়ে দেয়। যাতে চড়ে বেড়াতে পারলেও দূরে সরে যেতে না পারে এবং আসনপিড়ি করে পাথুরে মাটিতে বসে পড়ে। মাথার অনেক উপর দিয়ে বকের একটা ঝাঁক উড়ে যায়, বেহেশতের পাখি। আল্লাহতালা তার সহায় তারই একটা সূচক।
“আপনার কি মনে হয়, সে কি করবে?” বাবুরী ঘোড়ার লাগাম ধরা অবস্থায় তার পাশে বসে পড়ে বলে।
“হাজারা দস্যুটা? সে সাইবানি খান না। আমার ধারণা নিজের লোকেরাই তাকে সমর্থন করে না। তার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। আমি তাকে ছেড়ে দেবো বলে ঠিক করেছি।”
“আপনি বদলে গিয়েছেন। আপনার আমাদের ভিতরে সেই মারামারির কথা মনে আছে? যখন আমি আপনাকে আত্ম-করুণার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলাম।”
“তুমি ঠিক কথাই বলেছিলে। আমার নিজের জন্য আসলেই করুণা হচ্ছিলো। তুমি আমাকে নিজের উপরে বিশ্বাস ফিরে পেতে সাহায্য করেছিলে- যে অনেক কিছুই ঘটতে পারে…রাস্তায় বড় হবার কারণে তুমি আমার চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ। শাহজাদাদের তরুণ বয়সে ঘর থেকে বের করে দেয়া উচিত, যাতে তারা নিজেদের রক্ষা করতে শিখে…”।
“সম্ভবত অবশ্য আমি খাবারের কথা ঠিক বলতে পারছি না…বা বদ বুড়ো লোকগুলো যারা গলিপথে আপনাকে কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দেবে।”
বাবর হাসে।
পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন মাত্র এক বর্শা উপরে অবস্থান করছে এবং সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এমন সময় কাশেম ফিরে আসে। তার চেহারায় উফুল্লভাব ফুটে আছে। “হাজারারা নিজেদের ভিতরে ঝগড়া করছে কেউ মারামারিও আরম্ভ করেছে। কিন্তু মোহাম্মদ মুকুইম আরগুন আপনার প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। সে তার লোকদের নিয়ে দূর্গপ্রাসাদ ত্যাগ করে উত্তরে ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে শহরে অবস্থানরত সৈন্যদেরও তার সাথে যোগ দেবার আদেশ দিয়েছে। তিনি আপনাকে দু’ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলেছেন। তারপরে আপনি শহর আর বন্দিদের দায়িত্ব। গ্রহণ করতে পারবেন…”
“আমি যা ভেবেছিলাম সে আমাকে তারচেয়েও বেশি ভয় পেয়েছে। তুমি ভালো কাজ করেছে।”
খবরটা বাবরের সৈন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে তারা ঢালের উপরে তরবারি ঠুকে তুমুল উল্লাসে ফেটে পড়ে এবং সেই সাথে আরো একটা শব্দও ভেসে আসে। যদিও অনেক দূর থেকে আর হাল্কাভাবে ভেসে আসছে। কিন্তু নির্ভুলভাবে বোঝা যায় শহরের ভিতরে থেকে একটা কোলাহল ভেসে আসছে। শহরবাসীরা নিশ্চিতভাবেই জানতে পেরেছে কি ঘটেছে।
বাবর আবার ঘোড়ায় চেপে বসে এবং নিজের লোকদের সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। “আমাদের দেখেই এই হঠকারী লোকটা নিজের প্রস্রাবে পিছলে পড়েছে। কিছুক্ষণের ভিতরেই মার খাওয়া কুকুরের মতো যে ডাকতেও ভয় পায়, সে আর তার লোকেরা শহর ত্যাগ করবে। পড়ন্ত আলোতে শহর ত্যাগ করার সময়ে সে যেনো ভালো করে আমাদের হৈহুল্লোড়ের শব্দ শুনতে পায়। তাদের তরবারি এখন উজ্জ্বল আর রক্তের দাগবিহীন, সম্মান ভূলুণ্ঠিত।
সেই রাতে, বেগুনী আর সোনালী আলখাল্লা পরিহিত অবস্থায় কাবুলের সুলতানের রঙ- শাহী দরবারের অমাত্যরা আর নিজের সেনাপতিদের সাথে নিয়ে বাবর কাবুলের প্রধান মসজিদে প্রবেশ করে। মিহরাবের ঠিক নিচে সুলতানের নামাজের স্থান নির্ধারিত রয়েছে যেখানে তৈমূর হিন্দুস্তান অভিযানের সময় নিশ্চয়ই নামাজ আদায় করেছিলেন। বাবর পাথুরে মেঝেতে কপাল ঠেকিয়ে মনে মনে ভাবে। শাহী মসজিদের ইমান তার নামে খুতবা পাঠ করতে তাকে সুলতান ঘোষণা করার পবিত্ৰক্ষণে- সে নিজের ভেতরে আশা আর গর্বের একটা উৎসরণ অনুভব করে। এখন আর সে গৃহহীন যাযাবর না।
