তৃতীয় দিন সে তার তাঁবুর বাইরে বসে বাবুরীর তীর বাছাই করা দেখছে। এমন সময় তৃণভূমির উপর দিয়ে একটা ছোট অশ্বারোহী দলকে সে তার তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে।
“তোমার কি মনে হয়? দূত ফিরে এসেছে?” চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বাবর জিজ্ঞেস করে। লোকগুলো অনেক দূরে থাকায় তাদের ঠিকমতো চেনা যায় না। কিন্তু তার তাঁবুর দিকে খুব অল্প সংখ্যক লোকই সরাসরি এগিয়ে আসতে পারে। যার মানে তারা মিত্রই হবে। লোকগুলো আরো কাছে আসতে বাবর দূতের ময়ূরকণ্ঠী নীল রঙের আচকান আর তার পাগড়ীতে রত্নখচিত পিন দিয়ে সংযুক্ত লম্বা পালক চিনতে পারে।
“সুলতান আপনাকে স্বাগতম। আপনি নিরাপদে আসতে পেরেছেন দেখে আমি আনন্দিত এবং নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে একটা বিশাল বাহিনীও আপনি নিয়ে এসেছেন। শাহী দরবার আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছে।”
বাবর মাথা নাড়ে। “আমি কবে নাগাদ শহরে প্রবেশ করতে পারবো?”
দূতের বাদামী চোখ পিটপিট করে উঠে। “সুলতান একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। মোহাম্মদ মুকুইম আরগুন নামের এক জবরদখলকারী কাবুল আর কাবুলের উপরে অবস্থিত দূর্গপ্রাসাদ দখল করে নিয়েছে। শাহী দরবার শহরের বাইরে অল্প কিছু সংখ্যক অনুগত সৈন্য নিয়ে কারাবাগে পালিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তারা পুনরায় শহর দখল করতে পারবে না।”
“এই ভুইফোড়টা কে?”
“হাজারা গোত্রের এক সর্দার। সে তার দলবল নিয়ে জোর করে শহর দখল করেছে।”
“সে কি নিজেকে সুলতান হিসাবে ঘোষণা করেছে? তার নামে কি খুতবা পাঠ করা হয়েছে?”
“না, সুলতান এখনও হয়নি। তার নিজের গোত্রের ভিতরেই অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে।”
“তার সাথে কতো সৈন্য আছে?”
“সুলতান সম্ভবত এক হাজার হবে, এর চেয়ে কিছু বেশি বা কমও হতে পারে।”
“আমার সাথে চার হাজার যোদ্ধা আছে যারা যুদ্ধের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। আপনার শাহী দরবারকে খবরটা গিয়ে জানান। না আমাকেই কারাবাগে নিয়ে চলুন। আমি হিন্দুকুশ অতিক্রম এখানে এজন্য আসিনি যে অন্য কেউ লাভবান হবে।”
“হ্যাঁ, সুলতান।” কাবুলের শাহীদূত এতক্ষণে তার সামনে নতজানু হয় এবং মাটিতে মাথা স্পর্শ করে। বাবর ভাবে, এই প্রথমবার সে তাকে সুলতান হিসাবে কুর্নিশ করলো।
***
“আ-আ-আমার পরামর্শ হলো আপনি অ-অ-অপেক্ষা করেন।” বাহলুল আইয়ুব উত্তেজনার কারণে তোতলাতে তোতলাতে বলে। রাশভারি বৃদ্ধ লোকটা নিজের বিশাল রেশমী দাড়িতে হাত বুলায়। কাবুলের গ্রান্ড উজির হিসাবে তার পদমর্যাদা আর বয়সের কারণেই তিনি সম্মানের অধিকারী। তার মতামতের গুরুত্ব না দিলেও, বাবর অসহিষ্ণু চিত্তে ভাবে, যদিও শাহী দরবারের অন্যসব গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, ওয়ালি গুল শাহী কোষাগারের রক্ষক, এবং হায়দার তকী, শাহী সীলমোহরের রক্ষক, তারাও তাদের সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ে।
“দেরি করলে কি লাভ হবে? এতে করে হাজারারা কেবল উৎসাহিত হবে এবং বিশ্বাস করবে যে আমি তাদের ভয়ে ভীত। শাহী দরবারের কর্তৃত্ব আমার রয়েছে। আমি রাজরক্তের অধিকারী। আমার সাথে একটা শক্তিশালী সেনাবাহিনী আছে। আর কি প্রয়োজন?”
“আ-আ-আমরা কাবুলের অধিবাসীদের নিয়ে চিন্তিত। মোহাম্মদ মুকুইম আরগুন শহরের অভিজাত কিছু অধিবাসীকে বন্দি করেছে আমাদের পরিবারের সদস্যও তার ভিতরে রয়েছে এবং দূর্গপ্রাসাদে তাদের আটকে রেখেছে।”
“সে যদি তাদের ক্ষতি করার মতো দুর্মতি দেখায় তবে তাকে সেজন্য মূল্য দিতে হবে। আমি তাকে সেটা পরিস্কার বুঝিয়ে দেবো। আমি তাকে আরও বুঝিয়ে দেবো যে, আমি কোনো ডাকাত নই। আমি কাবুলের নতুন সুলতান, যিনি নিজের সালতানাতের দখল বুঝে নিতে এসেছেন।“
তিন বৃদ্ধ এবার পালাক্রমে নিজেদের দিকে তাকায়। বাবর ভাবে, তার কথা বুড়ো লোকগুলোর মনে ধরেছে। সম্ভবত তারা ভুলে গিয়েছিলো কার সাথে তাদের পালা পড়েছে: এমন একজন- ভাগ্য যাকে বিড়ম্বনায় ফেললেও নিজের প্রতিভা আর সাহসের বলে ইতিমধ্যেই যিনি একজন সুলতান।
“সুলতান আমরা আপনার আ-আদেশের অনুবর্তী। আমরা সেটা মেনে নিয়েছি।”
শরতের উজ্জ্বল আলোয় কাবুলের চারপাশে অবস্থিত শহর রক্ষাকারী দেয়াল আখরোটের মতো গনগনে দেখায়। বেষ্টনীকৃত দেয়ালের পেছনে বাবর প্রাসাদ, বাড়ি, মসজিদ আর সরাইখানা দেখতে পায়। সমরকন্দের মতো মনোরম না। কিন্তু এখানকার সম্পদ ব্যবহার করে সে একেই সুন্দর আর জৌলুসপূর্ণ করে তুলবে। চীন, তুরস্ক, হিন্দুস্তান আর পারস্যের মাঝে অবস্থিত কাফেলা বহরের চলাচলের পথে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হবার কারণে কাবুল বেশ সমৃদ্ধ শহর। শাহী দরবারের অমাত্যরা তাকে গর্ব করে বলেছে যে, প্রতিবছর বিশ হাজার ঘোড়া, উট আর অন্য মালবাহী প্রাণীর বহর এখান দিয়ে মশলা, চিনি, রেশম আর মূল্যবান পাথর নিয়ে এখান দিয়ে অতিক্রম করে।
শহরের উপরে উত্তরে, নিঃসঙ্গ পাথরের একটা স্তূপের মাথায় দূর্গপ্রাসাদ অবস্থিত। এর মসৃণ দেয়ালে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফাঁকা স্থান দেখা যায়। বাবর জানে এই মুহূর্তে অনেক চোখ- যাদের ভিতরে মোহাম্মদ মুকুইম আরগুনও রয়েছে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, আর সেও সেটাই চায়। সে তার লোকদের যতোটা সম্ভব সুসজ্জিত হতে বলেছে। তরবারি, বর্শা আর রণকুঠারের ফলা আলোয় ঝলসে উঠে। কাঁধের উপরে ধনুক ঝুলছে। আর পিঠে তীর ভর্তি তৃনীর। তার ইচ্ছা শত্রু যেনো তার সামর্থ্যের ব্যাপারে কোনো ভুল ধারণা না করে।
