বাবর, বাবুরী আর বাইসানগারকে সাথে নিয়ে তার লোকদের অবস্থা পরিদর্শন করতে বের হয়ে কারো কারো অবস্থা দেখে তারা আঁতকে উঠে। তারা আদেশ সত্ত্বেও অনেকেই পাহাড়ের জন্য উপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়ে আসেনি। সূর্যের আলোয় মুখের চামড়া ফেটে গেলেও মোঙ্গলদের প্রাণবন্তই দেখায়। কিন্তু মীর্জা খানের সৈন্যদের অবস্থা শোচনীয়। বেশ কয়েকজনের অন্তত ডজনখানেক হবে তাদের সংখ্যা, যাদের হাত পা হিম-দংশের আক্রমণে কালো হয়ে ফুলে উঠেছে।
বাবর আগেও এমন তীব্র হিম-দংশের আক্রমণ দেখেছে। তার লোকদের বাঁচাতে হলে এখন কেবল একটা উপায়ই আছে। শীঘ্রই শিবিরে দাউদাউ করে আগুন। জ্বলতে থাকে। আর শান পাথরে ঘষে খঞ্জরে ধার দেয়া শুরু হয়। তাদের এই যন্ত্রণা কোনো মাদক দিয়েই নাকচ করা সম্ভব না। এই লোকগুলো যাদের হাত বা পায়ের আঙ্গুল সংক্রমণের শিকার হয়েছে, মুখের ভিতরে ভাঁজ করা কাপড়ের টুকরো রেখে যাতে তারা জিহ্বা কামড়াতে না পারে, কেটে ফেলা।
মীর্জা খানের নিশান বাহক- মোল বছরের সুদর্শন দেখতে এক তরুণ যার ডান হাত কালো হয়ে ফুলে ছোট একটা তরমুজের আকৃতি নিয়েছে এবং আঙ্গুলের নিচে দিয়ে হলুদ পুঁজ বের হয়ে আসছে। অনেক চেষ্টা করেও সৈন্যদের খঞ্জরের ধার। পরীক্ষা করতে দেখে নিজের কান্না চেপে রাখতে পারছিলো না।
“সাহস রাখো৷” বাবর তার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে। “খুব দ্রুত এটা শেষ হবে আর তুমি অন্তত প্রাণে বেঁচে যাবে… আমার দিকে তাকিয়ে থাকো আর ভুলেও নিচের দিকে তাকিও না।” বাবর শক্ত করে তার কাঁধ চেপে ধরে এবং একজন তার। হিম-দংশে আক্রান্ত হাতটা কনুইয়ের উপরে চেপে ধরতে আরেকজন তার পায়ের উপরে চেপে বসে।
“এবার- দ্রুত করো!” বাবর আদেশ দেয়। ছেলেটার চোখ ভয়ে বড়বড় হয়ে উঠে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। খঞ্জরটা তার ডান কব্জি কেটে নেমে আসতে বেচারা ব্যাথায় মুচড়ে উঠে। কিন্তু দাঁতের মাঝে কাপড়ের টুকরো থাকায় সে কোনো শব্দ করতে পারে না। ছেলেটাকে তখনও ধরে রেখে বাবর একপাশে সরে এসে আরেকজন সৈন্যকে হাঁটু মুড়ে বসতে সুযোগ দেয় এবং আগুনে পুড়িয়ে লাল করা। একটা তরবারির পাত দিয়ে কব্জির কর্তিত স্থানের রক্তপাত বন্ধ করতে সেখানটা পুড়িয়ে দেয়। এইবার কাপড়ের কারণে চাপা শোনায় কিন্তু ছেলেটা অনেক কষ্ট করেও চেঁচিয়ে উঠা থেকে বিরত থাকতে পারে না।
মীর্জা খান আগ্রহী, কিন্তু ভাবাবেগশূন্য চোখে তাকিয়ে ছিলো। পাহাড়ের ভিতর দিয়ে সে নির্বিঘ্নেই এসেছে- তাকে এখনও প্রাণবন্ত দেখায়। কিন্তু এই লোকটার জন্য সে বিন্দুমাত্র পরোয়া করে না। বাবরের ইচ্ছা করে তার মুখটা গুঁড়িয়ে দেয়। এই ছেলেটার নাম কি?” সে জানতে চায়।
“সাইয়্যেদিন।”
“আমি তাকে আমার বাহিনীতে নিয়োগ করতে চাই।”
“যেমন আপনার অভিরুচি।” মীর্জা খান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, যেন বলতে চায় “হাত কাটা নিশান বাহক আমার দরকার নেই।”
বাবর এবার দাঁড়িয়ে থেকে একটা আলখাল্লা ছিঁড়ে সেটা দিয়ে ক্ষতস্থানে পট্টি বাঁধা দেখে। “একে আমার তাঁবুতে নিয়ে যাও আর পুষ্টিকর কিছু খেতে দাও।” সে আদেশ দেয়। “আজ সে যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছে।”
*
আক সরাই তৃণভূমি, কাবুলের প্রেরিত দূত তাদের সালতানাতের সীমান্তের কাছে সাক্ষাতের স্থান হিসাবে মনোনীত করেছিলেন। সবুজ ঘাসে ছাওয়া একটা মনোরম স্থান। বাবরের শিবিরও দর্শনীয়ভাবে স্থাপন করা হয়। সারি সারি তাঁবু যার মাঝে তার নিজের বিশাল তাবুটা স্থাপিত। আশার কথা এই যে, পাহাড়ের পাদদেশের গ্রামের অধিবাসীরা তার বাহিনীর প্রতি কোনো ধরণের বিরূপতা প্রদর্শন করেনি এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে তারা যখন উপত্যকার ভিতর দিয়ে এগিয়ে এসেছে তখনও আশেপাশের গ্রামবাসীরা কেবল পাহাড়ের উপর থেকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছে।
সেটা তখন সেপ্টেম্বর মাস। ফসল কাটা শেষ হয়েছে আর শস্যাগার পরিপূর্ণ থাকায় গ্রামবাসীরা তাদের কাছে ফসল বিক্রি করতেই বেশি আগ্রহী ছিল। রাতের বেলা আগুনের পাশে বসে নধর ভেড়ার মাংস দিয়ে আহার সেরে বাগান থেকে সদ্য সংগৃহীত পাকা আপেল আর নাশপাতি আর চাকভাঙা মধু খাবার স্বাদই আলাদা। গাছের ডালে ঘুঘু, তিতির আর অন্যসব গায়ক পাখির ডানা ঝাপটানো শোনা যায়। রাতের বেলা বাবর লালচে-বাদামী নাইটিংগেলের ডাক শুনতে পায়। সমৃদ্ধ আর উর্বর একটা স্থান। আর সে যখন এখানকার সুলতান হবে, সেও এটাকে সেভাবেই রাখবে।
কিন্তু তার আগে তাকে শিবিরে নিয়মশৃঙ্খলা স্থাপন করতে হবে। সে যদিও লুটপাট করতে মানা করেছে। কিন্তু ছয়জন লোক তার আদেশ অমান্য করে পাশের গ্রামে হামলা চালিয়ে নিজেদের গবাদি পশুর পাল রক্ষা করতে চেষ্টা করায় দু’জন কৃষককে হত্যা করেছে। বাবর দোষী ব্যক্তিদের সনাক্ত করে এবং মৃত কৃষকদের পরিবারের সামনে পাথুরে চোখে তাদের চাবকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাটা পর্যবেক্ষণ করে। সে এরপরে তাদের চাবকানো মৃতদেহ যা তখন আর মানুষের বলে চেনা মুশকিল আগাছাপূর্ণ একটা স্থানে মাটিচাপা দিতে বলে। কাবুল থেকে বার্তাবাহক যতো দ্রুত এসে পৌঁছে ততই মঙ্গল। যতবেশি সময় তাকে অপেক্ষা করতে হবে, ততোই তার বাহিনীতে এমন সব কুকর্মের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
