একই সাথে এমন বিকট একটা গর্জনের সৃষ্টি হয় যে, বাবরের মনে হয় সে বুঝি বধির হয়ে যাবে। সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে দু’হাতে কান চেপে ধরে। সে যখন কান নিয়ে ব্যস্ত এমন সময় কিছু একটা ভীষণ জোরে এসে তার বুকে আঘাত করে। আর মাথার পাশ দিয়ে অন্য কিছু একটা বের হয়ে যায়। তার চারপাশে বিক্ষিপ্ত কণা নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। তার ঘোড়া আতঙ্কে চিহি শব্দ করতে থাকলে বাবর লাফিয়ে নিচে নেমে ঘোড়ার গলার দড়ি আঁকড়ে ধরে তার পেটের নিচে আশ্রয় নেয়। তুষার ধ্বস যতোটা আকস্মিকভাবে শুরু হয়েছিলো ঠিক ততোটাই আকস্মিকভাবে শেষ হয়। তাদের চারপাশের তুষার শৃঙ্গ আবার মৌন হয়ে উঠলেও আশেপাশে থেকে আতঙ্কিত মানুষ আর পশুর যুগলবন্দি ভেসে আসতে থাকে। বাবরের মাথাটা দপদপ করে এবং পাঁজরের হাড় আড়ষ্ট হয়ে থাকা অবস্থায় সে সন্তর্পণে ঘোড়ার নীচ থেকে বের হয়ে আসে। অবোধ জন্তুটা তখনও ছটফট করলেও অক্ষত রয়েছে মনে হয়।
“সুলতান, আপনি সুস্থ আছেন?” বাম হাত দিয়ে ডান হাতটা আগলে ধরে রেখে বাবুরী এগিয়ে এসে জানতে চায়। বেচারার মুখের একপাশে ইতিমধ্যে বীভৎস একটা কালসিটে জন্ম নিয়েছে।
বাবর মাথা নাড়ে। তার পরণের মোটা কাপড়ের জন্যই এযাত্রা সে বেঁচে গিয়েছে। কিন্তু বেচারা পথপ্রদর্শক তার পায়ের কাছে হাতপা ছড়িয়ে পড়ে আছে। লোকটার মাথার নেকড়ের চামড়ার টুপি তার মাথার পেছনে আছড়ে পড়া বরফ খণ্ডের প্রচণ্ডতা থেকে তাকে বাঁচাতে পারেনি। হতভাগ্য লোকটার রক্ত আর মগজ এখন বরফের উপরে বিক্ষিপ্তভাবে ছিটিয়ে আছে।
বাবরের এবার লোকটার সতর্কবাণীর কথা মনে পড়ে। “আপনাকে সবসময়ে সতর্ক থাকতে হবে…”
পৃথিবীতে সেগুলোই ছিলো হতভাগ্য লোকটার উচ্চারিত শেষ শব্দ। তাদের মাথার উপরে চূড়ার বরফ আবারও সূর্যের আলোয় চিকচিক করে। কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে আবার মৃত্যুগ্রাসী তুষারখণ্ড নিক্ষিপ্ত করতে পারে আগাম ঘোষণা না দিয়ে। তার লোকদের এখনই এই মৃত্যুউপত্যকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
“আহতদের একত্রিত করো।” সে মৃদু কণ্ঠে বলে। “আমাদের পক্ষে যতদ্রুত সম্ভব এই এলাকা ত্যাগ করতে হবে। আদেশটা সারির শেষপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেবার বন্দোবস্ত করো।”
সে এবার আবার তার পায়ের কাছে দলামুচড়ে পড়ে থাকা দেহটার দিকে তাকায়। আশেপাশে কোথাও সে লোকটার ছেলেটাকে দেখতে পায় না। আর এখন তাকে খোঁজার সময়ও নেই। “বাবুরী, আমাকে সাহায্য করো…”
পথপ্রদর্শক লোকটা বিশালদেহী ছিলো। আর বাবুরীর ঘোড়ার উপরে তাকে উঠাতে তারা দুজনে হিমশিম খেয়ে যায়। কিন্তু লোকটাকে এখানে রেখে যাওয়াটা অমানবিক হবে। একটা উপযুক্ত স্থানে তাকে সমাধিস্থ করতে হবে। সেটা তার প্রাপ্য। আর বাবর তার জন্য তেমনই একটা স্থান খুঁজে বের করবে- সম্ভবত গিরিপথের কোথায় যেখানে তার আত্মা শান্তিতে বিশ্রাম নেবে।
তারা যতোটা দ্রুত সম্ভব এগিয়ে যায়। পরিশ্রান্ত পা বরফাবৃত মাটিতে পিছলে যায় হোঁচট খায়। অবশেষে তারা একটা উপত্যকায় এসে উপস্থিত হয়। বাবর ভাবে, তুষারপাতের আক্রমণ থেকে তারা এখানে নিরাপদ থাকবে এবং ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নেবার আদেশ দেয়। সে যেমন ভয় পেয়েছিলো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তেমন ব্যাপক না- আঠার জন লোক মারা গেছে। এর প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক আহত হয়েছে। বেশির ভাগেরই আঘাত তেমন গুরুতর নয়। এছাড়া ছয়টা ঘোড়া আর তিনটা মালবাহী খচ্চর মারা গেছে বা চলার অনোপযোগীভাবে আহত হয়েছে। বাবরের লোকেরা ইতিমধ্যে তাদের জবাই করে তাদের মাংস রান্নার বন্দোবস্ত করেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারতো….
“সুলতান…” একটা কিশোর কণ্ঠ তার ভাবনার জাল ছিন্ন করে। পথপ্রদর্শক লোকটার ছেলে। তার চোখ লাল, কিন্তু কণ্ঠস্বর সংযত। “সামনের রাস্তা আমি চিনি। আমি এখন আপনার পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত আছি। আমার আব্বাজান বেঁচে থাকলে এটাই চাইতেন…”
“তোমার সাহসের আমি প্রশংসা করি। আর তোমার আব্বাজানের মৃত্যুর জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত।” বাবর মাথা নেড়ে বলে। যাত্রা শেষে তাকে উপযুক্তভাবে পুরস্কৃত করবে বলে ঠিক করে।
ভোরের ঠিক আগে তারা সেই কিশোর ছেলেটার নেতৃত্বে তারা হুপিয়ান গিরিপথ অতিক্রম করতে শুরু করে। দক্ষিণের আকাশে অনেক নিচুতে তখনও একটা নিঃসঙ্গ তারাকে জুলজুল করতে দেখা যায়।
বাবর তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। “ওটা কি তারা? আমি আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।”
বাবুরী অজ্ঞতা প্রকাশ করে। কিন্তু বাইসানগার জানে। “সুলতান ওটাকে বলে ক্যানোপাস। সমরকন্দ কিংবা ফারগানার উত্তরের আকাশে এটা দেখা যায় না। কিন্তু সমরকন্দে তৈমূরের পৌত্র জ্যোতিষ উলুঘ বেগের লেখায় আমি এর কথা পড়েছি। সেখানে একটা বিখ্যাত কবিতার পংক্তি রয়েছে: ক্যানোপাস কততদূর বিস্তৃত তোমার উজ্জ্বলতা আর কোনো আকাশে তোমার উদয়? যাদের উপরেই তোমার রশ্মি নিঙড়ে পড়ে তাদের সবার জন্যই তোমার চোখের তারায় সৌভাগ্যের চিহ্ন অংকিত থাকে।
বাবরের চোখের সামনে ভোরের আলো ফুটে ওঠায় তারাটা বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু বার্তাটা ভালোই রেখে যায়। সৌভাগ্যের সূচক এমন একটা সংকেতই তার প্রয়োজন ছিলো এবং সে উদ্দীপ্ত বোধ করতে থাকে। আট ঘণ্টা পরে সে আরও উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, যখন বরফাবৃত ভূখণ্ড তৃণভূমিতে রূপান্তরিত হয়। গত তিনদিনে এই প্রথম তারা তাঁবু খাটাতে পারে এবং গায়ের কাপড় আর পায়ের জুতো খুলে আরাম করে বসতে পারে।
