“বেশ তাই হবে। এবার আমাকে একটা শাবল এনে দাও…”
পরের দিন খুব সকালবেলা, তুষারের ভেতরে একটা গর্তে বাবরের ঘুম ভাঙে। বরফের একটা স্তর তাকে ঢেকে রেখেছে কিন্তু আপাদমস্তক কম্বলে মুড়ে সে কতোটা আরামে রাত কাটিয়েছে টের পেয়ে চমকে উঠে। গুঁড়ি দিয়ে গর্ত থেকে বের হয়ে সে গায়ের উপর থেকে বরফের কুচি ঝেড়ে ফেলার মাঝে, চারপাশে তাকিয়ে ঝড় থেমে গিয়েছে দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলে। আদিগন্ত বিস্তৃত পরিষ্কার নীল আকাশের নিচে সাদা দৃশ্যপট চোখ ঝলসে দেয়।
“সুলতান।” তাদের শক্তপোক্ত গড়নের লম্বা বছর পঁয়ত্রিশেক বয়সের পথপ্রদর্শক শীতের হাত থেকে বাঁচতে আপাদমস্তক সে বেশ ভালো করে মুড়ে রেখেছে। তার ছেলে- চৌদ্দ কি পনের বছর হবে বয়স- পাশে দাঁড়িয়ে দু’হাত আড়াআড়ি করে রেখে কব্জি পর্যন্ত বোগলের নিচে এঁজে রেখেছে বাড়তি উত্তাপ পাবার আশায়।
“আমরা কি যাত্রা আরম্ভ করতে পারি?”
“হ্যাঁ, কিন্তু এখন থেকে আমাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। পূর্বে দৃশ্যমান অনেক বিপদই তুষারের আবরণে এখন ঢেকে গিয়েছে।”
লোকটা ঠিকই বলেছে। বরফের পুরু স্তর চারপাশের দৃশ্যপট এখন অনেক কোমল আর ঝুঁকিহীন দেখাচ্ছে। কিন্তু সেই সাথে পাহাড়ের অসংখ্য ফাটলের উপরেরটাও ঢেকে দিয়েছে। পুরো বহরটা যাত্রা শুরু করতে বাবর তাকিয়ে দেখে পথপ্রদর্শক লোকটা কিভাবে সতর্কতার সাথে আগে আগে চলেছে। আর কিছুক্ষণ পরে পরেই আপাতদৃষ্টিতে কঠিন বরফের উপরে লম্বা লাঠি দিয়ে গুতো দিচ্ছে। সেটা সাথে সাথে ধ্বসে পড়ে নিচের অতলস্পর্শী গিরিখাদ উন্মুক্ত করে তুলছে। যেখানে একবার পড়লে আর দেখতে হবে না। বাবর যখন তার কাছে জানতে চায় এই জ্ঞান সে কিভাবে লাভ করেছে। তখন লোকটা জানায় বহু শতাব্দি ধরে তার পরিবার এই পাহাড় অতিক্রম করতে ভ্রমণকারীদের সাহায্য করে আসছে। তৈমূরের বাহিনীর সাথেও তাদের বংশের কেউ একজন পথপ্রদর্শক হিসাবে ছিলো ভেবে নেয়াটা কি খুব বেশি বাড়াবাড়ি হবে?
শীঘ্রই অলস গালগল্পে সময় কাটাবার শক্তি বা অবকাশ কোনোটাই থাকে না। তারা ধীরে ধীরে দুটো চূড়ার মাঝে ঘোড়ার পর্যানের মত দেখতে একটা উঁচু ভূখণ্ডের দিকে এগোতে থাকে। বরফের স্তর ধীরে ধীরে আরো উঁচু হয়ে উঠতে শুরু করে যে, প্রায়ই ঘোড়ার রেকাব পর্যন্ত এমনকি কখনও পর্যান বাঁধার কাপড়ের ফেটি পর্যন্ত বরফে ঢুবে যেতে থাকে…
“সুলতান…আমার এবার পায়ে বরফ-মাড়ানো লোক লাগবে।” পথপ্রদর্শক লোকটা নরম ঘন বরফে প্রায় কোমর পর্যন্ত ডুবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কি?…
“বরফ মাড়াবার জন্য লোক লাগবে…গিরিখাদ আকীর্ণ এলাকাটা আমরা পার হয়ে এসেছি। সেসব নিয়ে আর ভীত না হলেও চলবে। এবার পনের কি বিশজন শক্তিশালী লোক আমার প্রয়োজন। সামনের লোকটার কাজ হবে বরফের মাঝে গায়ের জোরে এগিয়ে যাবার। আর তার পেছনের লোকেরা আলগা বরফ দাবিয়ে দিয়ে একটা গলি পথ তৈরি করতে পারবে। যার ভিতর দিয়ে বাকি লোকেরা আর ঘোড়ার পাল পেছন পেছন এগিয়ে যাবে। কেবল এভাবেই আমরা এখন গিরিপথে পৌঁছাতে পারি…”
এক ঘণ্টা পরে বাবরের ফুসফুসে কেউ যেনো আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বলে মনে হয়। আর তার পা জোড়া আপনা থেকেই দেহের নিচে মুড়ে আসতে চায়। কিন্তু তাকেই সবার চেয়ে বেশি সহনশীলতা আর উদ্যম প্রদর্শন করতে হবে। সে নিজেই জোর করে বরফের ভিতর দিয়ে প্রথমে সামনে এগিয়ে যাবার দায়িত্ব নিয়েছে এবং অন্যরা যেখানে হাঁপিয়ে ওঠার আগে আট কি দশ গজ দূরত্ব অতিক্রম করতে পেরেছে যে, ঠিক করেছে তার দ্বিগুণ পথ সে পরিষ্কার করবে। যাতে ঠাণ্ডা সত্ত্বেও সে কুলকুল করে ঘামতে শুরু করে। কিন্তু প্রতিটা পদক্ষেপ তার ভিতরে একটা বুনো উল্লাসের জন্ম দেয় যে, প্রকৃতি নিজেও তাকে দমিয়ে রাখতে পারছে না।
দুপুর নাগাদ তারা বরফের প্রান্তর থেকে শেষ পর্যন্ত বের হয়ে শক্ত উঁচু জমিতে এসে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। তৈমূরের মত না, সে আর তার লোকেরা ভাগ্যবান। আবার তুষারপাত শুরু হয় না এবং তারা এখন বৈরী কিন্তু অপরূপ সুন্দর দৃশ্যপটের ভিতর দিয়ে অতি ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। বাবর সবসময়ে মনে করেছে যে, ববফ বোধহয় কেবল সাদা হয়। কিন্তু এখানে পৃথিবীর ছাদের উপরে উষ্ণ সূর্যালোকে ফিরোজা আর মহানীল মহিমায় এটা চকচক করছে।
“গিরিপথ আর কতো দূরে?”
পথপ্রদর্শক এক মুহূর্ত কি ভাবে। “সুলতান, আমরা যদি এই গতিতে এগিয়ে যেতে পারি, হুপিয়ান গিরিপথে আমরা আগামীকাল রাত হবার আগেই পৌঁছে যেতে পারবো।”
বাবর হাত তালি দেয়। পশমের পরত দেয়া দাস্তানা আর তার উপরে উলের কাপড় দিয়ে মুড়ে রাখা সত্ত্বেও জমে আছে এবং ব্যাথায় কুঁকড়ে যায়। নীল হয়ে ওঠা আঙ্গুলে পুনরায় রক্ত চলাচল শুরু হতে মনে হয় গনগনে সূঁচ দিয়ে কেউ যেনো খোঁচা দিচ্ছে। “তুমি ভালোভাবেই তোমার দায়িত্ব পালন করেছে। আমি ভেবেছিলাম আমাদের পশুর পালের অধিকাংশই আমরা হারাব।”
“আপনাকে আমি এ কারণেই হুপিয়ান গিরিপথে নিয়ে এসেছি। অন্য সব গিরিপথ, যেমন খাওয়াকের মতো এটার উচ্চতা বেশি না। আর এটা দিয়ে উপরে উঠাও খুব একটা ঝুঁকিপূর্ণ না- যদিও এইসব পাহাড়ের সব জায়গাতেই বিপদ ওঁত পেতে আছে… আপনাকে সবসময়ে সতর্ক থাকতে হবে-” লোকটা তখনও কথা বলছে। এমন সময় হিম বাতাস বিদীর্ণ করে একটা জান্তব, মড়মড় শব্দ ভেসে আসে। আঁতকে উপরের দিকে তাকিয়ে বাবর তাদের অনেক উপরে বরফাবৃত চূড়ার মসৃণ পৃষ্টদেশে মাকড়সার জালের মতো ফাটল জন্ম নিতে দেখে। প্রায় মানুষের মতো একটা আর্তনাদ করে ওঠে। নীলচে-সবুজ বরফের একটা আয়তাকার খণ্ড বিচ্যুত হয়ে মানুষ আর প্রাণীর লম্বা সারির শেষ প্রান্তে এসে আছড়ে পড়ে।
