“আপনি কি ভাবছেন?” বাবুরীর ঘোড়াটা একটা তাম্রবর্ণের ঘোটকী, যেটা এই মুহূর্তে আপ্রাণ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে একটা ভনভন করতে থাকা ঘোড়া-মাছির হাত থেকে বাঁচতে চেষ্টা করছে।
“হিন্দুকুশ অতিক্রম করে তৈমূর দিল্লীতে তার বাহিনী কিভাবে নিয়ে গিয়েছিলেন সে সম্বন্ধে রেহানা যা বলেছে…”
বাবুরী অবজ্ঞার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকায়। “সবগুলোই রঙচঙে গল্প, মনগড়া আর বানোয়াট। তার কাছে পুরোটাই আগাগোড়া সত্যি কাহিনী। কিন্তু তার কতোটুকু আসলেই সত্যি সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তার দাদাজানের কথাটাই ধরেন, যেখানে প্রাণ বাঁচাবার জন্য বাচ্চা ছেলেটা তাকে সোনার সেই হাতিটা দিয়েছিলো। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, হাতিটা আসলে লুট করা হয়েছিলো এবং অন্য ছেলেটাকে পরিত্যাগ করার অপরাধী মনোভাব নাকচ করার জন্য পরে এই উদ্ধার অভিযানের কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে। যাই হোক, শীঘ্রই আমরা নিজেরাই জানতে পারবো উপরের দৃশ্যপট কেমন। আমরা একজন লোক পেয়েছি সে আমাদের পথপ্রদর্শক হতে রাজি হয়েছে।”
“আমি আশা করি সে যখন বলেছে যে, পাহাড়ের ভিতর দিয়ে যাবার রাস্তা চেনে তখন সে সত্যি কথাই বলেছে।”
“সে মিথ্যা কথা বলেছে প্রতিয়মান হলে তুমি বলেছে যে তাকে পাহাড়ের উপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।”
“আমি আসলেই তাই করবো।”
বাবর তার কাঁধের উপর দিয়ে দেহরক্ষী বাহিনীর দিকে তাকায় এবং তাদের পেছনে রুক্ষ্ম প্রকৃতির উপর দিয়ে অগ্রসরমান অশ্বারোহীদের লম্বা সারির দিকে তাকায়। যা আগস্টের দাবদাহে কেঁপে কেঁপে উঠে। তার কপাল থেকে দরদর করে ঘাম ঝরতে থাকে এবং পিঠের অংসফলকের মাঝ দিয়ে বয়ে যায়। সে তার পর্যানের সাথে বাঁধা চামড়ার তৈরি পানির থলেতে একটা ছোট চুমুক দেয়। তার ভাবতেই অবাক লাগে শীঘ্রই তুষার আর বরফের রাজ্যে তারা প্রবেশ করতে চলেছে।
“কাবুল শহরটা কেমন?” বাবুরী তার হাতের দাস্তানা দিয়ে সপাটে ঘোড়া-মাছিটাকে আঘাত করে এবং কঠিন মাটিতে বেচারার প্রাণহীন দেহ আছড়ে পড়তে দেখে সেদিকে সন্তুষ্ট চোখে তাকিয়ে থাকে।
“আমার মরহুম আব্বাজান যদিও নিজে কখনও সেখানে যাননি। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, তিনি শুনেছেন দুটো ভিন্ন জগতের মাঝে আঁকা পড়া একটা বিচিত্র স্থান সেটা- দুটো জগতের একটা শীতল আর অন্যটা উষ্ণ। কাবুল থেকে একদিনের দূরত্বে এমন স্থান আছে, যেখানে কখনও তুষারপাত হয় না। আবার ভিন্ন দিকে মাত্র দু’ঘণ্টার দূরত্বে এমন স্থানও রয়েছে যেখানের বরফ সারা বছর কখনও গলে না…”
“আমি ভাবছি সেখানের মেয়েরা কেমন…” “তারা শীতল না উষ্ণ? আমরা যদি ভাগ্যবান হই তাহলে শীঘ্রই দেখতে পাবো।”
*
চারপাশের বাতাস অনেক হাল্কা। বাবরের শ্বাস নিতে রীতিমত কষ্ট হয় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে তার হৃৎপিণ্ড অনেক দ্রুত স্পন্দিত হতে থাকে। ঘোড়াগুলোও বাতাসের অভাব বোধ করে এবং তারা উপরে উঠার সময়ে থেকে থেকেই নাক দিয়ে শব্দ করতে থাকে। শীতে অসাড় হয়ে আসা আঙ্গুলে, বাবর তার পশমের পরত দেয়া আলখাল্লার মস্তকাবরণ আরও ভালো করে টেনে দেয়। এক ঘণ্টা আগেও আকাশ পরিষ্কার ছিল। কিন্তু সহসা আগাম জানান না দিয়ে বরফ পড়তে শুরু করে। আর এখন তুষারের ভারী কণা তাদের চারপাশে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে উড়ছে। পেছনে তাকিয়ে বাবর মানুষ আর পশুর গাঢ় অবয়বের আগুয়ান লম্বা সারি সে বহু কষ্টে আলাদা করে চিনতে পারে। কিছু লোক এখনও ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু অনেকেই তার মতো খাড়া বরফাকীর্ণ ঢাল বেয়ে ঘোড়ার লাগাম ধরে ঝড়ের মাঝে মাথা নিচু করে এগিয়ে চলেছে। তার নিজের ঘোড়া, কালো কেশর আর লেজ বিশিষ্ট ধূসর একটা স্ট্যালিয়ন, অস্বস্তিবোধ করাতে চিহিঁ আওয়াজ করে এবং বাবর তার লাগাম ধরে তাকে টেনে নিয়ে চললে সে প্রতিবাদ জানাতে চেষ্টা করে।
তীব্র শীতের সাথে তার ভালোই পরিচয় আছে। কিন্তু গ্রীষ্মকালের এই তুষারঝড়ের আকষ্মিকতা, বাতাসের তীব্রতা আর শীতলতা একটা সতর্কবাণী বলে মনে হয়। তার চারপাশে পাগলের মতো ছন্দে আন্দোলিত হতে থাকা তুষারকণার মাঝে সে যেনো তার কল্পনায় তৈমূরের যোদ্ধাদের বহু কষ্টে উপরে উঠার আবছা অবয়ব দেখতে পায়। তারা এই বিপর্যয় সহ্য করে টিকে ছিলেন, এই ভাবনাটা তাকে শক্তি জোগায়।
“সুলতান।” বাবর তার খুব কাছেই বাইসানগারের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। “পথ প্রদর্শক বলছে নাকের ঠিক সামনেই যখন দেখা অসম্ভব হয়ে উঠেছে, তখন এগিয়ে যাওয়াটা মারাত্মক বিপজ্জনক। সে একটা খাওয়াল পাহাড়ের ফাটলে একটা গুহা। চেনে, যা সামনেই কয়েকশ গজ দূরে অবস্থিত। ঝড় না থামা পর্যন্ত সে আপনাকে সেখানে আশ্রয় নিতে অনুরোধ করেছে এবং সে আমাদের বাকি সবাইকে শিখিয়ে দেবে কিভাবে নিজেদের আর প্রাণীর বহরকে সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষা করা যায়।” বাবর মাথা নেড়ে অসম্মতি প্রকাশ করে। “পথ প্রদর্শক যদি বলে থাকে যে আমাদের যাত্রা বিরতি করা উচিত, তবে আমরা তাই করবো।” সে বলে, “কিন্তু আমি আমার লোকদের বাইরের খোলা প্রান্তরে কষ্ট আর বিড়ম্বনার মাঝে রেখে নিজে গুহার ভেতরে লুকিয়ে থাকবো না। সে আমাদের অবশ্যই কি করতে বলেছে?”
“সুলতান, খুঁড়তে বলেছে। এই বাতাসে আমরা তাঁবু খাটাতে পারবো না। আর তাই আমাদের নিজেদের জন্য গর্ত খুঁড়তে বলেছে এবং সেই বরফ দিয়ে বাতাস আটকাতে দেয়াল তৈরি করতে বলেছে ঘোড়ার পালকে আড়াল করতে এবং তারপরে তুষারঝড় না থামা পর্যন্ত আমাদের আর কিছুই করার নেই…”
