“সুলতান।” তার দেহরক্ষী দলের একজন তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করে। “দরবার আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
পুনরায় পরামর্শদাতা সম্বলিত দরবার ব্যাপারটাই তার কাছে কেমন অদ্ভুত মনে হয়। একটা ছাতিম গাছের ছড়ানো ডালপালার নিচে সবাই উপস্থিত হয়েছে কাশিমের পরণে উলের তৈরি লম্বা সবুজ আলখাল্লা। বাইসানগার আর বাবুরীর পরণে পশমের সূক্ষ্ণ বুননের নতুন জোব্বা। এছাড়াও সেরাম থেকে পঞ্চাশজন লোক নিয়ে আগত হুসেন মজিদ আর বাকী তিনজনের পরনেও নতুন পোশাক দেখা যায়। এদের ভিতরে দুজন মোঙ্গল সর্দার মাথায় ভেড়ার চামড়ার তৈরি গোলাকার টুপি। তাদের চকচকে দাড়িগোঁফবিহীন মুখে যুদ্ধের অসংখ্য স্মারক গিজগিজ করে। তৃতীয়জন বাবরের দূর সম্পর্কের ভাই মির্জা খান, বামচোখে পট্টি বাঁধা, হৃষ্টপুষ্ট মধ্যবয়সী এক লোক। উজবেকদের অভিযানের ফলে সে বাস্তচ্যুত হয়েছে এবং তার সাথে রয়েছে তিনশ অশ্বারোহীর সুসজ্জিত একটা দল। অতিরিক্ত ঘোড়ার পালসহ এবং গাড়ি ভর্তি শস্যদানা। নিজের এই ভাইয়ের বুদ্ধি বা সাহসিকতা সম্পর্কে বাবর খুব একটা আস্থাশীল না- নিজের ধনসম্পদ আর বংশ মর্যাদার কারণে তার আজকের সভায় ঠাই হয়েছে।
মাটিতে বিছানো গালিচায় বাবর ইঙ্গিতে সবাইকে বসতে বলে, সরাসরি কাজের। কথায় চলে আসে: “কাবুল পৌঁছাতে হলে আমাদের এখনও আরও দুইশ মাইল পথ অতিক্রম করতে হবে। আমাদের আর শহরটার ভিতরে বাধার মত দাঁড়িয়ে আছে হিন্দুকুশ। আমাদের ভিতরে কারও এই পাহাড় দেখবার অভিজ্ঞতা হয়নি- অতিক্রম করা দূরে থাক। আমরা কেবল মানসচোখেই সেটা দেখেছি। কিন্তু এই গ্রীষ্মকালেও সেটা জোরাল বাঁধার কারণ হবে…প্রশ্ন হলো আমরা কি পাহাড়ের ভিতর দিয়ে যাবো নাকি ঘুরপথে অন্যদিক দিয়ে পাহাড়টাকে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করবো…”
“আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প উপায় আছে?” মির্জা খান জানতে চায়।
নদীর তীর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে আমরা বৃত্তাকারে দূর্গম পাহাড়ের অংশগুলো এড়িয়ে যেতে পারি। রাজদূত আমাকে খুঁজবার সময়ে যেমনটা করেছিলেন…”।
“কিন্তু সেটা করতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে- সম্ভবত আমরা তখন তাহলে হয়তো সুযোগটাই হারাবো,” বাবুরী বলে। “পাহাড়ের চেয়ে দেরি করাটা এখন আমাদের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হতে পারে…”।
বাইসানগার মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। আমিও তার কথার সাথে একমত। আমাদের উচিত পাহাড়ের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেজন্য আমাদের পথপ্রদর্শক প্রয়োজন। এমন মানুষ যারা গিরিপথগুলো হাতের তালুর মতো চেনে এবং আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ আর ভালো গিরিপথ দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। এমন মানুষ যাকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি…”
মোঙ্গল সর্দারদের চেহারায় কোনো হেলদোল নেই যেনো। পৃথিবীর ছাদ হিসাবে। অভিহিত এই অঞ্চল দিয়ে হরহামেশাই তারা অতিক্রম করে। বাবরের মনে একটা ধারণা আছে, সেটা হলো তারা যদি আদৌ বিশ্বাস করেছে যে, লুটের মালের পরিমাণ প্রচুর হবে। তাহলে নরকের আগুনের ভেতরেও তারা তাকে অনুসরণ করবে কিন্তু যদি তারা আশাহত হয় যে লুট করার মতো তেমন কিছু পাওয়া যাবে না। তাহলে তারা তাকে সেখানেই পরিত্যাগ করবে…
বাবর তার দরবারে সমবেত লোকদের দিকে আরেকবার তাকায়। আরো দেরি করার কোনো মানে সে দেখতে পায় না। মনে মনে সে পুরো বিষয়টা বহুবার খতিয়ে দেখেছে। আর প্রতিবারই সে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। সে যদি কাবুলের সুলতান হতে চায়, তবে তাকে দ্রুত যা করার করতে হবে।
“বেশ। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা হিন্দুকুশ অতিক্রম করবো। পাহাড়ের নিকটবর্তী হবার সাথে সাথে পথ দেখাবার জন্য আমরা পথপ্রদর্শক সন্ধান করবো আমরা যদি সেরকম কাউকে খুঁজে না পাই, তাহলে আমরা নিজেরাই এগিয়ে যাবো…আগামী ছত্রিশ ঘণ্টার ভিতরে আমরা যাত্রা আরম্ভ করবো। এই সময়টা সবাই নিজেদের অধীনস্ত লোকদের সরঞ্জামাদি আর রসদপত্র এবং ঘোড়ার যত্ন নেবে। বাইসানগার আমি চাই বাকি সর্দারদের আপনি নিজে সংবাদটা পৌঁছে দেন। এবং আমরা সাথে কেবল ঘোড়া আর মালবাহী খচ্চর নিয়ে যাবো মাংসের জন্য। কোনো প্রাণী আমাদের সাথে থাকবে না, এমনকি পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্তও না।
*
খাজকাটা আঁকাবাঁকা পাহাড়ের চূড়ো ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসতে থাকে। মাঝে মাঝে বাবরের মনে হয় সে তার মুখে তাদের জমাট হিম শ্বাস অনুভব করতে পারে। নিচের ঢালে কালচে সবুজের একটা স্রোত যেন আন্দোলিত হয়। অনেক উঁচুতে বরফাবৃত শৃঙ্গ হীরক দ্যুতিতে চকচক করছে। অনেকেই এই পাহাড়গুলোকে ধরণীর পাথুরে বেষ্টনী বলে অভিহিত করেন। কিন্তু বাবরের কাছে তারা স্ফটিক চূড়া ছাড়া আর কিছু না। বাবরের স্মৃতিতে এখনও উঁচু খাড়া পাহাড়ের পার্শ্বদেশ দিয়ে তৈমূরকে দড়ির সাহায্যে নামানোর কথা। তার ক্ষুধার্ত আর আড়ষ্ট সৈন্যদল, বরফের উপর আতঙ্কিত ঘোড়ার পা পিছলে আছাড় খাওয়া এবং বর্বর কাফেরদের চোরাগুপ্তা আক্রমণের কথা, ভাস্বর হয়ে আছে। আট মাস আগে ফারগানার দক্ষিণে পাহাড়ের ভিতর দিয়ে তার নিজ পরিবার আর অনুগত মুষ্টিমেয় লোকদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবার সাথে কোনোভাবেই বিশাল একটা বাহিনী আর তার পুরো সাজসরঞ্জামসহ উঁচু চূড়ার ভিতর দিয়ে কিংবদন্তী আছে সেগুলো নাকি আকাশ স্পর্শ করেছে, অতিক্রম করার কোনো তুলনা হয় না।
