কিন্তু এটাও ঠিক একটা বছর হতে চলল, বাবর ক্রমশ উত্তেজিত আর উদ্দীপিত হয়ে উঠতে উঠতে ভাবে, সে এখানে বসে কেবল খরগোস আর খরগোসের ছানাপোনা শিকার করতে পারে না। হিংস্র সাইবানি খানের নাগালের বাইরে কাবুল অবস্থিত। সমৃদ্ধ আর শক্তিশালী একটা কেন্দ্র। আবারও তার চারপাশে যোদ্ধার দল ভীড় করবে। সেখানে সে তার ক্ষমতা পুনরায় মজবুত করবে তারপরে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্বন্ধে ভাবা যাবে।
“ধন্যবাদ আপনাকে।” সে দূতকে উদ্দেশ্য করে বলে। “আমি শীঘ্রই আমার উত্তর আপনাকে জানাবো।” কিন্তু সে ইতিমধ্যে সেটা অনুধাবন করে ফেলেছে। তার পরবর্তী গন্তব্য হবে কাবুল।
২.৮ সৌভাগ্যের সূত্রপাত
১৪. সৌভাগ্যের সূত্রপাত
আমাদের রক্তের শত্রু বর্বর উজবেকদের প্রতি তোমাদের ঘৃণা এবং আমার প্রতি আনুগত্যের কারণে তোমরা বিপদ আর কষ্টকে আপন করে নিয়ে নিজেদের জন্মভূমি ত্যাগ করে আমাকে অনুসরণ করেছে। আমি তোমাদের উঁচু পাহাড় আর বরফাবৃত গিরিপথের ভিতর দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছি। বাতাস যখন আমাদের উড়িয়ে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে, তখন তাঁবুর ভিতরে আমাদের শরীর পরস্পরকে উষ্ণতা দিয়েছে। আমরা আমাদের সামান্য খাবার ভাগ করে নিয়েছি। আমি সুলতান হবার পরে, গত নয় বছরে এতটা গর্বিত কখনও বোধ করিনি। হতে পারে তোমরা সংখ্যায় অল্প, কিন্তু তোমাদের ভিতরে রয়েছে সত্যিকারের বাঘের সত্ত্বা।” বাবর তার চারপাশে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলির দিকে তাকাতে তার সবুজ চোখ চকচক করতে থাকে। তার লোকজনের সংখ্যা এতো নগণ্য যে সে তাদের সবার নাম, কে কোনো গোত্র থেকে এসেছে আর যুদ্ধে কবে কোথায় আহত হয়েছিলো, জানে। সে এতোক্ষণ কেবল সত্যি কথাই বলেছে। সে তার এই ছন্নছাড়া ক্ষুদে বাহিনী নিয়ে ভীষণ গর্বিত।
“আমি শীঘ্রই তোমাদের এই একনিষ্ঠতার প্রতিদান দিতে সক্ষম হব। আমার মরহুম আব্বাজানের ভাই, কাবুলের সুলতান, ইন্তেকাল করেছেন। আমার বংশপরিচয় আর খ্যাতি- তোমাদের সাহায্যে অর্জিত আমাকে একজন সাহসী আর অদম্য নেতা হিসাবে গড়ে তুলেছে। যাকে কাবুলের অধিবাসীরা তাদের নতুন সুলতান হিসাবে মনোনীত করেছে। যদি আমি সেখানে উপস্থিত হই। এবং আমি যাবোই- আমাকে যদি একা যেতে হয় তবুও আমি যাবই। কিন্তু আমি জানি তোমরা আমাকে আরো একবার বিশ্বাস করে আমার সাথেই যাবে। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা তোমরা সবাই নিজ নিজ গ্রামে খবর পাঠাও, যাতে অন্যেরাও আমাদের সাথে যোগ দিতে পারে আমাদের সৌভাগ্যের অংশীদার হতে এবং আমাদের সবার যে জন্মগত অধিকার, সেই নিয়তির লিখন সম্পূর্ণ করতে পারে।” বাবর এখনও যেনো কোনো মহান বিজয় উদযাপন করছে এমন ভঙ্গিতে হাত উঁচু করে।
তার চারপাশ থেকে একটা মন্দ্র চিৎকার কণ্ঠ ত্যাগ করে। কে ভাবতে পেরেছিলো কয়েক ডজন কণ্ঠ থেকে এমন চিৎকার বের হতে পারে? বাবর আড়চোখে তাকিয়ে দেখে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবুরী, বাইসানগার আর কাশিমও বাকিদের সাথে গলা মিলিয়েছে। সে নিজের ভেতর একটা নতুন শক্তির উদয় অনুভব করতে পারে…
*
একমাস পরের কথা। বাবর তার তাঁবুতে অবস্থান করছে। সূর্যের আলো আর তাজা উষ্ণ বাতাস যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, সেজন্য তাঁবুর পর্দা খুলে দেয়া হয়েছে। সে যেমনটা আশা করেছিলো, তার ভাগ্য পরিবর্তনের খবর দ্রুত রাষ্ট্র হয়েছে। হতজীর্ণ যে দলটাকে নেতৃত্ব দিয়ে সে ফারগানা ত্যাগ করেছিলো, এখন সেটায় চার হাজারের বেশি যাযাবর মোঙ্গল যোদ্ধা এসে যোগ দিয়েছে। যাদের সর্দারেরা তুগ বা ইয়াকের-লেজের বৈশিষ্ট্যসূচক স্মারক নিজেদের ঘোড়ার লেজে বেঁধে রাখে যুদ্ধের সময়। সাইবানি খানের হাতে নিহত তৈমূরীয় সর্দারদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে তারা। তার প্রতি বা তার ন্যায়সঙ্গত অধিকারের প্রতি এদের অধিকাংশই আস্থাশীল এমনটা বিশ্বাস করার মতে নবিশ সে আর নেই। তারা তার দলে যোগ দিয়েছে কেবল প্রাপ্তির আশায়। কিন্তু সেই সাথে এতো দীর্ঘ ঝুঁকিপূর্ণ একটা যাত্রায় অংশ নেয়ার প্রস্তুতি একটা বিষয়ই প্রকাশ করে যে, সে সফল হবেই। তার সুনামই তার পক্ষে কথা বলবে।
কাবুলের শাহী দরবারের পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা যা দূত নিয়ে এসেছিলো, সে ইতিমধ্যেই সেটা অস্ত্রশস্ত্র, শক্তিশালী ঘোড়ার পাল, নধর ভেড়ার দল আর ভেতরের দিকে পশমের আবরণ দেয়া নরম চামড়ার তৈরি তাঁবু, যা বাতাসের তীব্র ঝাপটা সামলে নিতে পারবে কিনতে ব্যয় করেছে। সে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে প্রশস্ত আর শান্ত অক্সাস নদী ঘটনাবিহীনভাবে অতিক্রম করে। সমতল-তলদেশ বিশিষ্ট অল্প পানিতে ভাসতে পারে, এমন নৌকায় ঘোড়ার পাল, মালবাহী খচ্চর, উট আর মালবাহী গাড়িগুলো একে একে তোলা হয়। আর দক্ষ মাঝিরা তারপরে বালুময় তলদেশে তাদের হাতের লম্বা লগি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে তারা নৌকাগুলো ওপারে নিয়ে যায়। এভাবে নাগাড়ে দুই দিন দুই রাত ধরে তারা ক্রমাগত এপার ওপার আসা যাওয়া করে পুরো বহরটাকে ওপারে পৌঁছে দেয়। এসব মাঝিদেরই কেউ কেউ আবার বাবরের বহরের বিশালত্বে মুগ্ধ হয়ে হাতের লগি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তার বাহিনীর সাথে যোগ দেয়।
দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে তার যাত্রা বিজয়দীপ্ত একটা সফরের অনুভূতির মতো মনে হতে শুরু করে। কিন্তু তার উল্লাসে উদ্বেল হওয়া সাজে না। সাইবানি খান আর ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী যদিও পেছনে অনেক দূরে রয়েছে। তৈমূরের অভিযানের বিবরণ পড়ে আর বৃদ্ধা রেহানার গল্প শুনে। বাবর জানে কাবুল আর তার মাঝে অবস্থিত মূর্তিমান হিন্দুকুশের বরফাবৃত জমাট চূড়োর মাঝে অনেক অজানা বিপদ ওঁত পেতে রয়েছে। বাবর তার আম্মিজান আর নানীজানকে সৈন্যদের প্রহরায় কিশম দূর্গের শক্তপোক্ত দেয়ালের অভ্যন্তরে রেখে আসতে পেরে সন্তুষ্ট বোধ করে। দূর্গটা তার এক নতুন মিত্র তাকে ব্যবহারের জন্য দিয়েছে। সে একবার কাবুলের অধিকার বুঝে নিলে সে তাদের নিয়ে আসবার জন্য লোক পাঠাবে। কিন্তু আপাতত তারা নিরাপদে আছে। খানজাদার জন্যও যদি সে এমনটা ভাবতে পারতো, যার যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ স্বপ্নে সে প্রায়ই দেখতে পায়।
