“বছরের শেষের দিকে গুটিকয়েকজন লোকই এখান দিয়ে যাতায়াত করে।” বৃদ্ধ লোকটা বলে। “আমি এখানকার সর্দার। আমাদের গ্রামে আমি আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।”
সেই রাতে বাবর সর্দারের বাহুল্যবর্জিত মাটির বাড়িতে আগুনের পাশে আড়াআড়ি পা রেখে বসে আছে। নিচের তলাটায় একটাই বড় ঘর। যার মেঝেতে ভেড়ার পশমের তাকিয়া রাখা শোবার জন্য- এসান দৌলত, খুতলাঘ নিগার আর সর্দারের স্ত্রী উপরের তলায় একটা ছোট ঘরে আছেন। বাইরে অবস্থিত কাঠের সিঁড়ি দিয়েই কেবল সেখানে পৌঁছানো যায়। বাবুরী তার পাশে একই ভঙ্গিতে বসে আছে এবং দু’জনেই গম্ভীর মুখে নিজেদের পায়ের ফোস্কা আর হিম-দংশ পরীক্ষা করছে।
“মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে জীবনে বুঝি আর হাঁটতে পারবো না- প্রাণে যদি বেঁচেও যাই।” বাবুরী পায়ের একটা নাজুক ক্ষতস্থান স্পর্শ করে ব্যাথায় কুঁকড়ে ওঠে।
“আমাদের কপাল ভালো। আমরা অনায়াসে পাহাড়ে পথ হারাতে বা গিরিকন্দরে আছড়ে পড়তে পারতাম।”
“এটাকে কি ভাগ্য বলবেন, নাকি আপনার সেই অমিত পরাক্রমশালী ‘নিয়তি’?” বাবুরী হেসে বলে।
বাবরও হাসে, কিন্তু প্রশ্নটার কোনো উত্তর দেয় না।
*
সকালবেলার কুয়াশা থাকা সত্ত্বেও, বাবর একটা নিচু বরফাবৃত ঝোপের পেছন থেকে খরগোসটাকে মাথা বের করে, কান খাড়া করে রেখে একদম স্থির হয়ে বাতাস গন্ধ নিতে দেখে। খরগোসটার দিক থেকে বাতাস তার দিকে বয়ে আসছে খরগোসটার পক্ষে তার অবস্থানের কথা জানা সম্ভব না। সে যত্ন করে ধনুকের ছিলায় একটা তীর সংযোজন করে। খরগোসটার উপর থেকে নিমেষের জন্যেও চোখ না সরিয়ে নিয়ে, পরিস্থিতি নিরাপদ মনে করে যেটা এখন চকিত চোখে ইতিউতি দেখছে, ছিলাটা টেনে ধরে।
সহসা বাবরের পেছন থেকে ধাবমান পায়ের শব্দ ভেসে আসে এবং খরগোসটা নিমেষে উধাও হয়ে যায়। মেজাজ বিগড়ে যেতে সে ঘুরে তাকিয়ে দেখে তারই একজন লোক উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাঁপাচ্ছে। “সুলতান, কাবুল থেকে একজন দূত এসেছে। গত দু’মাস ধরে, বরফ গলতে শুরু করার পরে থেকেই সে নাকি আপনাকে খুঁজছে। সর্দারের বাসায় সে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
বাবরের তিক্ত মেজাজ নিমেষেই প্রশান্ত হয়ে উঠে। বাবর তার নীরের মুখ বন্ধ করে। ধনুকটা কাঁধের উপর দিয়ে গলিয়ে দিয়ে মেঠোপথ ধরে গ্রামের উদ্দেশ্যে দৌড়াতে শুরু করে। কাবুলের সুলতান, তার মরহুম আব্বাজানের চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে নিশ্চয়ই বার্তাটা পাঠানো হয়েছে… কিন্তু বাবরের যতোদূর মনে পড়ে দু’জন ভিন্ন জায়গায় ছিলো। আর তাদের মধ্যে কদাচিৎ যোগাযোগ হয়েছে।
ময়ূরকণ্ঠী নীল রঙের আলখাল্লা পরিহিত। দূতের চেয়ে কেতাদুরস্ত পোশাকে বাবর বহুদিন কাউকে দেখেনি। তার ঘন কালচে নীল পাগড়িতে ঝুলন্ত স্মারকছাপে পাথর বসানো কজায় পালক আটকানো রয়েছে এবং তার সাথের দু’জন পরিচারকের পরনে নীলের উপরে সোনার জরির কাজ করা পোশাক। তার লোকেরা তাকে খুঁজে বের করার ফাঁকে তারা নিশ্চয়ই পোশাক বদলেছে। বাবর মনে মনে হাসে। পাহাড়ী পথে কেউ এসব ধড়াচূড়া পরে ভ্রমণ করবে না… যাই হোক গত কয়েক মাসের ভিতরে এই প্রথম সে নিজেকে কেমন দেখাচ্ছে সে বিষয়ে কৌতূহলী হয়- তার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল, হলুদ পশমের মামুলী জোব্বা আর ছাগলের নরম চামড়ার চোস্ত।
কিন্তু দূতের চেহারায় এসব নিয়ে কোনো হেলদোল দেখা যায় না। বাবর তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে খেয়াল করে খোঁজার পালা শেষ হবার তার চোখেমুখে স্বস্তির একটা ছাপ ফুটে উঠেছে। দূত মাথা নিচু করে অভিবাদন জানায়। “সুলতান, আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।”
“তোমাকে স্বাগত জানাই। আমাকে বলা হয়েছে আপনি কাবুল থেকে আসছেন। আমার কাছে আপনি কি চান?”
“সুলতান, আমি বিষাদময় আবার একাধারে গৌরবান্বিত সংবাদ বহন করে এনেছি। আপনার মরহুম আব্বাজানের ভাই, আমাদের সুলতান, উলুঘ বেগ মির্জা, গত শীতে কোনো উত্তরাধিকারী না রেখে ইন্তেকাল করেছেন। তার ইন্তেকালের দু’মাস আগে তার শেষ বেঁচে থাকা পুত্রসন্তান জ্বরের কবলে পড়ে মারা যান। কাবুলের শাহী দরবার আমাকে এই বার্তাটা আপনাকে পৌঁছে দিতে বলেছে। আপনি যদি সেখানে যান, তবে সিংহাসনে আপনাকে অধিষ্ঠিত করা হবে। দরবারের অমাত্যদের ধারণা কাবুলের অধিবাসীরা তৈমূর বংশের আরেক সন্তানকে তাদের শাসক হিসাবে স্বাগত জানাবে। বিশেষ করে এমন কেউ যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত সেনাপতি আর বয়সে তরুণ। শাহী দরবার আপনাকে সমর্থন জানালে, যা পবিত্র কোরানের নামে তারা শপথ করে বলেছে আপনার উপরে অর্পিত করবে। আপনি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হবেন না।”
বাবর তার বিস্ময় গোপন করতে হিমশিম খেয়ে যায়। কাবুলের সালতানাতের সে তার অসম্ভব, অবাস্তব কল্পনাতেও কখনও চিন্তা করেনি। বহু দূরে অবস্থিত একটা স্থান- পাঁচশ মাইলেরও বেশি হবে। সেখানে পৌঁছাতে হলে তাকে প্রশস্ত অক্সাস অতিক্রম করতে হবে আর হিন্দুকুশের আঁকাবাঁকা সর্পিল, ছুরির ফলার ন্যায় ধারালে গিরিপথের ভিতর দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তারপরেও পুরো ব্যাপারটাই কপালের উপরে নির্ভর করছে। সে সেখানে পৌঁছাবার মাঝে অনেক কিছুরই বদল হতে পারে। শাহী দরবারের অমাত্যরা যারা এখন তাকে সমর্থন করছে, আল্লাহতালাই ভাল বলতে পারবেন এর কারণ। তারাই হয়তো ক্ষমতাচ্যুতির ভয়ে বা প্রলোভনের বশবর্তী হয়ে অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করে বসবে।
