তাদের দু’জনেরই চুল উসকোখুসকো আর এলোমেলো পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবুরীর নাক দিয়ে দরদর করে রক্ত ঝরছে, এবং বাবর টের পায় কানের উপরের একটা কানা জায়গা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আর বাবুরী বাম চোখে যে খোঁচাটা মেরেছিলো সে জন্য এখনই ওই চোখটা খোলা রাখতে সমস্যা হয়।
“আপনি দারুণ একজন পথিক রঙবাজ হতে পারতেন অনায়াসে।” বাবুরী বলে। “আপনাকে কখনও অনাহারে থাকতে হবে না- ভাগ্য সহায় থাকুক বা না থাকুক।” তাদের হাতাহাতির শব্দে সচকিত হয়ে, লোকজন দ্রুত দেয়ালের উপর দিয়ে তাদের দিকে দৌড়ে আসে। একেবারে সামনে রয়েছে উদভ্রান্ত চেহারার বাইসানগার, দু’জনের তার অভিব্যক্তির দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠে।
*
বাতাস এতো ঠাণ্ডা যে বাবরের মুখে যেন খোঁচা মারছে। প্রতি দুই কি তিন পা সামনে এগোবার পরেই তার পায়ের চামড়ার বুট জুতো বরফে পিছলে যায়। কিন্তু তার পরেও ফারগানা থেকে দক্ষিণমুখী এই খাড়া গিরিপথটা সাইবানি খানের ধাওয়াকারী সৈন্যদের নাগালের বাইরে পালিয়ে থাকার জন্য একমাত্র ব্যবহারযোগ্য পথ এবং তার লোকেরা বাবরের দলবলকে শিয়ালের মতো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আর যেখানে পাচ্ছে নির্বংশ করে ছাড়ছে।
তাদের সাথে ঘোড়া না থাকার কারণে বাবরের নিজেকে কেমন নাঙ্গা মনে হয়। যদিও বরফাকীর্ণ পাহাড়ের এই উচ্চতায় কারো মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সে আর তার লোকেরা সবসময়েই অশ্বারোহী ছিলো কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের সহ্য ক্ষমতার উপরেই তাদের নির্ভর করতে হবে। নিচের ঢাল বেয়ে যাত্রা শুরুর প্রথম কয়েকদিন বাবর তার সাথে করে যে চারটা খচ্চর নিয়ে এসেছিলো তার মালপত্র বহন করার জন্য তার দুটোতে খুতলাঘ নিগার আর এসান দৌলতকে উঠিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু ঢাল ক্রমশ খাড়া হতে শুরু করতেই আবহাওয়া আরও বিরূপ হয়ে উঠতে, বাবর খচ্চরগুলোকে জবাই করে তাদের মাংস সংরক্ষণের আদেশ দেয়।
তারপরে এসান দৌলত আর খুতলাঘ নিগারকে কখনও কখনও তার সবচেয়ে শক্তিশালী লোকদের কাঁধে করে বহন করা সম্ভব হয়েছে। আর বাকী সময়টা বাবরের সাথে তখনও যে জনা চল্লিশেক লোক রয়েছে তাদের মতোই নিজেদের দুজন পরিচারিকাসহ দুজনকেই হাঁটতে হয়েছে। জমে থাকা বরফের উপরে কাঠের লাঠিকে সম্বল করে উপর দিকে উঠতে হয়েছে। খুতলাঘ নিগার তার ভারসাম্যবোধ আর চটপটে ভাব দিয়ে নিজের ছেলেকে বিস্মিত করেছেন। নিজের দুর্বল মায়ের খাতির কোনো ধরণের সাহায্য তিনি নিতে চাননি। বাবর এখনও তাকে সামনে এগিয়ে যেতে দেখে। ভেড়ার চামড়ায় আপাদমস্তক ঢেকে থাকার কারণে তার কিছুই দেখা যায়। অনেক লোকের চেয়ে দ্রুত গতিতে পাথরের উপর দিয়ে এগিয়ে চলেছে। কাশিমের চেয়েও তিনি ভালোই অগ্রসর হচ্ছেন। সে নিয়মিত বিরতিতে আছাড় খাচ্ছে আর দৃশ্যতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
আশ্রয়ের জন্য তাদের সাথে কেবল চারটা পশমের আস্তরণ দেয়া তাবু রয়েছে। আর সামান্য কিছু ভেড়ার চামড়া একটা লাঠির সাথে মুড়িয়ে বাঁধা অবস্থায় আছে যা তার তিনজন লোক একজনের পেছনে আরেকজন দাঁড়িয়ে কাঁধে করে বহন করছে বহন করতে পারে। বাবর নিজেও লাঠিটা বহন করেছে, মাটির উপরে দাঁড়াতে কষ্ট হবার কারণে তার পিঠ বেঁকে যায়।
আরো একদিন পরে, তারা গিরিপথ অতিক্রম করবে। সামনের উপত্যকায় অবস্থিত গ্রামে তারা হয়তো আশ্রয় নিতে পারবে এবং পরে সেখান থেকে ঘোড়াও সংগ্রহ করতে হবে। সেদিন রাতে তার চারপাশে বাবুরী আর তার সঙ্গীদের চেপে থাকা শরীরের আকর উষ্ণতার মাঝে বাবর এই ভাবনাটা থেকে স্বস্তি পেতে চেষ্টা করে।
*
দিন দুই পরে, শীতে জমে বরফ হয়ে যাওয়া একটা নহরে জলবিয়োগরত অবস্থায় একটা বাচ্চা ছেলে বিস্ময়ে হাঁ করে গিরিপথের ভেতর দিয়ে একটা জবুথবু কাফেলাকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে। তারপরে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে কোনো দিকে আর না তাকিয়ে আরও কয়েকশ গজ সামনে পাহাড়ের ঢালে তার নিজের গ্রামের দিকে ভো দৌড় দেয়। যাবার সময়ে বারকয়েক সে বরফে বুঝি আছাড়ও খায়।
‘সুলতান, আমি কি সামনের অবস্থা দেখে আসার জন্য লোক পাঠাব?” বাইসানগার জানতে চায়।
বাবর মাথা নাড়ে। ঠাণ্ডায় যদিও সে আড়ষ্ঠ হয়ে আছে, গর্ব আর স্বস্তিবোধ তাকে ধীরে ধীরে উজ্জীবিত করে তোলে। সে পেরেছে। সে তার পরিবার আর লোকদের পাহাড়ের ভিতর দিয়ে নিরাপদে পার করিয়ে এনেছে। যদিও তারা এখন সংখ্যায় নগণ্য কয়েকজন। একসময়ে সে বিশাল যে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে তার তুলনায় সংখ্যাটা কিছুই না। এই মুহূর্তে সেটা কোনো ব্যাপার না।
কয়েক মিনিট পরে, বাইসানগারের সৈন্যরা একজনকে ধরে নিয়ে আসে। যাকে দেখতে- কয়েক পরত পুরু জোব্বা আর মাথায় কালো রঙের পশমের কাপড় ভালো করে জড়ানো- একজন বয়স্ক লোকের মতো দেখায়। তারা নিশ্চয়ই তাকে আগে থেকে বলেছে যে। কে বাবর, কারণ সে সোজাসুজি এসে তার সামনে নতজানু হয়ে। পায়ের নিচে জমে থাকা তুষারে মাথা ঠেকায়।
“এসবের কোনো দরকার নেই।” বহুদিন পরে কেউ বাবরকে এভাবে শ্রদ্ধা দেখালো। সে লোকটার কাঁধ জড়িয়ে ধরে এবং আলতো করে তাকে দাঁড় করায়। “আমরা বহুদূর থেকে এসেছি এবং ভীষণ পরিশ্রান্ত। আর আমাদের সাথে শাহী হারেমের বাসিন্দারাও রয়েছেন। আপনি কি আমাদের আশ্রয় দেবেন?”
