“আমার এখন স্ত্রীকে দেবার মতো সময় নেই,” সে কাঠখোট্টা ভঙ্গিতে বলে। “আমার নিয়তি সুলতানের নিয়তি, আর আমি অবশ্যই হামলা করবো…”
“তুমি যদি সত্যিই তোমার ভাগ্যে বিশ্বাস করো তুমি কথা শুনবে। এখন পর্যন্ত সাইবানি খান তোমাকে খুঁজছে। সে জানে আয়না পাহাড়ের কাছে তার লোকদের তুমিই হত্যা করেছে এবং ইতিমধ্যে সে এটাও জেনে গিয়েছে যে তুমি এখানে, সেরামে ফিরে এসেছে। তার স্বর্ণমুদ্রার লোভে অনেকেই আছে যারা তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে দ্বিধা করবে না।”
“আমি খানজাদাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলোম…”
“সেটা তুমি রাখতে পারবে না, যদি সাইবানি হারামজাদা তোমার কাঁধের উপর থেকে মাথাটাই নাই করে দেয়। আর সাইবানি যখন রসিয়ে তোমার মৃত্যুর খবর তাকে বলবে, তখন কি খানজাদার কষ্ট কিছু কমবে?” বাবরের চোখে তিক্ততা দেখতে পেয়ে বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর কিছুটা কোমল হয়। “তোমার বয়স এখনও কম। তোমাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। আমার মতো যখন তোমার বয়স হবে তখন তুমি বুঝতে পারবে যে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। কখনও কখনও সবচেয়ে সাহসী সবচেয়ে কষ্টকর বিষয় হলো- অপেক্ষা করা।”
খুতলাঘ নিগার মাথা নাড়েন। খানজাদাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবার পরে তিনি এতোটাই নিরব হয়ে পড়েছেন যে, তার মুখ থেকে কদাচিৎ কোনো শব্দ শোনা যায়। “তোমার নানীজান ঠিকই বলেছেন। এখানে থাকলে তোমার সামনে কোনো সুযোগই নেই। সে আমাদের সবাইকে তাহলে খুন করবে। আমি নিজের জন্য পরোয়া করি না। কিন্তু তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে…ভুলে যেও না তোমার ধমনীতে কার রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। মামুলি ডাকাতের মতো সাইবানি খান যেনো তোমাকে পরাস্ত করতে না পারে।”
খুতলাঘ নিগার তার ভারী নীল শালটা আরও ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নেন এবং ঝুড়িতে জ্বলতে থাকা আগুনের উপরে হাতটা মেলে ধরেন। শীতকাল আসতে আর বেশি দেরি নেই। সেরামের মাটির বাড়ি আর খিড়কী দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করা বাতাস সে কথাই জানান দিচ্ছে।
বাবর তার শীর্ণ গালে চুমু দেয়। “আমি তোমাদের দুজনের কথাই বিবেচনা করে দেখবো।”
এসান দৌলত পুনরায় তার বীণা তুলে নেন। বীণাটার অবস্থা বেশ সঙ্গীন। শুক্তি দিয়ে তৈরি নার্গিস ফুলের গোছার দৃশ্যের অনেকটাই খসে পড়েছে। কিন্তু তার আঙ্গুলের মৃদু টোকায় সৃষ্ট কোমল মধুর শব্দ বাবরকে আকশিতে তার বাল্যকালে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
বাইরে বের হয়ে এসে সে আঙ্গিনার উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে গ্রামের দেয়ালের উপরে উঠে দাঁড়ায় এবং ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু মনে মনে সে জানে তার আম্মিজান আর নানীজান ঠিকই বলেছেন। তার এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত বেঁচে থাকা।
‘সুলতান।” সে তার পেছনে নিচে থেকে বাবুরীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শুনে। তার কোমরের পরিকরে তিনটা নধর কবুতর পা বাঁধা অবস্থায় ঝুলছে- নির্ঘাত সে শিকারে গিয়েছিলো। সে সিঁড়ির ছোট ছোট ধাপ নিরবে উঠে এসে দেয়ালের উপরে বাবরের পাশে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকে।
“বাবুরী, তুমি কখনও কি তোমার ভাগ্য নিয়ে সন্দিহান হয়েছে?”
“বাজারের ছেলের ভাগ্য বলে কিছু থাকে না। ভাগ্যে বিশ্বাসের বিলাসিতা কেবল সুলতানদের সাজে।”
“সারাটা জীবন আমি কেবল শুনে আসছি এই পৃথিবীতে আমার জন্ম হয়েছে কিছু অর্জন করতে। সেটা যদি সত্যি না হয় তাহলে কি হবে…”
“আপনি আমার কাছে কি শুনতে চান? যে আপনি চেঙ্গিস খান আর তৈমূরের বংশধর? যে কণ্টকহীন জীবনে কেবল আপনারই অধিকার?”
বাবুরীর কণ্ঠস্বর অধৈর্য, রুক্ষ আর আবেগবর্জিত। বাবর তার সাথে তাকে এভাবে আগে কখনও কথা বলতে শোনেনি। “আমার কপালটাই খারাপ।”
“না আপনার কপাল খারাপ না। জন্মের কারণেই আপনি ভাগ্যবান। আপনার সবকিছু আছে। আপনি এতিম নন। আপনাকে আমার মতো আস্তাকুড়ের খাবারের জন্য মারামারি করতে হয়নি।” সহসা বাবুরীর নীল চোখে ক্রোধ ঝলসে উঠে। “আকশি থেকে ফিরে আসবার পর থেকেই আমি আপনাকে খেয়াল করছি, কেমন আত্ম-বঞ্চনার একটা আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন। আশেপাশের কারো সাথে কোনো কথাই বলছেন না। আপনি কেমন বদলে গিয়েছেন। ইয়াদগার যখন আপনার কণ্ঠলগ্না থাকতো, বা আমরা যখন একসাথে ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম, আপনি তখন এমন ছিলেন না। সেটা ছিলো বাঁচার মতো বেঁচে থাকা। আপনি ভুলেই গেছেন কেমন ছিলো সেই জীবনটা। বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলে আপনি যদি এভাবে মুষড়ে পড়েন, তাহলে সম্ভবত আপনি এই মহান নিয়তি’র- খোদামালুম সেটা কেমন যোগ্য নন, যা আপনি একটা বোঝার মতো বহন করে চলেছেন।”
কিছু বুঝে উঠার আগেই, বাবর বাবুরীকে লক্ষ্য করে সপাটে ধাক্কা দেয় এবং দুজনে জড়াজড়ি করে দেয়ালের উপর থেকে নিচের শক্ত মাটিতে আছড়ে পড়ে। দুজনের ভিতরে বাবর ওজনে ভারী এবং সে বাবুরীকে মাটিতে ঠেসে ধরে। কিন্তু বাইম মাছের মতো পিচ্ছিল বাবুরী একপাশে মোচড় দিয়ে সরে যেতে চায় এবং এক হাতের আঙ্গুল দিয়ে বাবরের চোখে একটা বেমক্কা খোঁচা দেয় আর অন্য হাতে মাথার পাশে একটা সিক্কা ওজনের ঘুসি বসিয়ে দেয়। ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠে বাবর গড়িয়ে সরে গিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং বাবুরীর উপরে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে, জড়িয়ে ধরে। বাবুরীর মাথা এবার দু’হাতে শক্ত করে ধরে মাটিতে ঠুকতে শুরু করে। কিন্তু মুহূর্তের ভিতরে বাবুরী পা এসে তার উরুদ্বয়ের সন্ধিস্থলে নিজের সদম্ভ উপস্থিতি জানান দেয়। যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে সে বাবুরীকে ছেড়ে দেয় এবং গড়িয়ে সরে যায়।
