“বলে যাও।” বাবরের হাত পা সহসা শীতল হয়ে আসে।
“আমি অবশ্যই সেখানে ছিলাম না। আমি তাই যা শুনেছি কেবল সেটাই আপনাকে বলতে পারি… তারা বলছে দূর্গের নিচে জাক্সারটাসের তীরে অনুষ্ঠানটার আয়োজন করা হয়েছিলো। লাল রেশমের চাঁদোয়ার নিচে আমাদের সুলতান সাইবানি খানের সামনে নতজানু হয়ে বসে। তিনি তখন সোনার জরির কাজ করা চাদরে ঢাকা একটা নিচু আসনে উপবিষ্ট অবস্থায় ছিলেন, এবং তাকে “প্রভু” বলে সম্বোধন করেন। সুলতান নতজানু হয়ে বসে থাকা অবস্থায় সাইবানি খান উঠে দাঁড়িয়ে মুখে কুটিল হাসি নিয়ে তার বিখ্যাত বাঁকানো তরবারি কোষমুক্ত করে। হাসি মুখে তিনি সুলতানের দিকে এগিয়ে যান। “এখন তুমি যখন আমার অধীনস্ত প্রজা, আমি তোমার সাথে যা ইচ্ছা আচরণ করতে পারি।” কথাটা বলেই তিনি তার শিরোচ্ছেদ করেন। সুলতানের শিরোচ্ছেদ ঘটাবার সাথে সাথে মৃত সুলতানের দাঁড়িয়ে থাকা অমাত্যদের উপরে সাইবানি খানের যোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের হত্যা করে।
“তামবাল?” তাকেও কি হত্যা করা হয়েছে? আর বাকি বেগ, ইউসুফ আর অন্যান্যদেরই বা কি খবর?”
“সবাই মারা গেছে। আমি আরো শুনেছি- আকশি থেকে পালিয়ে আসা দুই আস্তাবল কর্মীর কাছে যে সাইবানি খান দূর্গে প্রবেশ করে হারেমের মহিলাদের বাধ্য করেছে তার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে। কিছু মেয়েদের নিজের জন্য রেখে বাকিদের সে নিজের লোকদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছে। সবশেষে তিনি মৃত সুলতানের মা রোক্সানাকে ডেকে পাঠান। তারা বলেছে, মৃত সুলতানের কাটা মাথা তার সামনে তুলে ধরতে তিনি তাকে অভিশাপ দেন, আর তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বিলাপ করতে থাকেন। তখন তার বিলাপ বন্ধ করতে সাইবানি খান তার কণ্ঠনালী ছিন্ন করার আদেশ দেন। মেষপালক বলে।”
বাবরের মাথা চক্কর দিতে থাকে। তার সংবাদবাহকরা এসব কিছুই জানতে পারেনি, এবং গল্পটাও সম্ভবত অতিরঞ্জিত। কিন্তু গল্পের সারবস্তু সম্বন্ধে বাবরের মনে কোনো সন্দেহ নেই- যে সাইবানি খান চালাকি করে জাহাঙ্গীর, তামবাল আর সবাইকে খুন করে ফারগানা দখল করেছে। রোক্সানার ভাগ্য নিয়েও তার মনে কোনো দ্বিধা নেই এবং এক মুহূর্তের জন্য সে তার মরহুম আব্বাজানের রক্ষিতার প্রতি করুণা বোধ করে।
সারারাত নির্ঘম কাটাবার পরে, সকাল বেলা, বাবর তার ঘোড়ার বাঁধন খুলে একাকী খাড়া ঢালের দিকে এগিয়ে যায়। যেখান থেকে সে জানে আকশি দেখা যাবে। তারা চূড়ায় উঠে আসতে তার স্ট্যালিয়নটার দেহ ঘামে ভিজে যায়। অনেক নিচে, তার পূর্বপুরুষদের নির্মিত তাদের এতোদিনের আস্তানা, জাক্সারটাস নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা দূর্গটা দেখতে পায়।
দূর্গের তোরণে পতপত করে একটা নিশানা উড়তে দেখা যায়। এতদূর থেকে বাবর রঙটা ঠিকমত চিনতে পারে না। কিন্তু সে জানে আর যাই হোক সেটা ফারগানার উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ না। সেটা সাইবানি খানের কালো নিশান। যে সমরকন্দ দখলের মতো তার পূর্বপুরুষের ভূখণ্ডও চুরি করে নিয়েছে। বাবর তার দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া কান্নার বেগ রোধ করতে পারে না, বা যন্ত্রণায় ফুঁপিয়ে উঠাও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে না। কিন্তু সেটা কোনো ব্যাপার না। পাহাড়ের এই চূড়ায় কেউ তাকিয়ে নেই। কেবল মাথার উপরে বাজপাখির দল পাখা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে।
***
“আমাদের সামনে এটাই একমাত্র পথ।” এসান দৌলত কণ্ঠে গুরুত্ব ফুটিয়ে বলেন। জাহাঙ্গীর আর তোমার চাচাতো ভাই মাহমুদ খানকে সে যেভাবে হত্যা করেছে তোমাকেও সেভাবে সে হত্যা করবে। তৈমূরের বংশের প্রত্যেক শাহজাদাকে খুন করার শপথ সে নিয়েছে। আর আমি তোমাকে বলে রাখছি সে তার শপথ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।”
“আমি তার কাছ থেকে পালাবো না। আমি কাপুরুষ নই…”।
“তাহলে তোমাকে বোকাই বলতে হবে। তার নেতৃত্বে হাজারের উপরে যোদ্ধা রয়েছে। পুরোটা গ্রীষ্মকাল জুড়ে, সে সমরকন্দ আর ফারগানা দখল করার পরে উত্তরের তৃণভূমিতে বসবাসকারী গোত্রগুলো তার অধীনতা মেনে নিয়েছে। প্রতিদিন তার শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে আর তুমি হৃতশক্তি হচ্ছো।” এসান দৌলত আগুনে থুতু ফেলেন- বাবর তাকে আগে কখনও এমন করতে দেখেনি। “তোমার সমর্থনে কতোজন রয়েছে?” তিনি বলতে থাকেন। “পঞ্চাশজন? একশজন? বাকিরা সবাই নিজনিজ গ্রামে ফিরে গেছে। তোমার এমনকি কোনো স্ত্রী নেই…উত্তরাধিকারীর কথা বাদই দিলাম।”
এসান দৌলত তাকে সবকিছুর জন্য দোষারোপ করেন। কিন্তু বাবর কৃতজ্ঞ যে আয়েশা চিরতরে বিদায় নিয়েছে। ইবরাহিম সারুর কাছ থেকে পাঠানো কাঠখোট্টা বাতাটা যাতে তিনি বলেছেন যে, কোনো সালতানাত্তীন ভিখিরীর সাথে তিনি তার মেয়ের বিয়ে দিতে চাননি এবং বিয়ের বাধ্যবাধকতার পালা চুকে যাবার ফলে বাবর ততোটাই উৎফুল্ল হয়েছে, ঠিক যতোটা ক্রুদ্ধ হয়েছেন তার নানীজান। চিঠিটা নিয়ে এসেছিলো যে বার্তাবাহক তার ভাষ্য অনুযায়ী- সে বিয়েতে আয়েশাকে দেয়া বাবরের অলংকারও ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে- বাবরের পাঠানো বিয়ের প্রস্তাবের আগে আয়েশার সাথে তার নিজ গোত্রের যার বিয়ের কথা হয়েছিলো সেই লোকের সাথেই শীঘ্রই তার বিয়ে হবে। বাবর অবশেষে তার প্রতি আয়েশার নির্লিপ্ততার কারণ খুঁজে পেয়েছে বলে মনে করে কিন্তু তার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল আয়েশার অন্য পুরুষের শয্যাশায়িনী হতে পারে- আয়েশাকে উষ্ণ করতে পারবে এমন যে কোনো পুরুষের প্রতি তার শুভেচ্ছা রইল।
