সহসা বাম দিকে কোথাও থেকে উচ্চকণ্ঠের একটা চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসতে বাবর চমকে ফিরে তাকায়। দুই উজবেক অর্ধনগ্ন এক মহিলার দু’হাত ধরে টেনে তাকে পাথরের পাদদেশে নিয়ে আসছে। আরও চিৎকারের রোল উঠে উচ্চসুরে আর তীক্ষ্ণ- উজবেকরা নিশ্চয়ই পাথরের আড়ালে তাদের মহিলা বন্দিদের লুকিয়ে রেখেছিলো নিজেদের অবসর সময়ে তাদের সঙ্গ উপভোগ করবে বলে।
উজবেকরা আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করতে থাকা মহিলার পরণের কাপড় ছিঁড়ে তার কোমল ধুসর দেহ নগ্ন উন্মুক্ত করে। তারপরে একজন হাটু মুড়ে বসে তার কব্জি মাটিতে চেপে ধরে রাখে। আর আরো দু’জন তার দু’পা দু’পাশে টেনে ধরে তাকে অসহায় অবস্থায় চার হাতপা মেলে রাখা একটা প্রতিকৃতিতে পরিণত করে। তখন চতুর্থ একজন সেঁতো হাসি মুখে লটকে পাজামার বেল্ট খুলতে আরম্ভ করে। বাবরের মস্তিষ্কে খানজাদার কথা ঝলসে উঠে। সে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দিনের প্রথম তীরটা শূন্যে ভাসিয়ে দেয়। লোকটা তখনও তার পরণের কাপড় নিয়ে ধ্বস্তাধ্বস্তি করছে, সেই অবস্থায় তীরটা তার কণ্ঠ বিদীর্ণ করে। চোখেমুখে একটা অবিশ্বাসের অভিব্যক্তি নিয়ে নিজের গোপনঅঙ্গ আকড়ে ধরে সে পেছনে উল্টে পড়ে।
বাবরের দ্বিতীয় তীরটা মেয়েটার কব্জি আঁকড়ে রাখা উজবেকের বাম চোখে বিদ্ধ হয়, যে তার সঙ্গির অবস্থা দেখে আহাম্মকের মতো সরাসরি বাবর পাহাড়ের উপরে আকাশের নিচে যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেদিকে তাকিয়েছিলো।
“ফারগানার জন্য!” হুঙ্কার তুলে বাবর তার লোকদের নিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসে। তাদের সবার মনেই টিকান্ডের অধিবাসীদের হত্যাকাণ্ডের বদলা নেবার উদগ্র বাসনা।
***
“আমাদের কল্যাণে ভালই ভোজ হবে ব্যাটাদের।” বাবুরী আয়না পাথরের উপরে বাতাসে বৃত্তাকারে কালো ডানা মেলে উড়তে থাকা পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে।
“আরও ভালো ভোজ হতো যদি বেশি থাকতো,” বাবর বিড়বিড় করে বলে। হানাদারদের এই দলটাকে নিশ্চিহ্ন করাটা মশার কামড়ের মতই নগণ্য ব্যাপার। সাইবানি খান তার ক্ষমতা আর শক্তি নিয়ে সামনে কোথাও অপেক্ষা করছে। তারপরেও সে তার নাম লিখে রেখে এসেছে: এক উজবেকের দাঁতের ফাঁকে রক্ত দিয়ে তার নাম লেখা কাগজ গুঁজে দিয়েছে। সাইবানি খান শীঘ্রই জানতে পারবে এটা কার কাজ।
“আমাদের একজন লোকও আহত হয়নি। আর তাদের সব ঘোড়া আর লুট করা সামগ্রী আমরা নিয়ে এসেছি।”
বাবর আড়চোখে দলের পেছনে আরোহীশূন্য ঘোড়ার সারির দিকে তাকায়। তার লোকেরা সাতজন মেয়েকে খুঁজে পেয়েছিলো- সবচেয়ে অল্পবয়স্ক যে, তার বয়স কোনোমতেই বারো বছরের বেশি হবে না- তারা এখন উজবেকরা টিকান্ড থেকে লুটের মালামাল বহন করার জন্য যে দুটো খচ্চরটানা গাড়ি নিয়ে এসেছিলো তাতে আলখাল্লা মুড়ে বসে রয়েছে। আরও এগিয়ে যাবার আগে তাদের একটা বন্দোবস্ত করতে হবে। এখান থেকে পূর্বে একটা বসতি রয়েছে যেখানে মেয়েরা আপাতত নিরাপদে থাকবে। সে তাদের সাথে লোক দিয়ে সেখানে পাঠিয়ে দেবে।
বাবুরী কথা বলার জন্য মরিয়া হয়ে থাকলেও, বাবর নিরবে এগিয়ে চলে। আকশির কাছাকাছি সে চলে এসেছে। কি অপেক্ষা করছে সেখানে তার জন্য? অন্য সর্দাররা কি জাহাঙ্গীরকে সহায়তা করবে? দূর্গ তোরণের সামনে সাইবানি খান হাজির হবার আগইে কি তারা তার সাহায্যে হাজির হবে? ওয়াজির খানের প্রজ্ঞার অভাব সে খুব বেশি করে অনুভব করে। তিনিও, ফারগানায় জন্ম নেয়া আর বেড়ে ওঠা একজন ছিলেন। বাবরের মনোকষ্ট তার চেয়ে ভালো আর কেউ বুঝতে পারতো না।
অন্ধকার নেমে আসতে তারা জাক্সারটাসের একটা শাখা নদীর তীরে রাতের মতো। অস্থায়ী ছাউনি স্থাপন করে। আকশির এতো কাছে তারা যেখানে আছে সেখান থেকে মাত্র দু’ঘণ্টার পথ- বাবর অনেক কষ্টে আরও এগিয়ে যাবার আকাক্ষা দমন করে। রাতের আঁধারে এগিয়ে যাওয়াটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হতো না। উজবেক প্রহরীরা যেকোনো স্থানে থাকতে পারে।
স্রোতস্বিনীর কিনারে বসে সে পানির বহমান ধারার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে বোকার মতো একটা কাজ করেছে। আয়না পাথরের নিচে উজবেকগুলোকে কচুকাটা করার আগে তাদের কাছ থেকে সাইবানি খানের অবস্থান তার সেনাবাহিনীর শক্তিমাত্রা সম্বন্ধে জেনে নেয়াটা উচিত ছিলো। তারবদলে, প্রতিশোধের আগুনে অন্ধ হয়ে সে কেবল তাদের মৃত্যু কামনা করেছিলো। নাহ্, তার আরও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে…
“সুলতান, আমরা এই মেষপালককে তার ভেড়ার পালসহ কাছেই খুঁজে পেয়েছি। তার কথা আপনার শোনা উচিত।”
বাবর ঘুরে তাকিয়ে বাইসানগারকে দেখতে পায় এবং তার পেছনে দু’জন সৈন্যের মাঝে বছর চল্লিশের সর্তক অভিব্যক্তির এক লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তাকে অস্থির দেখালেও বিস্মিত কোনোমতে বলা যাবে না। সে আশা করেনি এভাবে তাকে ধরে বাবরের ছাউনিতে নিয়ে আসা হতে পারে।
“আমার লোকদের কাছে যে গল্পটা বলেছো সেটা আবার বলো। কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করবে না।”
বাইসানগার লোকটার কাধ ধরে তাকে বাবরের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
মেষপালক গলা পরিষ্কার করে। “সাইবানি খান পাঁচদিন আগে আকশি দখল করেছে।” বাবরের দিকে সে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকে। “সবাই বলাবলি করছে। সে সুলতান জাহাঙ্গীরের সাথে প্রতারণা করেছে। সে জাহাঙ্গীরকে নাকি বলেছিলো ফারগানা নয় কেবল উপঢৌকন পেলেই সে খুশি হবে। সুলতান যদি তাকে নিজের সম্রাট বলে স্বীকার করে নিয়ে জনসম্মুখে বাৎসরিক খাজনা দিতে সম্মত হয় তাহলেই তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে সমরকন্দ ফিরে যাবেন…”
