আধ ঘণ্টা পরে, তার লোকেরা যখন আদেশমত নির্মম কাজটা পালন করতে ব্যস্ত, তার এক গুপ্তদূত- একজন সৈনিক, কাছের বারা কোহ পর্বতের পাদদেশে যারা পরিবার বসবাস করে, এবং এলাকাটা যে ভালো করেই চেনে- বল্পিত বেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। তার চোখে মুখে একটা জরুরীভাব ফুটে রয়েছে।
“কি খবর?”
“আমরা উজবেকদের কাফেলার খোঁজ পেয়েছি। ঘোড়ার তাজা বিষ্ঠা দেখে বোঝা যাচ্ছে মাত্র দু’ঘণ্টা আগে তারা এখান থেকে রওয়ানা দিয়েছে এবং তাদের ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখে বোঝা যাচ্ছে লুটপাট ভালোই করেছে কারণ খুরের দাগ মাটিতে চেপে বসে আছে এবং ধীরে ধীরে অগ্রগামী হচ্ছে। তারা মনে হয় আকশির দিকেই এগিয়ে চলেছে।
“দারুণ। আমরা রওয়ানা দিচ্ছি।”
বাইসানগার, আর বাবুরীকে দুপাশে নিয়ে বাবর গুপ্তদূতদের অনুসরণ আরম্ভ করে। সে আর তার লোকেরা যদি উজবেক হানাদারদের অতিক্রম করে একবার এগিয়ে যেতে পারে,তাহলে সে এখানের এই নির্মমতার হিসাব তাদের কাছ থেকে কড়ায়গণ্ডায় উসুল করবে- রক্তের বদলে রক্ত, চিৎকারের বদলে চিৎকার। কৃষক যেভাবে কাক মেরে থাকে, ঠিক তেমনি তাচ্ছিল্যে হত্যা করা ঐসব বাচ্চাদের মৃত্যুর বদলা অবশ্যই নেয়া হবে।
তিকান্ড থেকে প্রায় পনের মাইল দূরে এক পাথুরে, আগাছাপূর্ণ ভূমি অতিক্রম। করতে গিয়ে তারা উজবেকদের পায়ের চিহ্ন হারিয়ে ফেলে। উচবেকরা সম্ভবত একপাশে সরে গিয়ে অন্য কোনো গ্রাম আক্রমণ করতে অগ্রসর হয়েছে কিন্তু তিকান্ড আর আকশির মাঝে হামলা করার মতো কোনো জনবসতি নেই। বাবর অপেক্ষা। করার সিদ্ধান্ত নেয়। উজবেকরা যদি টের পায় তাদের অনুসরণ করা হচ্ছে তাহলে, সেই হয়তো উল্টো ফাঁদে গিয়ে পড়বে। সে দু’জন গুপ্তদূত সামনে পাঠায় আর চারজনকে ঘুরে পেছনটা দেখতে বলে। দু’জন বামদিক দিয়ে আর দু’জন ডানদিক দিয়ে ঘুরে আসবে, তাদের দায়িত্ব দেয়া হয় উজবেকরা পেছন থেকে আক্রমণের পায়তারা করছে কিনা সেটা দেখার দায়িত্ব তাদের দেয়া হয়।
বাবর আর তার বাকি লোকেরা নিরবে, চোখ কান খোলা রেখে অপেক্ষা করতে থাকে। ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে ধরা, যাতে প্রয়োজন হলে মুহূর্তের ভিতরে দৌড় শুরু করা যায়। বেশ কিছুক্ষণ পরে সামনে পাঠানো এক গুপ্তদূত ফিরে আসে।
“সুলতান, আমরা উজবেকদের খুঁজে পেয়েছি। ব্যাটারা জঙ্গলে ঢুকেছিলো।”
উজবেকদের রেখে যাওয়া সংকীর্ণ পথ দিয়ে ঘোড়া নিয়ে যাবার সময় বাবর ভাবতে থাকে এই ঘন অন্ধকার অরণ্যে ব্যাটারা কেন প্রবেশ করেছে। আকশি পৌঁছাবার এটা দ্রুততম পথ না। তারপরে বিদ্যুৎ চমকের মতো তার মনে পড়ে। বহু আগে, তার বাবার সাথে শিকারে আসলে, যা এখন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছে, তিনি তাকে বনভূমির উত্তরে নিচু টিলার মাঝে অবস্থিত বিখ্যাত আয়না পাথর দেখিয়েছিলেন। অতিকায় পাথরটা দেখে সে বিমোহিত হয়েছিলো। প্রায় ত্রিশ ফিট লম্বা, এবং মাঝে মাঝে এক মানুষ সমান লম্বা পাথরটার ধূসর উপরিভাগ মোটা মোটা পাথুরে স্ফটিকের শিরায় শোভিত। যেখানে দুপুরবেলা সূর্যের আলো পড়তে পাথরটা আয়নার মতো চমকায়, উজ্জ্বল আলোর রশি বিকিরিত করে। বলা হয়ে থাকে পাথরটার অতিন্দ্রীয় ক্ষমতা রয়েছে…কোনো যোদ্ধা যদি পাথরটার ধারালো প্রান্তে নিজের তরবারির ফলা ঘষে নেয়, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে কেউ তাকে পরাস্ত করতে পারবে না। উজবেকরা সম্ভবত তাদের রক্তের লালসা প্রশমিত হতে- এখন। পাথরটা দেখে এর শক্তি পরখ করতে চায়।
আধ ঘণ্টা পরে, বাবর আর তার লোকেরা বনের মাঝে একটা খোলা স্থানে বের হয়ে আসে। সেখানে আবার ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখতে পায় উত্তর দিকে এগিয়ে গিয়েছে। বাইসানগার আর বাবুরীকে পাশে ডেকে এনে বাবর তাদের আয়না পাথরের কথা বলে। “উজবেকরা যদি আসলেই সেখানে গিয়ে থাকে আমরা তাহলে তাদের বেকায়দায় ফেলতে পারি। তারা চিন্তাও করবে না কেউ তাদের অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু আমাদের তবুও সতর্ক থাকতে হবে… আমার যদি ঠিক ঠিক স্মরণ থাকে, তবে পাথরটা এখান থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। আমার লোকদের যতোটা সম্ভব নিরবতা পালন করে অস্ত্র হাতে প্রস্তুত থাকার আদেশ দেন…’
বাবর আর তার লোকেরা সন্তর্পণে এগিয়ে যেতে একটা নিচু টিলার শৈলপ্রান্তের উপর দিয়ে উজবেকদের হট্টগোল আর হাসির শব্দ ভেসে আসতে শুনে। বাবর তার লোকদের ঘোড়া থেকে নামার আদেশ দেয় এবং ছয়জন যোদ্ধাকে ঘোড়াগুলো আগলে রাখার দায়িত্বে রেখে যে টিলার পেছন থেকে কর্কশ কোলাহলের শব্দ ভেসে আসছে বাকি সৈন্যদের নিয়ে সেটার উপরে উঠে আসে। গুঁড়ি দিয়ে অবস্থান করে তারা ঝুঁকে নিচের দিকে তাকায়।
তখন প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে এবং সূর্যের আলোয় আয়না পাথর এমন চমকাচ্ছে যে, বাবর চোখ বন্ধ করে নেয়। তারপরেও বন্ধ চোখের পাতার নিচে উষ্ণ সাদা বিন্দু নাচতে থাকে। পাথরটার উজ্জ্বলতার কথা সে ভুলে গিয়েছিলো। হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে, সে আবার নিচের দিকে তাকায়। পাথরের নিচে উজবেক দস্যুর দলটা অলস ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। চামড়ার তৈরি মদের মশক- কিছু ভর্তি, কিছু খালি- তাদের চারপাশে ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় পড়ে আছে। তাদের অস্ত্রশস্ত্রেরও একই দশা। তাদের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ জন হবে সব মিলিয়ে। পাথরের ডান দিকে গাছের সারির নিচে টিকান্ড থেকে লুট করা মালামাল বোঝাই অবস্থায় দড়ি দিয়ে বাধা।
