“সেটা ঠিক আছে। কিন্তু এটা আমার জন্মভূমি। সমরকন্দের স্বপ্ন আমাকে এতটাই বিমোহিত করে রেখেছিল যে আমি আমার জন্মভূমির কথা বিস্মৃত হয়েছিলোম। আমি যদি বেপরোয়াভাবে উচ্চাভিলাষী না হতাম, তাহলে আজও হয়তো আমি এর সুলতান থাকতাম। আর সাইবানি খানও আমার বোনকে কুক্ষিগত করতে পারত না…”
“হাড়হারামী উজবেকদের কাছে কেউই নিরাপদ না। সাইবানি খান আপনার সাথে শত্রুতা করে যাবে যতদিন আপনি বা অন্যকেউ- বেজন্মাটার মাথা তার ধড় থেকে আলাদা না করছে…”
বাবর সম্মতি জানায়। বাবুরীর কথাই সম্ভবত ঠিক। এমন কিছু হয়তো ভিন্ন হতো না। দিগন্তের বুকে বেশতর পাহাড়ের পরিচিত, আঁকাবাঁকা আকৃতি চোখে পড়তে যে অপরাধবোধ আর বিষণ্ণতা নেমে এসেছিলো তা কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়।
বৃষ্টি শুরু হয়। বাবর উঠে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে মুখ তোলে, টের পায় বৃষ্টির ফোঁটা তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। বৃষ্টি এভাবে পড়তে থাকলে আজ রাতে আর আগুন জ্বালানো যাবে না। ঝলসানো মাংসের বদলে, সেরাম থেকে আনা বাসি রুটি আর শুকনো কিন্তু মিষ্টি খুবানি, যা তাদের পর্যানে রয়েছে তাই খেয়ে তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে হবে এবং ভেজা মাটিতে পেটের গুড়গুড় আওয়াজ শুনতে শুনতে ঘুমাবার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু একটাই শান্তি সে শীঘ্রই তার জন্মভূমি আবার দেখতে পাবে এবং তার সঙ্গের সামান্য লোকবল নিয়েই সাইবানি খানকে হামলা করার একটা সুযোগ পাবে।
***
বাবরের গুপ্তদূতেরা প্রথম জিনিসটা দেখতে পায়- আকশি থেকে চল্লিশ মাইল দূরে তিকান্ড বসতি থেকে আগুনের ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। গ্রামটা সে খুব ভালো করেই চেনে, বিশেষ করে আব্বাজানের সাথে শিকারে আসবার কথা তার ভালোই মনে আছে। যখন সে তার সাদা রঙের ছোট নাদুসনুদস টাটু ঘোড়াটা নিয়ে তৃণভূমির সাদা তিনপাতা বিশিষ্ট ক্লোভার গাছের মাঝে হরিণ তাড়া করতো, বা গ্রামের বাচ্চাছেলেদের সাথে মিরতিমুরি তরমুজের ক্ষেত থেকে লেজবিশিষ্ট নধর তিতির দাবড়ে দিত। তিকান্ড ছিলো সুন্দর, সমৃদ্ধ একটা গ্রাম, যার উর্বর জমিতে পানি সরবরাহের জন্য একটা জটিল সেচব্যবস্থা ছিলো।
কিন্তু এখনকার এই তিকান্ড একদম আলাদা। বাবর নিজেও একটু পরে আকাশে কালো আর ঝাঁঝালো ধোয়া আকাশে ভেসে উঠতে দেখে। চা গরম করবার জন্য। গোবরের ঘুঁটে দিয়ে এই আগুন জ্বালানো হয়নি বা দুপুরের খাবার রান্নার জন্যও না। পুরো গ্রামটাই সম্ভবত আগুনে পুড়ছে।
সে আর তার লোকেরা অস্ত্র হাতে সামনে এগিয়ে যায়, কোথাও কিছুই নড়াচড়া করে না, এমনকি কোনো পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দও ভেসে আসে না। তাদের সামনে সূর্যের আলো পড়তে একটা খালের পানি চিকচিক করে কিন্তু এর চারপাশের আপেল, নাশপাতি আর খুবানির একদা সুন্দর বাগানের গাছগুলো ধবংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রতিটা গাছের কাণ্ড কেটে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। তরমুজের ক্ষেতেও যেনো মত্ত মাতালের তাণ্ডব।
কিন্তু খারাপটা আরও সামনে ছিলো। একটা গাছ কেবল দাঁড়িয়ে আছে একটা হৃষ্টপুষ্ট আপেলের গাছ, যা শীঘ্রই সাদা গোলাপী ফুলে ভরে উঠবে ভালো ফলনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু গাছটা ইতিমধ্যে ভরে উঠেছে পাঁচটা বাচ্চাছেলের লাশ এর শক্তপোক্ত ডাল থেকে ঝুলে আছে। তাদের রুক্ষভাবে কাটা চুল, পরণের মোটা সুতার টিউনিক, আর পায়ে পরিহিত আচ্ছাদন ছেলেবেলায় সে নধর তিতির। যাদের সাথে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে সেইসব মসৃণ ত্বকের হাস্যোজ্জ্বল আর অন্তরঙ্গ ছেলের দলের মতো। কেবল একটাই পার্থক্য এদের মুখ ফুলে বেগুনী হয়ে আছে। কোটর থেকে চোখ বের হয়ে এসেছে এবং রুক্ষ্ম দড়ি তাদের কোমল ত্বকের যেখানে কামড় বসিয়েছে, গলার সেই জায়গাটায় রক্ত জমে আছে। জমাট বাঁধা রক্তের চারপাশে মাছি ভনভন করছে। বাবর এগিয়ে গিয়ে বাতাসে দুলতে থাকা একটা বাচ্চাছেলের গাল স্পর্শ করে। বেচারার ত্বক তখনও হাল্কা উষ্ণ রয়েছে।
“দড়ি কেটে এদের নামাও।”
“সুলতান, এদিকে দেখেন।” বাইসানগার, খাল থেকে পানি তুলে রাখার জন্য নির্মিত কাছের একটা ইঁদারার দিকে দেখায়।
ঘোড়া থেকে নেমে, বাবর উঁকি দিতে নিচে নারী আর পুরুষের দলা হয়ে পড়ে থাকা লাশের স্তূপ দেখতে পায়। সে যতোটুকু দেখতে পায়, বুঝতে পারে সবারই শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে। পঞ্চাশ ফিট দূরে, বাজারে বিক্রির জন্য যেভাবে পাকা তরমুজ সাজিয়ে রাখা হয় তেমনিভাবে মাথাগুলো একটা নিখুঁত স্তূপে সজ্জিত। স্তূপের একেবারে উপরের মাথাটা উড়তে থাকা সাদা দাড়ির এক বৃদ্ধের। প্রপিতামহ না হলেও সম্ভবত একজন পিতামহ। তার কর্তিত রক্তাক্ত লিঙ্গ দুঠোঁটের মাঝে খুঁজে দেয়া হয়েছে আর চোখের কোটরে ঠাই পেয়েছে অণ্ডকোষ দুটি।
বাবর আর তার লোকেরা নিরবে টিকান্ডের কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত এগিয়ে যায়। উজবেক বর্বরগুলো বাড়ি আর আস্তাবল পুড়িয়ে কেবল অগ্নিদগ্ধ একটা খোলস রেখে গিয়েছে। চারপাশে মৃতদেহ পড়ে আছে। কিছু কিছু লাশ এমন অশ্লীল ভঙ্গিতে বিন্যস্ত যেনো দেখে মনে হয় মৃত্যুর যন্ত্রণার মাঝেও তারা রমণে উদগত হয়েছিলো। উজবেকরা নিশ্চয়ই দ্রুত এগিয়ে গিয়েছে, তাই পশুর পাল নিয়ে যেতে পারেনি। সেজন্য তারা অবলা প্রাণীগুলোর অঙ্গহানি করেছে, তাদের পেশীত কেটে দিয়ে গিয়েছে। বাবর তার লোকদের বলে যেসব পশু তখনও বেঁচে আছে তাদের যেনো জবাই করা হয়।
