“আপনার সৎ-ভাই জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে আগত বার্তাবাহক। আমি আল্লাহতালার প্রতি কৃতজ্ঞ যে শেষ পর্যন্ত আপনাকে খুঁজে পেয়েছি। আমি আপনাকে বেশ কিছু দিন ধরে খুঁজছিলাম। আপনাকে খুঁজে পাওয়া খুব কষ্টকর।”
“সেটাই স্বাভাবিক। খুব কঠিন সময়ের ভিতর দিয়ে আমি অতিক্রম করছি। জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে কি বার্তা নিয়ে এসেছো? আমি সত্যি বলতে তার কাছ থেকে এই মুহূর্তে বিশেষ করে যখন ভাগ্য আমার প্রতি বিরূপ- তখন তার কাছ থেকে কোনো বার্তা প্রত্যাশা করিনি।”
“আমার প্রভুর প্রতিও ভাগ্য সমান বিরূপ বলে প্রতিপন্ন হয়েছেন। সাইবানি খান পশ্চিম দিক থেকে ফারগানা আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে। সুলতান জাহাঙ্গীর আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছেন যতো দ্রুত সম্ভব আপনি আপনার সৈন্যবাহিনী নিয়ে যেনো ফারগানায় উপস্থিত হন।”
“আমি কেন সেখানে যাব? সমরকন্দ রক্ষার জন্য যখন আমি সাহায্যের আবেদন জানিয়ে ছিলাম সে কোনো সৈন্যবাহিনী পাঠায়নি।”
“সুলতান, আমি সেসব কিছুই জানি না। আমি কেবল এটুকুই জানি ফারগানার লোকেরা আতঙ্কিত হয়ে আছে এবং আপনার সাহায্য তাদের প্রয়োজন।”
বাবর সাথে সাথে কোনো উত্তর দেয় না। তারপরে সে বলে, “কারণটা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু উত্তর দেবার আগে আমাকে একটু ভাবতে হবে। ইত্যবসরে আমরা বসতিতে ফিরে যাই। সেখানে তুমি পরিষ্কার হয়ে ভালমতো খেয়ে নাও।” দু’ঘণ্টা পরে বাবর তার আম্মিজান আর নানীজানের কক্ষের দিকে এগিয়ে যায়। সে কক্ষের কাছাকাছি আসতে ভেতর থেকে এসান দৌলতের বীণার আওয়াজ শুনতে পায়। সে ভেতর প্রবেশ করলে তিনি বাদ্যযন্ত্রটা নামিয়ে রাখেন এবং খুতলাঘ নিগার তার সূচীকর্ম বন্ধ করেন। “জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে আগত বার্তার কথা আপনারা শুনেছেন?” সে জানতে চায়।
“অবশ্যই। তুমি কি প্রত্যুত্তর দেবে?”
“গত এক ঘণ্টা ধরে আমি সেটাই ভাবছি। আমার ন্যায়সঙ্গত মসনদ ছিনিয়ে নেয়ায় জাহাঙ্গীরের প্রতি আমার কোনো দুর্বলতা নেই আর তামবালের প্রতি আরও না। অবশ্য সম্মানিত একজন মানুষ হিসাবে আমি কেবল একভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি। আমার লোকদের জানের শত্রু- বর্বর উজবেকদের হাত থেকে আমি অবশ্যই ফারগানাকে রক্ষা করতে সাহায্য করবো। আমার জন্মস্থান আমি ভালোবাসি। সেখানেই আমার মরহুম আব্বাজান তার সমাধিতে শায়িত আছেন। তিনি যখন। জীবিত ছিলেন, তখন তার আর আম্মিজান আপনার সাথে সেখানে কাটানো অনেক আনন্দময় স্মৃতি আমার রয়েছে। আমার জন্মভূমি আক্রান্ত আর পরাভূত হবে আমি সেটা দাঁড়িয়ে দেখতে পারি না। আমার পক্ষে যতোজন লোক সংগ্রহ করা সম্ভব তাই নিয়ে আমি শীঘ্রই আকশির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবো।”
“আমি বা তোমার আম্মিজান এর চেয়ে কিছু কম তোমার কাছে প্রত্যাশা করিনি,” এসান দৌলত বলেন।
***
বেগুনী রঙের মেঘ গর্ভবতী মেয়ের মতো পেটভর্তি বৃষ্টি নিয়ে বেশতর পর্বতের তীক্ষ্ণ চূড়া মুকুটের মতো ঘিরে রেখেছে- বাবর তার শৈশবে এই দৃশ্য অসংখ্যবার দেখেছে। পূর্ব দিক থেকে একটা ঝড় ধেয়ে আসছে এবং ঘণ্টাখানেকের ভিতরে তাদের উপরে এসে ঝাঁপটে পড়বে। বাবর ভাবে তাদের কোথাও আশ্রয় নেয়া উচিত। আর তাছাড়া প্রায় দশ ঘণ্টা তারা ঘোড়ার পিঠে রয়েছে। এখন বিশ্রাম নেয়া দরকার। সে রেকাব থেকে পা বের করে এবং পা আলগাভাবে ঝুলতে দেয়। আড়ষ্ঠ উরু আর পায়ের ডিমের মাংসপেশী আরাম পায়। তার কালো বিশাল স্ট্যালিয়নটা অস্থিরভঙ্গিতে তার দুপায়ের ফাঁকে নড়াচড়া করতে সে এর ঘামে ভেজা গলায় আলতো করে চাপড় দেয়।
“আমরা ওখানে ছাউনি ফেলবো।” দুইশ গজ দূরে লাল বাকল বিশিষ্ট স্পিরাই গাছের ফুথের দিকে সে ইঙ্গিত করে। যা তাদের গুপ্তচর আর বৃষ্টি দুটোর হাত থেকেই আড়াল দেবে। সে যখন ছোট ছিলো ওয়াজির খান তখন ঘোড়া চালাবার জন্য ব্যবহৃত চাবুকের হাতল এই স্পিরাই গাছের কাঠ থেকে তৈরি করে দিয়েছিলো যা দেখতে অনেকটা খোলা চোয়ালের ভেতর থেকে জিহ্বা বের হয়ে থাকা শিয়ালের মুখের মতো দেখতে। কিন্তু মৃতদের বা অতীত নিয়ে নস্টালজিক হবার সময় এটা না। স্পিরাই গাছের নমনীয় কাঠ তীর তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আর সামনের দিনগুলোতে এই কাঠ তাদের প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজন হবে। “বাইসানগার সামনের ঐ পাহাড়ের উপরে প্রহরী নিয়োগ করেন।”
বাবর ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে সেটাকে চড়ে বেড়াবার সুযোগ দিয়ে আলগা করে একটা গাছের সাথে বেঁধে রাখে। তারা সেরাম এতো তাড়াহুড়ো করে ত্যাগ করেছে যে কোনো তাঁবু আনতে পারেনি। সে তার বেগুনী রঙের ঘোড়সওয়ারীর আলখাল্লাটা শক্ত করে। গায়ের সাথে জড়িয়ে নিয়ে একটা পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে। তার লোকদের কেউ কেউ তীর ধনুক নিয়ে বনমোরগ বা ঘুঘু শিকার করতে বনের ভেতরে প্রবেশ করে বাকিরা আগুন জ্বালাবার জন্য কাঠ সংগ্রহ করে।
সে ভাবেনি এভাবে তাকে কখনও ফারগানায় ফিরে আসতে হতে পারে।
“সুলতান?”
বাবর চোখ তুলে তাকিয়ে বাবুরীকে দেখতে পায়।
“আপনাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।”
“আমি আসলেই বিষণ্ণ বাবুরী, দু’দিনের ভেতরে আমরা আকশি পৌঁছাবো, কিংবা তারচেয়েও আগে। কিন্তু আমরা হয়তো ইতিমধ্যেই দেরি করে ফেলেছি।”
“আমরা যতো দ্রুত সম্ভব ঠিক ততোটাই দ্রুত এসেছি…”
