রেহানার গল্প শেষ এবং তার জটিল রেখাসঙ্কুল মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে।
“তোমার কল্যাণে তৈমূরের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন আমি আজ পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে জানতে পারলাম।” রেহানার ফুটিয়ে তোলা দৃশ্যপট বাবরকে অভিভূত করে। “তৈমূরের যুদ্ধ প্রণালী আর হিন্দুস্তান সম্পর্কে তুমি যা বলেছে তা এতোটাই অবিস্মরণীয় যে, আমি আমার মুনশিকে আদেশ দেবো পুরো বর্ণনাটা লিখে রাখতে যাতে অন্য লোকেরা তার শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে জানতে পারে। আর আমিও প্রয়োজন হলে এটা পুনরায় আলোচনা করতে পারি। ধন্যবাদ তোমাকে।”
রেহানা টুল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তার লাঠিতে ভর দিয়ে কক্ষ ত্যাগ করে। ফিরতি পথে তার পায়ের গতি বাবরের কাছে আগের চেয়ে অনেক চপল বলে মনে হয়।
“সুলতান।” হুসেন মজিদ কথা বলে। “তৈমূর হিন্দুস্তান তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেননি কেন?”
“আমি জানি না। তৈমূরের হামলার বিষয়বস্তু নিয়ে লিখিত একটা কবিতার কয়েকটা পংক্তি আমার মরহুম আব্বাজান প্রায় বলতেন। হুবহু শব্দগুলো আমার মনে নেই, কিন্তু বিষয়বস্তু অনেকটা এরকম “দিল্লী লুণ্ঠিত হবার পরে দু’মাস আকাশে একটা পাখিও দেখা যায়নি, আর হিন্দুস্তানের ভিতর দিয়ে তৈমূরের যাত্রাপথের আশেপাশে বাতাস দূষিত করে তোলা লাশের স্তূপ কেবল দেখতে পাওয়া যেতো”। কবিরা প্রায়ই বাড়িয়ে বলে কিন্তু তৈমূরও সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন যেখানে তিনি এতো ধবংসযজ্ঞ সাধন করেছেন সেই অঞ্চল শাসন করাটা কঠিন হবে…সম্ভবত তিনি এটাও অনুধাবন করেছিলেন তার বয়স হচ্ছে এবং তখনও অনেক কাজ বাকি-অনেক অভিযান আর লুটপাট করা তখনও হয়নি। তাছাড়া দিল্লী থেকে ফিরে আসবার পরে তিনি সমরকন্দের কেবল চার মাস অবস্থান করেন। তারপরে পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরের তীরে দামেস্ক আর আলেপ্পো দখল করে রওয়ানা দেন এবং আঙ্কারার। যুদ্ধে তিনি অটোমান তুর্কীদের মহান ম্রাট, বজ্রপাত বায়েজিদকে বন্দি করেন। তিনি তাকে আক্ষরিক অর্থেই একটা খাঁচায় বন্দি করে রাখেন, যা ভ্রমণের সময়ে। তাদের সাথেই থাকতো। সবাই বলে খাঁচায় বন্দি থাকা অবস্থায় মহামান্য সুলতান। নাকি বাচ্চাছেলের মত কাঁদতো…আর তৈমূর চীন অভিযানের সময়ে মৃত্যুবরণ করেন… হিন্দুস্তান তার বহু অভিযানের ভেতরে অন্যতম একটা অভিযান ছাড়া আর কিছুই না…”
“হিন্দুস্তানের বহুমূল্যবান রত্নরাজি সম্পর্কে রেহানার কথাই ঠিক। মাঝে মাঝে সওদাগরেরা সমরকন্দে নিয়ে আসে বিক্রি করতে এবং মূল্যবান পাথরগুলোর দীপ্তি অসাধারণ।” বাবুরী বলে। “আমি প্রায়ই কল্পনা করি দেশটা দেখতে না জানি কেমন।”
“তোমার আশা হয়তো পূরণ হবে।” বাবর চিন্তিত কণ্ঠে বলে। “গতরাতে আমি দেয়ালে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম সমরকন্দ ছাড়া অন্য কোথাও আমি আমার সাম্রাজ্যের ভিত্তি শুরু করতে পারি কিনা। তৈমূরের হিন্দুস্তান বিজয়ের কাহিনী রেহানা তার পূর্বপুরুষের বয়ানে বলে একটা আশীর্বাদের মতো কাজ করেছে।”
***
“অলস কোথাকার।” বাবর চিৎকার করে। তার খালি পায়ের নিচে লতাগুল্মহীন পাথুরে মাটি এবং ঢালটা বেশ খাড়া। কিন্তু সে তার প্রতিবাদ করতে থাকা দেহ নিয়ে উপরে উঠতে থাকে। বাবুরী বেশ চটপটে কয়েকগজ পেছনে সে বাবুরীর হাঁফাতে হাঁফাতে এগিয়ে আসা পায়ের শব্দ শুনতে পায়। কিন্তু সে তার চেয়ে দ্রুততর আর বিষয়টা তাকে প্রীত করে…বসন্তের আগমনের সাথে সাথে অভিযানে বেরিয়ে পড়ার আকাঙ্ক্ষা আবার তার মাঝে প্রবল হয়ে উঠেছে আর সেই সাথে ভবিষ্যতের যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত আরও চৌকষ করে তোলার সংকল্প। গত দুসপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সে এই প্রত্যন্ত পার্বত্য এলাকার আর উপত্যকার উপর দিয়ে দৌড়ে এসে হিমশীতল নদীর পানিতে খালি গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তার সাথে তখন কেবল বাবুরী থাকে। লম্বা শিংযুক্ত ছাগলের পাল ছাড়া হিংস্র আর কারো সাথে এখানে মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা নেই।
সে নিজের মনে পরিকল্পনার ছক কষে। সাইবানি খানের সাথে তার বোঝাঁপড়া এখনও শেষ হয়নি- খানজাদাকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত সেটা শেষ হবেও না। তারপরের কথা কে বলতে পারে? সমরকন্দ তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কিন্তু তুষারাবৃত পাথুরে চূড়া শোভিত হিন্দুকুশের অন্য পাশের সমৃদ্ধ আর বিচিত্র অঞ্চলের ভাবনা মন কিছুতেই সে দূর করতে পারছে না। তৈমূর যদি সেখানে অভিযান পরিচালনা করে থাকেন, তাহলে সেও যাবে?
২.৭ পলাতক জীবন
১৩. পলাতক জীবন
শিকার করে একদিন অতিবাহিত করার পরে বাবর ধীরে ঘোড়া নিয়ে সেরাম ফিরে আসছে। তার চারপাশের কৃষিজমিতে গ্রামের লোকেরা, উজ্জ্বল লাল,নীল আর সবুজ ঘাঘড়াচোলি পরিধান করে এই মওসুমের শস্য চাষ করার জন্য জমি প্রস্তুত করছে। বাবর সহসা সন্ধ্যার ম্লান সূর্য পেছনে রেখে সোনালী ধূলো উড়িয়ে তিনজন অশ্বারোহীকে বসতির দিক থেকে এগিয়ে আসতে দেখে। তারা এগিয়ে আসতে বাবর দু’জনকে তার দেহরক্ষী দলের সদস্য হিসাবে চিনতে পারে। তৃতীয়জন একজন অপরিচিত আগন্তুক। তিনজন ঘোড়া থামাতে, আগন্তুক ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে বাবরের সামনে শুকনো মাটিতে শুয়ে পড়ে শ্রদ্ধা জানায়।
“উঠে দাঁড়াও। কে তুমি?”
