রেহানা একটু চুপ করে দম নেবার জন্য। গল্পের এই অংশটা বিষাদময়। যুদ্ধবন্দির দল সুলতানের বাহিনীর সমর্থনে বিশাল জয়োধ্বনি দিলে। তাদের ধারণা ছিলো সুলতান জয়ী হলে তারা মুক্তি পাবে, তৈমূরের কানে সেটা পৌঁছে এবং আশঙ্কা করেন যে পরবর্তী আক্রমণের সময়ে আবেগের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধবন্দির সংখ্যা ছিলো প্রায় এক লক্ষ তারা হয়তো বিদ্রোহ করে বসতে পারে।
“আবেগের বশবর্তী না হয়ে এবং দৃঢ়চিত্তে, তিনি সব যুদ্ধবন্দি হত্যা করার আদেশ দেন। তার চেয়েও বড় কথা, প্রত্যেককে নিজ নিজ যুদ্ধবন্দি হত্যা করতে হবে।
“তার লোকেরা অশ্রুসজল চোখে ঠাণ্ডা মাথায় বন্দিদের হত্যা করে। এমনকি প্রিয়পাত্রীতে পরিণত হওয়া মহিলা বন্দিদেরও রেহাই দেয়া হয় না এবং কেউ কেউ বলে থাকে তৈমূর তার হারেমের মেয়েদের বাধ্য করেছিলো তাদের খিদমতকারী। বন্দিদের হত্যা করতে। আমার দাদাজান তার প্রাপ্তবয়স্ক বন্দিদের আদেশ মতো হত্যা করলেও রাভির বেলায় তিনি আদেশ পালনে ব্যর্থ হন। তিনি তাকে পালিয়ে পালিত হয়নি। আমাদের সৈন্যরা লুটপাটের আশায়- আমার বলতে দ্বিধা নেই মেয়ে মানুষের খোঁজে শহরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। আমার দাদাজানও ছিলেন তাদের ভিতরে, পরিত্যক্ত সরাইখানায়, শহরের অধিবাসীরা তাদের কিছু সাথীকে খুন করেছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়তে সেটার মালিক পালিয়ে গিয়েছিলো, মুফতে আকণ্ঠ সুরা পান করেছেন…
“প্রায় মাতাল অবস্থায়, সৈনিকরা এবার রাস্তায় নামে। মাথা ঝিম ধরে থাকার কারণে তারা তাদের চারপাশে কেবল শত্রু দেখতে পায় এবং সামনে যাকে পায় তাকেই হত্যা করে। শীঘ্রই তারা দোকানপাট আর বাসায় অগ্নিসংযোগ শুরু করে কেবল মজা দেখতে।
“মদের নেশা কেটে যেতে, আমার দাদাজান নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত বোধ করেন এবং একটা সংকীর্ণ লম্বা বাসায় প্রবেশ করে। সেখানে তিনি প্রায় রাভির সমবয়সী এক ছেলেকে মার্বেলের তৈরি হাম্মামখানায় লুকিয়ে থাকা অবস্থায় খুঁজে পান। রাভি আর তার প্রায় দ্বিখণ্ডিত মাথার কথা মনে পড়তে আমার দাদাজান আরও ধাতস্থ হন। তিনি ছেলেটাকে ইশারা করে ঘরের এক কোণে রাখা একটা বিশাল সিন্দুকে লুকিয়ে থাকতে বলেন এবং ইশারা ইঙ্গিতে বলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সে যেনো সেখানেই লুকিয়ে থাকে।”
রেহানা তার পরনের পুরু পশমের স্তর দেয়া কোটের পকেট হাতড়ে সোনালী জরির কাজ করা রেশমের কাপড়ে মোড়া কিছু একটা বের করে। কাপড়ের আবরণ সরাতে বাবর দেখে ভেতরে একটা ছোট সোনার তৈরি হাতির মূর্তি, যার চোখ দুটো রুবির। সে হাতিটা বাবরের দিকে এগিয়ে ধরে। “সেই বাচ্চা ছেলেটা আমার দাদাজানকে এটা দিয়েছিলো এবং তার অন্য আর কোনো নাতি জীবিত না থাকায় এটা আমাকে দিয়ে যান- বাকি সবাই আমার জন্মের আগে গুটি বসন্তে মারা গিয়েছিলো।
“ভবনটা ত্যাগ করার আগে আমার দাদাজান তূর্কী ভাষায় একটা ইস্তেহার লিখেন, যেখানে বলা হয় এই ভবনটা তল্লাশি করা হয়েছে মূল্যবান আর কিছু এখানে নেই। তিনি এটাও জানতেন পড়তে জানা গুটিকয় লোকদের ভিতরে একজন বিধায়, এবার তিনি একটা ছবি আঁকেন যেখানে লোকদের ভেতরে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। তিনি দুটো কাগজই দরজায় লটকে দেন।
“দুদিন পরে তৈমূর হত্যাযজ্ঞ আর অগ্নিসংযোগ বন্ধ করার আদেশ দেন। আমার দাদাজানের ইস্তেহার আর ছবি ভালোই কাজ করে বোঝা যায়। কারণ দু’দিন পরে তিনি সেই বাসায় ফিরে এসে দেখেন বাসাটা অক্ষত রয়েছে আর সেই ছেলেটা বাড়ির সামনে সিঁড়ির ধাপে বসে রয়েছে…
“আমার দাদাজান- বাকি সব সৈন্যদের মতই- অনেক কিছু লুট করেছিলো।” সিদ্ধিলাভের অভিপ্রায়ে রেহানার চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। “সুলতানের প্রাসাদে তারা মাটির নিচে মূল্যবান রত্নে পরিপূর্ণ প্রকোষ্ঠ খুঁজে পেয়েছিলেন- মসৃণ দীপ্তিময় মুক্তা, আকাশের মতো নীল পান্না, দক্ষিণের খনিগর্ভে প্রাপ্ত ঝকঝকে হীরকখণ্ড- আর সোনা এবং রূপার মোহর। ঠিক যেমন প্রতিশ্রুতি তৈমূর তাদের দিয়েছিলেন। আমার দাদাজান তার প্রাপ্য অংশ বুঝে পেয়েছিলো। এছাড়াও তিনি অলংকৃত বর্ম আর একজোড়া সাদা টিয়াপাখি যা তিনি রাস্তার পাশে এক পরিত্যক্ত বাড়িতে খাঁচাবন্দি অবস্থায় খুঁজে পেয়েছিলেন, সাথে করে নিয়ে আসেন।
“সহসা, দিল্লীতে মাত্র তিনদিন অতিবাহিত করার পরে, তৈমূর তার বাহিনীকে শহর ত্যাগ করার আদেশ দেন। তার সেনাবাহিনী মন্থর গতিতে উত্তর আর পূর্বদিকে ফিরতি যাত্রা শুরু করে। কখনও কখনও দিনে চারমাইল পথ মাত্র অতিক্রম করে লুটের মালামালে এতোটাই ভারী হয়েছিলো বাহনগুলো। সমরকন্দ পৌঁছাবার অনেক আগেই আমার দাদাজান তার লুট করা সব ধনসম্পত্তি জুয়া খেলে হেরে যায়। কেবল সাদা টিয়াপাখি জোড়া আর এই হাতিটা শেষ পর্যন্ত তিনি নিয়ে আসেন।
“কিন্তু হিন্দুস্তানের কথা বলার সময় তার চোখ চকচক করতে থাকতো। যুদ্ধ আর নিজের কৃতিত্ব সম্বন্ধে তাকে খুব অল্পই বলতে শুনেছি। তিনি প্রায়ই পানি প্রবাহের কারণে সবুজ মাঠে চরে বেড়ানো মোটা গরু আর ভেড়ার পাল। মার্বেল আর বেলেপাথরে নির্মিত সুন্দর ভবনসমূহ আর হিন্দুস্তানের মূল্যবান পাথরের কথা বলতেন। তিনি বলতেন সেইস্থানের অফুরান প্রাকৃতিক সম্পদের কথা বলে শেষ করা যাবে না কখনও। বিশ্বাস করতে হলে নিজ চোখে সেসব দেখতে হবে…”।
