“কিন্তু অনেক পরিশ্রম করে তারা অবশেষে কাবুলে পৌঁছায়। আমার দাদাজান আমাকে বলেছেন, পাহাড়ের উপরে অবস্থিত একটা দূর্গ দ্বারা সুন্দর এই শহরটা গিয়ে বালিয়াড়ির আড়ালে আত্মগোপন করে থাকতে বলেন। অবশ্য পরে তিনি ফিরে এসে একটা কাঁটাযুক্ত ঝোপের নিচে তার দেহটা অর্ধেক ঢাকা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন যার আড়ালে সে আত্মগোপন করতে চেয়েছিল কিন্তু বেচারার মাথাটা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। আমার মনে আছে আমার দাদাজান সবসময়ে বলতেন সমরকন্দের বাজারে অর্ধেক কাটা পাকা তরমুজের মত দেখতে লাগছিলো মাথাটা এবং আশেপাশের ধবংসযজ্ঞের দিকে তাকিয়ে এবং দুর্গন্ধে তার মনে হতো তিনি বোধহয় কসাইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
“তৈমূর আশা করেন এই হত্যাকাণ্ড হয়তো দিল্লীর সুলতানকে আরেকবার আক্রমণ করতে প্ররোচিত করবে এবং তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। সবচেয়ে ভীতিকর হাতির পালকে প্রতিহত করতে তিনি তার লোকদের- অশ্বারোহী বা পদাতিক, সেনাপতি বা সৈনিক নির্বিশেষে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থানের সামনে গভীর খাদ খুঁড়তে আদেশ দেন এবং খোঁড়া মাটি দিয়ে অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেন। এরপরে তিনি তার কামারদের বলেন সবচেয়ে তীব্র আলো প্রজ্জ্বলিত করতে এবং তীক্ষ্ণ প্রান্তযুক্ত তিন-মাথা বিশিষ্ট দণ্ড তৈরি করে হাতির দলের যেখানে আক্রমণ করার সম্ভাবনা বেশি সেসব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে বলেন। তিনি এবার মহিষের পালের মাথা আর পা চামড়ার দড়ি দিয়ে বাঁধার আদেশ দিয়ে পরিখার সামনে এবং সুচাল দণ্ডের পেছনে তাদের দাঁড় করিয়ে রাখেন। তিনি উটের পিঠে শুকনো কাঠ আর খড় বোঝাই করে তাদের একসাথে বেঁধে আলাদা করে রাখেন। সবশেষে তিনি তার তীরন্দাজ বাহিনীকে আদেশ দেন হাতির পিঠে কানের পেছনে উপবিষ্ট মাহুতকে লক্ষ্য করে কেবল তীর ছুঁড়তে বলেন। মাহুত মারা গেলে, হাতির পাল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
“ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ- আমার দাদাজান বলতেন আকাশ ধূসর হয়ে উঠে এবং আবহাওয়া শীতল হতে- সুলতানের দল সত্যি সত্যি তৈমূরের ধারণা অনুযায়ী, হাতির পিঠে বাঁধা পিতলের বিশাল দামামা বাজিয়ে দূর্গ ছেড়ে আক্রমণ করতে বের হয়ে আসে, তাদের পায়ের নিচে মাটি যেনো কেঁপে কেঁপে উঠে।
“কিন্তু আমার দাদাজান তখন তৈমূরের পরিকল্পনার প্রজ্ঞা নিজের চোখের সামনে দেখতে পান। হাতির পাল তাদের অবস্থান পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারে না। লোহার কাঁটায় হোহাচট খেয়ে তারা মহিষের পালের সামনে এসে হুমড়ি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। আর এরপরেই তৈমূর তার শেষ চালটা দেয়। উটের পিঠে রাখা শুকনো কাঠ আর খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে তিনি তাদের হাতির পালের দিকে দাবড়ে নিয়ে যেতে বলেন। বিশাল প্রাণীগুলো কাটার খোঁচা সামলে নিলেও এবার ধোয়ার আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠে এবং ভয়ে পালাবার সময়ে পিঠের সৈন্যদের ছুঁড়ে ফেলে আর পায়ের নিচে তাদের মাথা পিষ্ট করতে থাকে। বিজয় এসে তৈমূরকে বরণ করে। দিল্লী এখন তার অধীনস্ত।
“যদিও তৈমূরির শাহী ফরমান ছিলো যে অনুমতি ছাড়া কেউ দিল্লীতে প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু তার সব আদেশের ভিতরে কেবল এই আদেশটাই কড়াকড়িভাবে সুরক্ষিত এবং ব্যস্ত বাণিজ্য পথের মিলনস্থলের উপরে অবস্থিত। সমরকন্দের চেয়ে ছোট আর কম চাকচিক্যময় অবশ্যই, কিন্তু তারপরেও আপন মহীমায় ভাস্বর।”
“নিশ্চয়ই, আমার বিশ্বাস সেটা এখনও তেমনই আছে।” বাবর বিড়বিড় করে বাবুরীকে বলে। “আমার বাবার এক ভাই শহরটার শাসনকর্তা।”
“সমরকন্দে আমার যেমন প্রতিটা দোকানে পরিচিত রয়েছে, তেমনি প্রতিটা মসনদে আপনার আত্মীয়রা অধিষ্ঠিত…”
“রেহানা, আমাদের কথায় কান না দিয়ে আপনি বলতে থাকেন।”
“সেপ্টেম্বর নাগাদ, তৈমূর চামড়ার ফালি দিয়ে বাঁধা নৌকা দিয়ে তৈরি করা একটা সেতুর সাহায্যে সিন্ধু নদী অতিক্রম করেন। দিল্লী থেকে তখন তারা মাত্র পাঁচশ মাইল দূরে। তার বাহিনী যখনই সুযোগ পেয়েছে মানুষজন বন্দি করেছে যাদের পরে সমরকন্দের দাসবাজারে বিক্রি করা হবে। কিন্তু তার আগে তারা সেইসব বন্দিদের বাধ্য করেছে তাদের কাজ করতে। আমার দাদাজানের ছিলো পাঁচজন বন্দি। রাভি নামের কালো চোখের ছোট একটা এতিম ছেলে তার খুব প্রিয় ছিলো।
“ডিসেম্বর মাসে, তৈমূরের অগ্রগামী গুপ্তদূতেরা দিল্লী শহরের দেয়ালের ভেতর অবস্থিত বিশাল গম্বুজ আর মিনার প্রথমবারের মতো দেখতে পায়। কিন্তু দিল্লীর সুলতানের ছিলো একটা শক্তিশালী সেনাবাহিনী। যার ভিতরে অন্তর্ভুক্ত ছিল তার সবচেয়ে ভীতিকর আয়ুধ দেড়শ রণহস্তীর একটা বাহিনী- ইস্পাতের চকচকে বর্ম, একটার উপরে আরেকটা বিন্যস্ত, পরিহিত হাতি যাদের লম্বা গজদন্তের সাথে বাঁকানো একধারী খাটো তরবারি সংযুক্ত।
“তৈমূর দেয়ালের নিকটে ব্যয়বহুল আর অনিশ্চিত যুদ্ধের সম্ভাবনা এড়িয়ে যেতে আগ্রহী ছিলেন এবং সুলতানের বাহিনীকে প্ররোচিত করেন দূর্গের নিরাপদ আশ্রয় ত্যাগ করে বেরিয়ে এসে আক্রমণ করতে। কিন্তু সুলতানের সেনাবাহিনী, যুদ্ধের ভেতরেই, যে দরোজা দিয়ে বের হয়ে এসেছিলো সেই একই দরোজা দিয়ে শহরে ফিরে যায়।”
