কথাটা বলার সময়ে রেহানা চোখ তুলে বাবরের দিকে তাকাতে সে বৃদ্ধার চোখে ঝলসাতে থাকা গর্ব দেখে মুগ্ধ হয়।
“পূর্বপুরুষের বীরত্বগাঁথা শুনতে আমার ভালোই লাগবে। রেহানাকে আগুনের পাশে আরাম করে বসার বন্দোবস্ত করে দিয়ে কাউকে বলেন আমাদের চা দিয়ে যেতে।” রেহানা ধীরে ধীরে তার বৃদ্ধ শরীরটা নিয়ে একটা টুলের উপরে বসে।
“বলেন কি বলতে চান।”
রেহানা এমন মর্যাদাসম্পন্ন শ্রোতাদের সামনে একট ভক্তিপূর্ণ সম্পর্কের ব্যাপারে তার কথা বলতে চাওয়ার অনুরোধ পূরণ হওয়ায় বুঝতে পারে না তার কোথা থেকে শুরু করা উচিত। সে বিড়বিড় করে কিছু বলতে গিয়ে আবার চুপ করে বসে থাকে। “আপনার দাদাজানের নাম কি ছিলো?” বাবর তাকে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে।
“তারিক।”
“তৈমূরের বাহিনীতে তিনি কি ছিলেন?”
“তিনি ছিলেন একজন অশ্বারোহী তীরন্দাজ- শ্রেষ্ঠদের মধ্যে অন্যতম।”
“আর তৈমূরকে তিনি প্রথম কোথায় দেখেন?”
“১৩৯৮ সালের গ্রীষ্মকালে, সমরকন্দে, তিনি হিন্দুস্তান- উত্তর ভারত আক্রমণের প্রস্তুতি তখন মাত্র শুরু করেছেন। তার বাবা- তৈমূরের পূর্ববর্তী অভিযানের পোড় খাওয়া যোদ্ধা- আমার দাদাজানকে নিয়ে এসেছিলেন, সমরকন্দের দেয়ালের ঠিক বাইরে দিল খোশ বাগিচায়। তৈমূর নিজে সেবার যাদের নিয়োগ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তিনি সেই দলে ছিলেন।”
“তৈমূর তখন দেখতে কেমন ছিলো সেটা কি তিনি বলেছিলেন?”
“তার বয়স তখন প্রায় ষাট বছর। আমার এখনকার বয়সের চেয়ে মাত্র বিশ বছরের ছোট,” রেহানা বলে, বয়সের বরাভয় অর্জন করা বৃদ্ধলোকদের প্রচ্ছন্ন গর্ব তার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ে। সে চুপ করে থাকে যেন প্রশংসা আশা করছে। বাবর তাকে হতাশ করে না। আমি বুঝতে পারিনি এতগুলো ঋতু পরিবর্তন দেখার সৌভাগ্য আপনার হয়েছে।”
বৃদ্ধা এবার হাসেন। “কিন্তু আমার দাদাজান আমাকে বলেছিলেন ঘন সাদা চুলের তৈমূর তখনও লম্বা আর অনত। তার ছিলো চওড়া কপাল, মন্দ্র কণ্ঠস্বর আর প্রশস্ত কাঁধ। তরুণ বয়সে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাবার কারণে আহত ডান পায়ের জন্য তখন তিনি বেশ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই হাঁটতেন। দূর্ঘটনার কারণে তার এক পা অন্য পায়ের চেয়ে বেশ খাটো হয়ে গিয়েছিলো…” ভীরুতা কেটে যেতে, সামান্য দুলতে দুলতে রেহানা পূর্ণোদ্যমে কথা বলতে থাকে। বাবর অনুমান করে বৃদ্ধা তার দীর্ঘ জীবনে অসংখ্যবার এই গল্পগুলো বলেছে।
“নিজের গিল্টি করা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে তৈমূর তার লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়। আমরা হিন্দুকুশ অতিক্রম করে গিরিপথের ভিতর দিয়ে গিয়ে সিন্ধু অতিক্রম করে হিন্দুস্তানের সমৃদ্ধ রাজধানী দিল্লী আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছি। সিকান্দারও যে শহরে পৌঁছাতে পারেন নাই। কিংবা চেঙ্গিস খান তিনি কেবল সিন্ধু অববাহিকা পর্যন্ত গিয়েছিলেন। প্রাপ্তির সম্ভাবনা অসীম। হিন্দুস্তান- হীরা, পান্না আর চুনি পাথরে সমৃদ্ধ। সভ্য দুনিয়ার একমাত্র হীরক খনি সেখানে অবস্থিত। কিন্তু সেখানের অধিবাসীদের এসব রত্নে কোনো অধিকার নেই। সেখানকার কিছু শাসক যদিও আমাদের আল্লাহতা’লার অনুসারী, কিন্তু বেশিরভাগ লোকই অর্ধেক জন্তু আর অর্ধেক মানুষের বিকৃত মূর্তির পূজারী, ভীরু স্বভাবের কাফের। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যে শহীদ হবে আল্লাহতালা তাকে নিশ্চয়ই বেহেশত নসীব করবেন। প্রজাদের ভিতরে বিদ্যমান অবিশ্বাস দূর্বলচিত্তে মেনে নেয়া এসব শাসক আর তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহতালা অবশ্যই আমাদের বিপুল ভাবে বিজয়ী করবেন। আমরা বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ লাভ করবো।’
“কিছুদিন পরেই সেনাবাহিনী শহর ত্যাগ করে। নব্বই হাজার যোদ্ধা- বেশিরভাগই অশ্বারোহী- সমরকন্দের বাইরে রোদে পোড়া তৃণভূমির উপরে ধূলোর একটা মেঘের জন্ম দিয়ে, কাতারবন্দি হয়ে যুদ্ধ যাত্রা শুরু করে। তিন দিনের ভেতরে তারা সবুজ শহর, তৈমূরের জন্মস্থান শাখরিস অতিক্রম করে যায় এবং লোহার দরোজা নামে সুপরিচিত সুরক্ষিত গিরিন্দর দিয়ে লালচে করকটে মরুভূমি কিজিল খুমে নেমে আসে।
“বিরতীহীনভাবে এগিয়ে গিয়ে তারা অক্সাস, বালখ আর আন্দারাব অতিক্রম করে। এই পুরোটা সময় তারা তৈমূরের সাম্রাজ্যের সীমান্তের ভিতরের অবস্থান করেছিলো। এরপরে তৈমূর ত্রিশ হাজার যোদ্ধার একটা অগ্রগামী দল নিয়ে আমার দাদাজান এই বাহিনীতে ছিলো- খাওয়াক গিরিপথের ভিতর দিয়ে পৃথিবীর ছাদে উঠে আসেন এবং হিন্দুকুশে পৌঁছান। সেখানে তারা প্রথমবারের মতো শীতের মোকাবেলা করেন আর সমভূমির লোকদের কাছে অপরিচিত এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। বরফের উপরে তাদের ঘোড়ার পা পিছলে যেতে থাকে। আছাড় খেয়ে কিছু কিছু ঘোড়া আরোহীসহ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। কোনো কোনো ঘোড়ার পা ভেঙে কেবল রান্নার পাত্রের উপযুক্ত হয়ে পড়ে।
“তৈমূর তার লোকদের দিনের বেলা বিশ্রাম নিয়ে রাতের বেলা যখন দিনের বেলায় বরফের উপরে জমে থাকা বরফগলা পানির স্তর শক্ত হয়ে কম পিচ্ছিল থাকে তখন যাত্রা করার আদেশ দেন। শীঘ্রই তারা একটা পাহাড়ী ঢালে পৌঁছে দড়ির সাহায্য ছাড়া যেখান থেকে অবতরণ করা অসম্ভব। তখন আমার দাদাজান আমাকে বলেছেন- তৈমূরের লোকেরা তাকে একটা খাঁটিয়ায় করে পাথুরে কিনারা থেকে একশ ফিট নিচে নামিয়ে আনে যেহেতু তার নিজের পক্ষে দড়ি বেয়ে নামা সম্ভব ছিলো না। এসময় ঠাণ্ডার ফলে তার ডান পায়ের পুরানো ক্ষতমুখ খুলে যায় এবং তিনি তার পুরো দেহের ভর এই পায়ের উপরে চাপাতে সাহস পান না। আর এই পুরোটা সময় তারা স্থানীয় উপজাতি আর কাফেরদের চোরাগোপ্তা হামলা প্রতিহত করে চলে। বরফ প্রায়ই উজ্জ্বল রক্তে সিক্ত হয়ে উঠত…
