এখন যদিও মধ্যরাত্রি প্রায় সমাগত এবং কামরার ভিতরে তার চারপাশে সবাই ঘুমে বিভোর। মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্ত নাসিকাগর্জন তার সাক্ষী। নিজের ভাবনা নানা কারণে বিক্ষিপ্ত। তার সাথে যা ঘটে গিয়েছে সেসব কারণে অসহায় আর অস্থির এবং সর্বোপরি ভবিষ্যতের গর্ভে তার আর তার পরিবারের জন্য আরও কি ভোগান্তি অপেক্ষা করছে ভেবে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ বাবর ঘুমাতে চেষ্টা করে। ঘুম পাবার বদলে ক্রুদ্ধ কিন্তু অক্ষম আক্রোশে রক্ত টগবগ করতে থাকলে, সে আলখাল্লাটা গায়ে চাপিয়ে নেয় এবং এলামেলোভাবে শুয়ে থাকা পরিচারকদের ঘুমন্ত শরীরের উপর দিয়ে নিজের ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে নিতে, মনকে প্রশমিত আর শীতল করতে সে রাতের হাড় কনকনে শীতে ভেতর বাইরে বের হয়ে আসে।
বাইরে, আকাশে তারার মেলা, এবং একটু আগে যে তুষারপাত হয়েছে জমে বরফের কুচিতে পরিণত হয়েছে। কনকনে হিম বাতাস প্রাঙ্গণের উপরে ঝড়ের মতো বইছে। গ্রামটা ঘিরে রাখা মাটির দেয়ালের দিকে সে এগিয়ে যায়। মাটির এবড়োখেবড়ো ধাপ বেয়ে সে দেয়ালের উপরে উঠে এবং সামনের আবছা সাদা ভূপ্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকে। গিরিপথের উপরে পাহাড়ের চূড়ায় চাঁদের আলো পড়ে চমকায়। পুরো দৃশ্যপটের অনাবিল সৌন্দর্যের দিকে সে রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে থাকে।
সহসা পশুর খোয়াড়ের দিক থেকে সে একটা নিঃসঙ্গ কান্নার আওয়াজ ভেসে আসতে শুনে। তারপরে হট্টগোলের ভিতরে আরেকটা আওয়াজ ভেসে আসে। মিনিটখানেক পরে ঠিক তার নিচে বরফের উপর দিয়ে একটা কালো জন্তু ছুটে এসে দাঁড়ায় এবং বরফাবৃত মাটির উপর দিয়ে ছুটে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। প্রাণীটা পালিয়ে যেতে, পশুর খোয়াড়ের রক্ষীরা তাকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে থাকে। ধাওয়া দিয়ে তারা জন্তুটাতে তাড়িয়ে এনেছে। বাবর এখন দেখে প্রাণীটা একটা ধূসর বর্ণের বেশ লম্বা নেকড়ে, মুখে কিছু একটা কামড়ে ধরে রেখেছে- খুব সম্ভবত মুরগী।
“ব্যাটাকে মারতে পারলে…” দেয়ালের নিচ দিয়ে একজন প্রহরী দৌড়ে যেতে বাবর তার কাছে প্রশ্ন করে।
“না, সুলতান। গত কয়েক রাত ধরে আমাদের গৃহপালিত পশুদের আক্রমণ করছে এই ধূর্ত নেকড়েটা। প্রথমে ঘোড়ার আস্তাবলের দিকে সে ভেতরে প্রবেশের একটা রাস্তা খুঁজে বের করে এবং গত বছর জন্ম নেয়া একটা অশ্বশাবককে আক্রমণ করার চেষ্টা করে। সেটা অসুস্থ ছিলো বলে আমরা তাকে চিকিৎসা করার জন্য আলাদা করে রেখেছিলাম। ঘোড়ার দল তাদের পায়ের খুর দিয়ে ব্যাটাকে সে রাতের মতো তাড়িয়ে দেয়। গতকাল সন্ধ্যাবেলা সে ভেড়ার খোয়াড়ে ঢুকে আর আমরা তাকে তাড়িয়ে দেবার আগে একটা ছোট ভেড়ীকে এমন বাজেভাবে কামড়ে দেয় যে আমরা বাধ্য হই তাকে জবাই করতে- আজ রাতে আমাদের মাংসের সুরা ঘোড়ার মাংসের দিলে এটার মাংস দিয়েই তৈরি হয়েছিলো, স্বাদ পরিবর্তনের জন্য। কিন্তু আজ রাত নেকড়েটা মুরগীর খোয়াড়ে ঢুকে, আর মুরগীদের চিৎকারে আমরা আসবার আগেই একটা মুরগী নিয়ে হারামজাদা পালিয়ে যায়। নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকার পুরস্কার সে পেয়েছে।”
বাবর আবার সামনের অন্ধকার প্রান্তরের দিকে তাকায়, যেখানে বিজয়ী নেকড়েটা হারিয়ে গেছে। সম্ভবত তার জন্য এটা একটা ইঙ্গিত। বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে, চেঙ্গিস খানের তৈমূরের মতো- অটল থাকতে হবে। নিজের অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করো। লক্ষ্য আদায় না হওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়বে না। নেকড়েটা ঘোড়া আর ভেড়ার খোঁয়াড়ে হামলা চালিয়ে ব্যর্থ হলেও মুরগীর খোয়াড় আক্রমণ করে ঠিকই সফলতা লাভ করেছে। সমরকন্দ আর ফারগানার প্রতি এই মুহূর্তে কম মনোযোগ দিয়ে তার উচিত সম্ভবত অন্যকোনো এলাকার কথা বিবেচনা করা, যেখানে সে নিজেকে শাসনকর্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে পারে, সালতানাৎ বাড়িয়ে তোলার আগে। তার নায়ক তৈমূর চীন থেকে ভারতবর্ষ এবং তুরস্ক পর্যন্ত উন্মত্তের মত হামলা করেছেন।
বাবর দেয়ালের উপর থেকে নেমে বাসার দিকে ফিরে আসবার সময়ে সে নিচু চালাযুক্ত মহিলা পরিচারিকাদের বাসস্থান অতিক্রম করে। বহুদিন পরে সে প্রথমবারের মতো তার বাবার বিশ্বাস জোরে জোরে নিজেকে আউড়াতে শোনে: “তৈমূরের রক্ত আমার শরীরে।” বাকি রাতটুকু সে নির্বিঘ্নে আর শান্তিতে ঘুমিয়ে কাটায়।
***
ধূসর ঘোড়াটা চকরাবকরাটার চেয়ে দ্রুতগামী…সবাই সেটা দেখতে পাবে।”
“বাবুরী, তুমি ভুল করছে। ববফ গলার পরে আমরা যখন আবার যাত্রা করবো তখন আমি তোমাকে সেটা দেখাবো।” হাত গরম করতে আগুনের উপরে রেখে সে বলে।
দরজা খোলার শব্দ আর বাতাসের একটা শীতল ঝাপটা অনুভব করে, বাবর ঘুরে তাকিয়ে হুসেন মজিদকে এগিয়ে আসতে দেখে। উচ্চতা আর কলেবরের কারণে তার পাশে পাশে এগিয়ে আসা গাঢ় সবুজ রঙের পশম দেয়া জ্যাকেট পরিহিত বৃদ্ধ মহিলার বেটে কুঁজো অবয়ব একটা মজাদার জুটি তৈরি করেছে। বয়স আর ভগ্নস্বাস্থ্য সত্ত্বেও একটা লাঠির উপরে ভর করে সে বেশ ভালোই হুসেন মজিদের সাথে তাল মিলিয়ে হেঁটে আসে।
অসম জুড়িটা বাবরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তাকে প্রথা মাফিক অভিবাদন জানায়। “সুলতান, এর নাম রেহানা।” বাবরের বিস্ময় দেখে হুসেন মজিদ তাকে বলে। “আমি যখন বাচ্চা ছিলাম তখন সে আমার লালনপালন করেছিলো এবং এখনও আমার পরিবারের খিদমত করে আসছে। আজ খুব সকালে সে আমার কাছে আসে। সে আমাকে বলে যে গতরাতে মুরগীর খোঁয়াড়ে নেকড়ে হামলার গোলমালে ঘুম ভেঙে যেতে সে মেয়ে পরিচারিকাদের বাসস্থানের রান্নাঘরে চা গরম করছিলো। তখন আপনি পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময়ে তৈমূরের বিষয়ে কিছু বলছিলেন। সে আমাকে মনে করিয়ে দেয়- ছেলেবেলায় যা আমি বহুবার শুনেছি যে তার দাদাজান দিল্লী আক্রমণের সময়ে তৈমূরের সাথে ছিলো এবং প্রায়ই তাকে সেখানকার কথা বলতো। সে জানতে চায় আপনি তার গল্প শুনতে আগ্রহী কিনা। আমি তাকে বলেছি এক বৃদ্ধ সৈনিকের মুখে শোনা গল্প আরেক বৃদ্ধা মহিলার কাছে শুনতে আপনি আগ্রহী হবেন না। কিন্তু নাছোড়বান্দার মতো অনুরোধ করতে থাকলে বাধ্য হয়ে আমি তাকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।”
