বাবরের প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হল সে তার পরিবারের মেয়েদেরও জাহাঙ্গীরের কাছে বিশ্বাস করে পাঠাতে পারবে না। তার নিজের উপস্থিতি ব্যাতীত তাদের পুনরায় সেই বন্দিদশার ভাগ্যই বরণ করতে হবে। সে যাই হোক, খুতলাঘ নিগার আর এসান দৌলত প্রস্তাবটা শোনার সাথে সাথে সেটা নিয়ে আলোচনা করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তারা বাবরের বিপদসঙ্কুল ভবঘুরে জীবন আর তদজনিত অভাব হাসিমুখে সহ্য করতে রাজি আছেন।
তারা এখন অন্তত মাথার উপরে আবার ছাদের নিরাপত্তা পেয়েছে এবং এই বাসস্থানের শীতল পরিবেশে নিভৃতে থাকার জন্য ছোট হলেও একটা কামরা পেয়েছেন। কিন্তু তাদের অবিন্যস্ত দীঘল চুলের জট থেকে উকুনের ডিম বাছতে গিয়ে একটা মাত্র হাতির দাঁতের তৈরি চিরুনী তাদের পালাক্রমে ব্যবহার করতে দেখে বাবর চোখের জল চেপে রাখতে পারেনি। তাদের কেউই এটা বা বিছানার ছারপোকা নিয়ে একবারও অভিযোগ জানায়নি। বাসি বা অপ্রতুল খাবারের ব্যাপারেও তাদের কোনো আপত্তি নেই- রান্নাঘরে চর্বি আস্তরনযুক্ত একটা ঢাউস তামার পাত্র থেকে প্রতিদিন ঘোড়ার শক্ত মাংস আর শালগম খেতে দেয়া হয়। এসান দৌলত, তার শ্রদ্ধেয় পূর্বপুরুষ, চেঙ্গিস খানের এটা খুবই পছন্দের খাবার ছিল বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
নিজের উপরেই নিজে ক্ষুব্ধ বাবর ভেবেছিল, খানজাদাকে সাইবানি খানের হাতে তুলে দেবার জন্য আম্মিজান বা নানীজান তাকে দোষারোপ করবে। কিন্তু বরাবরের মতোই। এসান দৌলত তাকে আবারও বিস্মিত করেছে। একদিন সকাল হবার অনেক পরে তিনি বাবরকে মাটির দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখে ভ্রুণের অবস্থানে কুঁকড়ে নিজের কক্ষে শুয়ে নিরবে কাঁদতে দেখেন। “বাবরজান কি হয়েছে যে নিজের অবস্থান আর পৌরুষ ভুলে গিয়েছো?” তিনি জানতে চান। সে কোনো উত্তর না দিলে তিনি আবার জানতে চান। এবার অনেক কোমল তার কণ্ঠস্বর। “বাবরজান, বলবে না কি হয়েছে?”
সে কোঁকড়ানো অবস্থান থেকে সোজা হয় এবং নানীজানের দিকে জবাফুলের মতো লাল চোখে তাকায়। “আপনি কি জানেন না? অনুমান করতে পারছেন না? সমরকন্দ আরো একবার হাতছাড়া হয়েছে বলে আমি নির্বিঘ্ন কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা সাইবানি খানের কাছে এভাবে আপোষে খানজাদাকে সমর্পন করায়। আমার নিজের নিজেকে চাবকাতে ইচ্ছা করছে। পরিবার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায়, আর ভাই হিসাবে নিজের একমাত্র বোনকে যাকে আমি এতো ভালোবাসি, তাকে রক্ষা করতে না পারায় আমি প্রচণ্ড অপমানিতবোধ করছি। তাকে উদ্ধার করার জন্য এখনও কিছুই করতে পারছি না। এতোটাই হীনবল আজ আমি ভাবতেই নিজেকে কেমন ক্লীব মনে হচ্ছে।”
এসান দৌলত বাবরের বিশাল হাতের পাঞ্জা এবার নিজের ছোট ছোট হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে। তারপরে তিনি তাকে চেঙ্গিস খানের প্রথম স্ত্রীর ভাগ্যে কি ঘটেছিলো সেটা তাকে মনে করিয়ে দেন। “সমুদ্রের মহান অধীশ্বর হবার অনেক আগে তিনি বোর্তে নামে কোনগ্রেট গোত্রের এক পৃথুলা সুন্দরী কিশোরীকে বিয়ে করেছিলেন এবং তার গোত্রের সমর্থন নিয়ে মারকিট নামে এক প্রতিবেশী গোত্রের সাথে সংঘাতের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়াস পান। অবশ্য, তখন তিনি নিতান্তই অনভিজ্ঞ আর মারকিটরা ছিলো ভীষণ ধূর্ত। মারকিটরা তার ছাউনি একবার অপ্রত্যাশিতভাবে আক্রমণ করে বোর্তেকে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং চেঙ্গিসের অনুসারী যোদ্ধাদের হয় হত্যা করে বা ছত্রভঙ্গ করে দেয়। নিঃসঙ্গ একাকী অবস্থায় তিনি কেনতাই পাহাড়ে পালিয়ে যান যেখানে মারকিটরা তাকে খুঁজে পায় না। পাহাড়ের আড়াল তিনি ভালোই ব্যবহার করেন। চেঙ্গিস খান এরপরে যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রতিদিন পাহাড়ের দেবতার পূজা করেছেন এবং প্রতিদিনই তার উদ্দেশ্যে বলি দিয়েছেন।
“পাহাড়ে আত্মগোপন করার মাত্র এক বছরের ভিতরেই কোনগ্রেট গোত্রের গঠন করা আরেকটা বাহিনীর সহায়তায় তিনি মারকিটদের পরাজিত করেন এবং বোর্তেকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। কয়েক মাস পরে সে যখন তার প্রথম পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়, যার নাম রাখা হয় জর্চি, কারো সাহস হয়নি সেই ছেলের পিতৃত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে। বড় হয়ে এই ছেলে চেঙ্গিস খানের অন্যতম এক সেনাপতি হয়েছিলেন।
“খানজাদা আর বাবর তোমরা দুজনেই চেঙ্গিস খান আর বোর্তের রক্ত বহন করছো। কখনও হতাশ না হয়ে কঠোর বাস্তবের মোকাবেলা করে পরিণামে জয়ী হবার মতো তোমার সাহস।” এসান দৌলত এবার শক্ত করে তার হাত আঁকড়ে ধরে। “যতো কঠিন আর কষ্টকরই হোক নিজের মনোবল শক্ত কর। পেছনে না তাকিয়ে সামনের দিকে কেবল সামনে তাকাবার মতো ইস্পাত কঠিন করো নিজের মন।”
নানীজানের সেই সান্ত্বনাবাণী সত্ত্বেও, আজও সাইবানি খানের রুক্ষ্ম হাত তার বোনের কোমল দেহের গোপনতম প্রান্তরে বিচরণ করছে মনে হতেই বিতৃষ্ণা আর বিবমিষাবোধ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের তালুকে চেপে বসা নখে সে নিজের সমস্ত মানসিক শক্তি একত্রিত করে ভাবনাগুলোকে মন থেকে সরিয়ে দেয়। তারপরে সে আল্লাহতালার কাছে দোয়া করে, তার বোন যেনো বেঁচে থাকার মতো মানসিক শক্তি বজায় রাখতে পারে- যেমনটা বজায় রেখেছিলেন বোর্তে এবং সাইবানি খানের কথামত চলে। সে প্রতিবাদ করতে চাইলে সেটা তার মৃত্যুই ডেকে আনবে। তাদের দুই ভাইবোনের পক্ষে সে একাই সাইবানি খানের সাথে যুদ্ধ করবে তাকে পরাভূত করতে আর তাকে এবং পরিবারের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করবে।
