“কোন বর্বরের হাতে তুলে দেবার আগে আমি নিজ হাতে আমার বোনকে হত্যা করবো।” বাবর চিৎকার করে উঠে এবং দূতকে ছেড়ে দিলে সে হুড়মুড় করে। মাটিতে বসে পড়ে।
“আপনার বোনই তাহলে কেবল মারা যাবেন না।” দূত ব্যাটা পাগড়ির প্রান্ত দিয়ে গলার ক্ষতস্থান চেপে ধরে রাখে। “আপনি যদি আমার প্রভুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তিনি তাহলে এটাকে ব্যক্তিগত অপমান বলে মনে করবেন এবং আপনারা সবাই আপনি, আপনার পুরো পরিবার, এবং আপনার নিধিরাম সেনাবাহিনী, তাহলে বেঘোরে মারা পড়বে। আর তিনি পুরো শহর জ্বালিয়ে দিয়ে শহরের অধিবাসীদের কঙ্কালের উপরে সেটা পুনঃনির্মাণ করবেন। এখন আপনি ঠিক করেন কি করবেন…”
বাবর, নিজের আর তার লোকদের দিকে তাক করা উজবেক তীরগুলোর দিকে তাকায়। সে বাইসানগার আর বাবুরীর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকায়। বাবর দূতকে আক্রমণ করার সাথে সাথে তরবারি কোষমুক্ত করে তারা সামনে এগিয়ে এসেছে। সে যে ক্রোধ আর অসহায়তা অনুভব করে তারই প্রতিচ্ছবি সে তাদের মুখেও দেখতে পায়। এবারও তার পছন্দের কোনো সুযোগ নেই। শত্ৰু পরিবেষ্টিত অবস্থায় আকস্মিক এক গৌরবময় যুদ্ধে নিজের লোকদের নেতৃত্ব দেয়া এক কথা, আর তাদের অর্থহীন নিষ্ঠুরতার সামনে, খেদাড়ে লোকজন বনজঙ্গল পিটিয়ে শিকারের পশু যেমন বৃত্তের মাঝে শিকারীর ইচ্ছায় মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, সেরকম পরিস্থিতির মধ্যে তাদের ফেলে দেয়া আরেক ব্যাপার।
উজবেক সারি পর্যবেক্ষণ করে বাবর সাইবানি খানের কর্তৃত্বপূর্ণ অবয়বটা খুঁজতে চেষ্টা করে। তাকে দ্বৈরথে আমন্ত্রণের এক বুনো ভাবনা তার মনে খেলা করতে থাকে। অবশ্য উজবেক নেতাকে সেখানে কোথাও দেখা যায় নাঃ তিনি এখন সমরকন্দে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সালতানাহীন কোনো সুলতানের সাথে সাক্ষাৎ করাটা তার জন্য এখন অসম্মানের ব্যাপার। দু’শো গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা গরুর গাড়ির দিকে বাবর হেঁটে যায়। যেখানে এসব ঘটনা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ তার আদরের আম্মিজান আর নানীজানের সাথে বসে রয়েছে। সে এক মুহূর্ত ইতস্তত করে তারপরে চামড়ার ঝালর সরায় যা তাদের আড়াল করে রেখেছে। আতঙ্কিত চোখে তিনজন তার দিকে তাকায়। তারপরে, সে যা বলতে এসেছে সেটা শোনার পরে অবিশ্বাসে তারা চিৎকার করে উঠে। চোখে টলটল করতে থাকা অশ্রু নিয়ে সে ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু অসভ্য উজবেকের কামনার কাছে তাকে বলি না দেবার জন্য খানজাদার আকুতি আর মেয়েকে বখশ দেবার জন্য আম্মিজান খুতলাঘ নিগারের কান্না তাকে বেত্রাহত কুকুরের মতো তাড়িয়ে নিয়ে যায়। “খানজাদা, কথা দিচ্ছি আমি তোমাকে নিতে আসবো। আমি ওয়াদা করছি…আমি আসবোই…” বাবর কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে উঠে বলে। কিন্তু এসব কিছুই খানজাদা শুনতে পায় না।
২.৬ মুঠোয় সোনালী হাতি এক বৃদ্ধা
১২. মুঠোয় সোনালী হাতি এক বৃদ্ধা
ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যাবেলা। বাবর তার সামনের বিশাল, খোলা অগ্নিকুণ্ডে প্রজ্জ্বলিত কাঠের টুকরো হাতের লাঠি দিয়ে খোঁচা দেয় সেখান থেকে আরেকটু বেশি উষ্ণতা পেতে। তার দেহের সামনের অংশ আর মুখমণ্ডল যদিও সরাসরি উত্তাপের কারণে উষ্ণ। কিন্তু তার পরণে বাদামী রঙের মোটা পশমের আলখাল্লা থাকা সত্ত্বেও মাটির-ইটের তৈরি বাড়িটার ছোট, চাকচিক্যহীন, কোনমতে বন্ধ করা জানালার উপরে ঝুলে থাকা পর্দার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত কনকনে শীতল বাতাসের কামড় পিঠে ঠিকই অনুভব করে। এই বায়ুপ্রবাহের ফলে অবশ্য একটা লাভ হয়েছে যে চিমনি দিয়ে কিছুটা হলেও কাঠের ধোঁয়া বের হয়ে যেতে পারছে। ধোয়াটা এত ঘন আর ঝাঝালো যে বাবরের চোখ জ্বালা করছে।
সে ভাবে যে গত শরতের সেই দিন যখন, চারপাশে বাতাসের দাপটে উড়তে থাকা তুষারের দাপটের ভিতর দিয়ে সে তার খুব বেশি হলে দুইশ লোকের বহরটা নিয়ে প্রশস্ত গিরিপথ অতিক্রম করে সেরামের এই ক্ষুদ্র বসতিতে উপস্থিত হয়েছিলো। তার পরে থেকে সে কেবল চোখের পানিই ফেলে চলেছে। সত্যি কথা বলতে, জায়গাটা আসলে একটা দেয়ালঘেরা ছোট পশুপালকদের গ্রাম। যেখানে দুটো কি তিনটা সরাইখানা রয়েছে কদাচিত উপস্থিত হওয়া আগন্তুকদের খিদমত করতে। কিন্তু দুটো কারণে স্থানটা বাবরকে আকৃষ্ট করেছে। গ্রামের গাট্টাগোট্টা সর্দার, হুসেন। মজিদ, সমরকন্দে মাহমুদের হাতে নিহত আলী মজিদ বেগের চাচাত ভাই এবং বাবরের একনিষ্ট অনুগত। আরেকটা ব্যাপার হল বসতিটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। কাশগর থেকে আগত একটা মোটামুটিভাবে প্রচলিত বাণিজ্য পথের ধারে গ্রামটা অবস্থিত হলেও, ফারগানার সীমান্তচৌকী আর সাইবানি খানের বাহিনী দু’দলের কাছ থেকেই জায়গাটা অনেক দূরে।
বাবর জানে সমরকন্দ থেকে বিতাড়িত হবার পরে জাহাঙ্গীরের প্রস্তাবিত শরণ প্রত্যাখ্যান করে সে মোটেই ভুল করেনি। প্রথমত প্রস্তাবটার আন্তরিকতা বিষয়ে সে ভীষণভাবে সন্দিহান এবং দ্বিতীয়ত সে তার সৎ-ভাই আর তার নিয়ন্ত্রক তামবালের খপ্পড়ে গিয়ে পড়তে চায়নি। আর তাছাড়া, জাহাঙ্গীর আর তার ফন্দিবাজ মা, রোক্সানাকে একদা মৌন সহনশীলতা বলে সে মেনে নিয়েছিল। এখন সেই ভঙ্গুর সম্পর্ক সে ব্যবহার করতে চায় না।
