বাবরের অবশিষ্ট বাহিনী ইতিমধ্যে শহরের ভিতর দিয়ে উত্তরদিকে শেখজাদা দরোজার দিকে রওয়ানা দিয়েছে। সাইবানি খান আজ্ঞপ্তি জারি করেছে যে বাবরকে তার বাহিনী নিয়ে এই দরোজা দিয়ে শহর ত্যাগ করতে হবে। আর কয়েক ঘণ্টা পরে, সাইবানি খান তার গাঢ় আলখাল্লা সজ্জিত উজবেক যোদ্ধা পরিবেষ্টিত অবস্থায় মহিমান্বিত ফিরোজা তোরণদ্বার দিয়ে শহরে প্রবেশ করবেন।
পুরো শহরে একটা গুমোট আর স্থবির অবস্থা বিরাজ করে। বাবর আর তার বাহিনী এগিয়ে যেতে বেশিরভাগ বাড়ির দরোজা জানালার কপাট বন্ধ এবং হুড়কো দেয়া দেখা যায়। যদিও মাঝে মাঝে কাউকে উঁকি দিয়ে সশব্দে থুতু ফেলতে দেখা যায়। বাবর তাদের কোনো দোষ দেয় না। বাবর চাইলে ঘোষণা করতে পারে যে, এটা একটা সাময়িক ছন্দপতন, সে আবার ফিরে আসবে। যা কোনো রুচিহীন উজবেক অধীনে না, তৈমূর বংশীয় সুলতানের অধীনে সমরকন্দের জন্য একটা স্বর্ণালী যুগের সূচনা করবে। কিন্তু তার কথা শহরের লোকেরা কেন বিশ্বাস করবে? ঘোড়ায় বসে থাকার সময়ে বাবরের পিঠ যতোই সোজা হয়ে থাকুক, যতোই কঠোর হোক তার। মুখভাব, লোকদের চোখ তার দেহ ভেদ করতে পারে না এবং তার হৃদয়ে সাফল্যের ইস্পাত কঠিন প্রত্যয় দেখতে পায় না।
প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে এবং সূর্য দোর্দণ্ডরূপ ধারণ করেছে। বাবর ভাবে আজকের দিনে তারা বেশিদূর যাবে না। তারা পূর্ব দিকে ঘুরে গিয়ে কোলবা পাহাড়ের দূরবর্তী প্রান্তে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করবে। সেখান থেকে অন্তত সমরকন্দ তার চোখে পড়বে না। আগামীকাল সে তার মন্ত্রণাদাতাদের নিয়ে আলোচনায় বসবে, কোথায় গেলে ভাল হবে। এসান দৌলত ফারগানা ছাড়িয়ে পূর্বদিকে তার লোকদের কাছে যাবার জন্য তাকে অনুরোধ করেছে। বুড়ির কথাই সম্ভবত ঠিক। যদিও বাবরের সহজাত প্রবৃত্তি তাকে পাহাড়ের এখান থেকে বেশি দূরে না, এমন কোনো নির্জনস্থানে আত্মগোপন করে এবং সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করে…
সে এবার সামনে শেখজাদা তোরণের উঁচু বাঁকানো খিলান দেখতে পায়। সে তোরণদ্বারের দিকে রওয়ানা দিতে বাইসানগার তার দিকে এগিয়ে আসে। তাকে কঠোর আর যেতে অনিচ্ছুক দেখায়। সেটাই হবার কথা, কারণ এটা তার শহর সে যেখানে জন্ম গ্রহণ করেছে: সেই শহরটা উজবেকদের হাতে তুলে দিতে তার মোটেই ভালো লাগার কথা না। বাবরের চেয়ে কোনো অংশে কম না তার ক্ষতির মাত্রা।
“সুলতান, তোরণের পরে তৃণভূমিতে লোকদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করে রাখা হয়েছে এবং আরো ব্যাপার আছে। সাইবানি খানের দূত আপনার সাথে আরেকবার দেখা করতে চায়।”
“বেশ, ভালো। আমি আমার লোকদের সাথে যোগ দেয়ামাত্র তাকে আমার সামনে হাজির করবে।”
বাবরের বাহিনী- দু’হাজারের বেশি হবে না সংখ্যায়- যাদের নিয়ে সে সমরকন্দ জয় করেছিলো, তাদের তুলনায় নিতান্তই জরাজীর্ণ, শোচনীয় অবস্থা এখন। তাদের পেছন পেছন আসা মৃত্যু, ব্যাধি, পলায়ন আর খাদ্যাভাব তার দায় পুরো উসুল করে নিয়েছে। আজ আর কোনো উজ্জ্বল সবুজ বা হলুদ রঙের নিশান দেখা যায় না, যা দেখে তাদের সমরকন্দ বা ফারগানার সৈন্য বলে সনাক্ত করা যাবে। অবশ্য তাদের সে পরিচয়ও এখন ঘুচে গেছে।
বাবর তার লোকদের দিকে এগিয়ে যেতে তারা নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শহরের বাইরে পৌঁছে যাবার পরে এদের ভেতরে কতোজন নিজের লোকদের কাছে ফিরে যাবে, বা তাদের আরো ভালভাবে পুরস্কৃত করতে পারবে এমন নৃপতির সন্ধান করবে?
রোদেপোড়া মাটির উপর দিয়ে ঘোড়া নিয়ে মোটাসোটা উজবেক দূতকে সে এগিয়ে আসতে দেখে। ব্যাটা আবার কি চায়? নিজের প্রভুর পক্ষে আত্মতৃপ্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখতে?
“তো?”
“আপনার আর আমার প্রভুর মাঝে এই নতুন সমঝোতা স্মরণীয় করে রাখতে তিনি একটা দারুণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আপনার বোন, মহামান্য শাহজাদীকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করবেন।”
“কি?” নিজের অজান্তে বাবরের হাত তরবারির বাঁট স্পর্শ করে। এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে করে তরমুজে লাথি দিয়ে সে যেমন রস বের করে দিয়েছিলো তেমনিভাবে হোতকা ভাড়টার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা রক্ত ছিটাতে ছিটাতে গড়াতে থাকুক।
“আমি বলতে চাইছি আমার প্রভু সাইবানি খান ঠিক করেছেন আপনার বোন খানজাদাকে নিকাহ করবেন… তিনি এখন তাকে নিয়ে যাবেন…”
“সুলতান…” বাবর বাইসানগারের আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।
বাবর মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে লোহার দরোজার দিক থেকে গাঢ় রঙের আলখাল্লা পরিহিত অশ্বারোহী বাহিনী ধনুক প্রস্তুত অবস্থায় ধেয়ে আসছে। নিমেষের ভেতরে বাবর আর তার লোকদের তারা তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। আরেকদিক আটকে রাখে শহরের পোক্ত দেয়াল। একটা ফাঁদ…
“এই তাহলে সাইবানি খানের কথা রাখার নমুনা…” বাবর ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে দূতকেও টেনে নামায় এবং লোকটার নধর গলায় খঞ্জর চেপে ধরে। উজবেক পাঠাটার গায়ে অসুরের মত শক্তি। সে তার বেষ্টনী থেকে ছুটতে চেষ্টা করে কিন্তু বাবরের হাতের খঞ্জরের ফলা তার চামড়া কেটে বসে। ঘন লাল রক্তের বিন্দু ক্ষতস্থানে দেখা দিতে তার লাফালাফি বন্ধ হয়।
“আমার প্রভু মোটেই ওয়াদার বরখেলাপ করেননি।” দূত ব্যাটা হাঁসফাস করে বলে। “তিনি আপনাকে নিরাপদে যেতে দেবেন বলে ওয়াদা করেছেন এবং আপনি। তাই যাবেন। তিনি কেবল নিজের জন্য একটা স্ত্রী খুঁজছেন।”
