“আপনি আপনার প্রভুকে গিয়ে বলবেন আমাদের এসব প্রয়োজন নেই। সমরকন্দের দেয়ালের অভ্যন্তরে অবস্থিত বাগানের ফলের গাছ পাকা ফলে নুয়ে পড়ছে। আমরা এগুলো আমাদের গাধাকে খাওয়াবো…” বাবর উঠে দাঁড়ায় এবং দূতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময়ে সে ইচ্ছাকৃতভাবে একটা তরমুজ লাথি দিয়ে সরিয়ে দেয়। কক্ষের মেঝেতে গড়িয়ে গিয়ে সেটা পাথরের চৌকাঠে আঘাত করতে ভেতরে নরম সোনালী আঁশ চুঁইয়ে বের হয়ে আসে।
***
“আমরা কি তাকে বিশ্বাস করতে পারি?” সেদিন রাতে, মোমবাতির আলোতে আলোকিত মন্ত্রণা কক্ষে তারা মিলিত হতে, বাবরের চোখ তার মন্ত্রণাদাতাদের মুখের অভিব্যক্তি পড়তে চেষ্টা করে। তাদের মতামত শোনার আগে পুরো বিষয়টা নিয়ে তাকে ভালো করে ভেবে দেখতে হবে।
“সে একটা বর্বর এবং আমাদের জানের দুশমন। কিন্তু সে কথা দিয়েছে।” বাইসানগার অভিমত প্রকাশ করে।
“গরু চোরের কথার মূল্য…” বাবর কঠোর ভঙ্গিতে প্রত্যুত্তর দেয়।
“কিন্তু পবিত্র কোরান শরীফের নামে এভাবে প্রকাশ্যে শপথ নিয়ে সেটা ভঙ্গ করলে তার বদনাম হবে।”
“কিন্তু তার এমন প্রস্তাব পাঠাবার কারণ কি? আমাদের চেয়ে তার সেনাবাহিনী সংখ্যায় বিশাল এবং যখন জানে সে শহরে তুমুল খাদ্যাভাব বিরাজ করছে। অপেক্ষা করতে চাইছে না কেন? সাইবানি খানের ধৈর্যের অভাব আছে বলে তো জানতাম না?”
“সুলতান, আমার মনে হয় আমি প্রস্তাব পাঠাবার আসল কারণ কি বুঝতে পেরেছি।” বাবুরী, বাবরের মঞ্চের একপাশে যেখানে সতর্কাবস্থায় দাঁড়িয়েছিলো সেখান থেকে সামনে এগিয়ে আসে।
‘কারণ বলো।” বাবর তার চারপাশে তাকে ঘিরে বসে থাকা লোকদের সাথে তাকে বসতে ইঙ্গিত করে। একজন সাধারণ সৈনিককে সুলতান তাদের মাঝে বসতে আহবান করেছেন এজন্য কেউ কেউ বিস্মিত হলেও সেটা সে অগ্রাহ্য করে।
“বাজারে জোর গুজব রটেছে- যারা আজ সাইবানি খানের দূতের পরিচারকের সাথে কথা বলেছে তারাই গুজবটা ছড়িয়েছে- সাইবানি খান উজবেক গোত্রের ভিতর থেকে তার নেতৃত্বে প্রতি হুমকি অনুভব করছেন। তারা বলেছে যে তৃণভূমির অনেক অভ্যন্তরে বসবাসরত তার এক ভাস্তে, তার বিরুদ্ধে একটা সামরিক বাহিনী গড়ে তুলছে। সাইবানি খান উত্তরে গিয়ে এই বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠবার আগেই একে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে চায়। সে যদি শীঘ্রই রওয়ানা না দেয়, তাহলে আবহাওয়া বৈরী হয়ে উঠবে এবং আগামী বসন্তের আগে সে আর কিছুই করতে পারবে না…”
বাবর ভাবে, কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে অবরোধ করে সময় নষ্ট করাটা সাইবানি খানের কাছে এখন বিলাসিতার সামিল। সে এখন যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব শহরটা পুনরায় দখল নিয়ে এর নিরাপত্তায় একটা সেনাবাহিনী মোতায়েন করে নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধির নিমিত্তে রওয়ানা হতে চাইবে। সে এখন তার লোকবল আর রসদ সামগ্রীর যে কোনো ধরণের ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে যাবে। বাবরের পশ্চাদপসরণকারী বাহিনীকে হেনস্থা করে-তৈমূর বংশীয় অন্যান্য গোত্রপতি আর সুলতানদের ঘাটাতে চাইবে না।
“আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।” বাবর উঠে দাঁড়ায়। “আমি উজবেকদের শর্ত মেনে নেব- যদি তারা আমার লোকদের পুরোপুরি অস্ত্র সজ্জিত অবস্থায় এখান থেকে যেতে দিতে রাজি হয়। তারপরে সে তার কণ্ঠে যতোটা সম্ভব নিশ্চয়তার ছোঁয়া যোগ করে বলে, “জনগণও রক্ষা পাবে এবং ইনশাআল্লা- আল্লাহতালা যদি চান আমরা আবার ফিরে আসবো।”
পরের দিন ভোরবেলা বাবর কোক সরাইয়ের ছাদ থেকে, কাশিম তার বার্তাবাহী দূতকে, সমরকন্দের সবুজ নিশানাবাহী দুইজন সৈন্যসহ ধীরে ধীরে ফিরোজা দয়োজা অতিক্রম করে সাইবানি খানের শিবিরের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে।
সে তার লোকদের যতোই বোঝাতে চেষ্টা করুক এটা আসলে আত্মসমর্পণ- এমন একটা ব্যাপার যার মুখোমুখি সে জীবনে আগে কখনও হয়নি বা কখনও করবে বলে বিশ্বাসও করতো না। আর এই ব্যাপারটা ভাবলেই তার বমি বমি পায়। অবশ্য সে এই অভিযানের শুরু থেকেই জানে যে এবার তাকে প্রবল প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হবে। আর শেষ পর্যন্ত সাইবানি খানের শর্তে রাজি না হওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো বিকল্পও ছিলো না। সমরকন্দের জনগণের স্বার্থে এটাই ছিলো একমাত্র পথ। কিন্তু পশ্চাদপসরণের ভাবনা- চরম ঘৃণিত এক শত্রুর হাতে শহর তুলে দেয়া- খুবানি বহুদিন গাছে থাকলে যেমন তিতে স্বাদ হয়, তেমনি তিক্ত স্বাদ তার মুখে সে টের পায়। অবশ্য আরেকদিক দিয়ে ভাবতে গেলে, এর ফলে সে নিজেও মুক্ত হবে এবং সুযোগ পাবে নিজের আর নিজের পরিবারের সমৃদ্ধি পুনঃনির্মাণের। তার আত্মবিশ্বাস আর একাগ্রতা বজায় থাকে, সে জানে সেটা বজায় থাকবে। সে এখনও বয়সে তরুণ এবং বিরাট সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হবে এমন শিক্ষা তাকে দেয়া হয়নি। সে তার নিয়তির লিখন সার্থক করবেই।
***
বাবর তার ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে উঁচু কোক সরাইয়ের দিকে একবারও ফিরে না তাকিয়ে বের হয়ে আসে। তার দেহরক্ষী বাহিনী, যাদের ভিতরে বাবুরীও রয়েছে, তার পেছনেই রয়েছে এবং সারির একেবারে শেষে, অশ্বারোহী বাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত এবং চামড়ার পর্দা দিয়ে আড়াল করা একটা গরুর গাড়িতে পরিচারিকাদের নিয়ে তার আম্মিজান, নানীজান আর বোন আসছে।
তার স্ত্রী আর অন্যান্য মেয়েদের আরেকটা গাড়িকে মাঙ্গলিঘ তীরন্দাজ বাহিনী, যারা এখন জামমীন ফিরে যাবে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসছে। আয়েশা তার বাবার সাথে দেখা করার জন্য তাদের সাথে যেতে চাইলে বাবর সানন্দে সম্মতি দিয়েছে। এখন পর্যন্ত তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ের এটাই একমাত্র উজ্জ্বল দিক বলে তার কাছে প্রতিপন্ন হয়েছে।
