“বাবুরি, লোকগুলো কি ভাবছে?”
“নিজের খিদে নিবারণ ছাড়া আর কিছুই তারা ভাবছে না। আর সামান্য যে কয়বার তারা অন্য কিছু ভাববার মতো ফুরসত পায় তখন সাইবানি খান শহর দখল করে কি করবে, সেটা ভেবে ভয় পায় যা তাদের ধারণা আসন্ন। উজবেকরা গতবার কোনো কারণ ছাড়াই হত্যা, ধর্ষণ আর ধবংসযজ্ঞে মেতেছিলো। সাইবানি খান এবার মনে রাখবে কিভাবে শহরের অধিবাসীরা আপনাকে স্বাগত জানিয়েছে, তার লোকদের উপর হামলা করেছে এবং সে নিশ্চিতভাবেই এর প্রতিশোধ নিতে চাইবে।”
“আমি তৈমূরের সমাধিতে যাবো…” বাবর সহসা ঘোষণা করে। বাবুরীকে বিস্মিত দেখায় কিন্তু সে কিছু বলা থেকে বিরত থাকে।
সমাধিপ্রাঙ্গণের প্রবেশ পথের সামনের আঙ্গিনায় ঘোড়ার চড়ে প্রবেশ করে বাবর। লাফিয়ে নেমে আসে এবং ইঙ্গিতে বাবুরীকে তার সাথে ভেতরে আসতে বলে। সমাধিপ্রাঙ্গণের খিদমতগারদের হাতের ইশারায় চলে যেতে বলে। সে দ্রুত ভেতরের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে এবং তৈমূরের মরদেহ যেখানে শায়িত রয়েছে সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষে প্রবেশ করে।
বাবর শীতল পাথরের উপরে হাত রাখে। “এখানেই শায়িত আছেন মহাবীর তৈমূর। আমি প্রথমবার যখন এখানে এসেছিলাম, তখন শপথ নিয়েছিলাম যে তার যোগ্য উত্তরসূরী বলে নিজেকে প্রমাণ করবো। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার সময় হয়েছে। শহরের দেয়ালের বাইরে আমি একটা শেষ যুদ্ধে আমার লোকদের নেতৃত্ব দেবো। ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে বলতে না পারে, তৈমূরের শহর আমি কোনো ধরণের প্রতিরোধ গড়ে না তুলে বর্বরদের হাতে সমর্পণ করেছি…”
“তিল তিল করে ধুকে মরার চেয়ে যখন আমাদের তরবারি চালাবার মতো শক্তিও আর অবশিষ্ট থাকবে না, তারচেয়ে এ ধরণের মৃত্যুই ভালো…”
বাবর সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ে এবং আগেও যেমন করেছে এবারও শীতল পাথরের শবাধার চুম্বন করার জন্য নত হয়।
কিন্তু তারা কোক সরাইয়ে ফিরে আসবার সময়ে পথে বাবর কিছু একটা পরিবর্তন আঁচ করতে পারে। রাস্তায় আগের চেয়ে অনেক বেশি লোক দেখা যায় এবং সবাই উৎসুক ভঙ্গিতে হাত পা নেড়ে কথা বলছে, ভাবটা এমন যেনো আলাপ করার মতো সংবাদ তারা জানতে পেরেছে। সে যেদিকে চলেছে অনেকেই সেদিকে এগিয়ে যায়, চারপাশে একটা জনসমুদ্রের সৃষ্টি হতে তার দেহরক্ষীর দল বাবরকে ঘিরে একটা বেষ্টনী গড়ে তুলে এবং তাকে নির্বিঘ্নে অতিক্রমের সুযোগ দিতে তারা হাতের বর্শার হাতল ব্যবহার করে লোকজনকে ঠেলে পেছনে সরিয়ে দেয়।
তার এক সৈন্য বর্শা উঁচিয়ে তার দিকে ধেয়ে আসে। “সুলতান।” প্রহরী কথা বলার মতো দূরত্বে এসে হাজির হতে চেঁচিয়ে উঠে। “সাইবানি খান একজন বার্তাবাহক পাঠিয়েছে।”
দশ মিনিটের ভিতরে বাবর কোক সরাইয়ে ফিরে এসে মন্ত্রণা কক্ষে, যেখানে সভাসদরা তার জন্য অপেক্ষা করছে, দর্শন দেয়।
উজবেক দূত কালো পাগড়ি আর গাঢ় বেগুনী রঙের জোব্বা পরিহিত বেশ মোটাসোটা দীর্ঘকায় এক ব্যক্তি। এক রণকুঠার লোকটার পিঠে ঝোলানো, কোমরে ঝুলছে খাঁটো, বাঁকা, একধারি তলোয়ার এবং কমলা রঙের পরিকরে গোঁজা রয়েছে রূপার বাঁটযুক্ত খঞ্জর। বাবর মন্ত্রণা কক্ষে প্রবেশ করতে সে হাত দিয়ে বুক স্পর্শ করে।
“আপনি কি সংবাদ নিয়ে এসেছেন?”
“আমার প্রভু আপনার বিড়ম্বনার একটা সমাধান প্রস্তাব করেছেন।”
“আর সেটা কি?”
“তিনি চোরের মতো আপনার শহর দখল করার ব্যাপারটা মার্জনা করতে প্রস্তুত আছেন। তার ন্যায়সঙ্গত সম্পত্তি তাকে ফিরিয়ে দিলে আপনাকে, আপনার পরিবার আর সেনাবাহিনীসহ শহর ত্যাগ করতে দেয়া হবে। তিনি আপনাকে ফারগানা বা পশ্চিমে কিংবা দক্ষিণে আপনার যেখানে পছন্দ সেখানে নিরাপদে গমন করতে দেবেন। পবিত্র কোরান শরীফের নামে তিনি শপথ করছেন যে তিনি আপনাকে আক্রমণ করবেন না।”
“আর এই শহর আর এর লোকদের ভাগ্যে কি ঘটবে? তিনি কি মানুষের চামড়া দিয়ে আরও ঢাক প্রস্তুত করতে চান, যেমনটা তিনি আমার ভাই শাহজাদা মাহমুদের চামড়া দিয়ে তৈরি করেছিলেন?”
“আমার প্রভু বলেছেন তাকে অপমাণিত করার জন্য শহরের বাসিন্দাদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু সেটা হবে কর আরোপের মাধ্যমে। যে কোনো ধরণের রক্তপাত পরিহার করা হবে। তিনি এ বিষয়েও কোরান শরীফ সাক্ষী রেখে ওয়াদা করছেন।”
“এর সাথে কি আর কোনো শর্ত আছে?”
“একেবারেই না। কেবল একটাই কথা আগামী পূর্ণিমার আগে তার মানে এখন থেকে দু’সপ্তাহকালের ভিতরে আপনি সমরকন্দ ত্যাগ করবেন।” বিশালদেহী দূত তার ততোধিক বিশাল উদরের উপরে হাত ভাঁজ করে দাঁড়ায়।
“সাইবানি খানকে গিয়ে বলবেন, আমি তার প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখবো। আর আগামীকাল দুপুর নাগাদ আমার উত্তর জানাবো।”
“আর সেই অবসরে আমার প্রভুর তরফ থেকে আমি আপনার জন্য সামান্য উপহার নিয়ে এসেছি।” বিশালদেহী উজবেক দূত আঙ্গুলে তুড়ি বাজাতে তার একজন পরিচারক, যে একপাশে নিরবে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো এবার একটা বিশাল ঝুড়ি নিয়ে সামনে এগিয়ে আসে। ঝুড়ির মুখের মোচাকৃতি ঢাকনা খুলে সে ভেতরে জিনিস মঞ্চের নিচে পাতা গালিচার উপরে ঢেলে দেয়- সমরকন্দের বাইরে অবস্থিত ফলবাগানের সুপ, মধুর মতো মিষ্টি এবং সোনালী রঙের তরমুজ গড়িয়ে বের হয়ে আসতে তাদের মুখে পানি নিয়ে আসা সুগন্ধে কক্ষটা মম করতে থাকে। “আমি দুটো গাধার পিঠে বোঝাই করে নিয়ে এসেছি। ফিরোজা দরোজায় গাধাগুলো দাঁড়িয়ে আছে। আমার প্রভুর বিশ্বাস ফলগুলো আপনার রসনা তৃপ্ত করবে।”
