তারপরেই বাবর দেখে অপর পাড়ে দাঁড়ানো এক তীরন্দাজ তার দিকে ধনুক তাক করে এবং ধনুকের ছিলা কানের পাশে টেনে নিয়ে আসে। শিকার লক্ষ্য করে উড়াল দেয়া বাজপাখির মতো কালো পালক শোভিত তীর ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে বাতাস কেটে অমোঘ গতিতে এগিয়ে আসে। কোনো অজানা কারণে, ওয়াজির খান ঘুরে দাঁড়ায় এবং সেভাবে দাঁড়ানো অবস্থায়, তীরটা তার অরক্ষিত গলায় এমন জোরে এসে আঘাত করে যে তীরের ফলাটা তার ঘাড়ের পেছন দিয়ে বের হয়ে আসে। সে ঘোড়ার উপর থেকে ধীরে ধীরে কাত হয়ে প্রচণ্ড গর্জন করে বহমান খরস্রোতা পানিতে গড়িয়ে পড়ে। বাবরের বেপরোয়া, হতাশ চিৎকার তাকে অনুসরণ করে রক্তে লাল হয়ে উঠা পানিতে তার দেহ ধীরে বয়ে যায়।
আকশির দূর্গে তার আব্বাজানকে অতল খাদে আছড়ে পড়তে দেখে সে যেমন স্তম্ভিত, হতভম্ব হয়ে পড়েছিল আজও তার ঠিক সেই দশা হয়। সে মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে চোখ বন্ধ করে।
“সুলতান, আমাদের এখান থেকে যেতে হবে…” বাবুরীর কণ্ঠস্বর তার কানে আসে। বাবর যখন কোনো উত্তর দেয় না, তখন সে রুক্ষভাবে তাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়। এভাবে বসে থাকলে চলবে না…সেটা মূর্খতার সামিল হবে…”
“ওয়াজির খান…ভাটিতে খুঁজে দেখার জন্য একটা অনুসন্ধানী দল আমি পাঠাতে চাই…সে হয়তো এখনও বেঁচে আছে।”
“তিনি মারা গিয়েছেন…এখন মৃতরাই তার দায়িত্ব নেবে। নিজেকে বাঁচানো ছাড়া আপনি এখন তার জন্য কিছুই করতে পারবেন না… বেঁচে থাকলে তিনিও তাই চাইতেন। আপনি সেটা জানেন…এখন চলুন…”
***
“সুলতান, শস্যভাণ্ডার প্রায় খালি হয়ে এসেছে।” বাবরের অভিজ্ঞ উজির অবরোধ আরম্ভ হবার পর থেকে সমরকন্দের শস্য পরিস্থিতি লিপিবদ্ধ করে এসেছে যে লাল রঙের চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা খেরো খাতায়, সেটার দিকে একবার তাকিয়ে তারপরে বলে।
“আর কতদিনের রসদ মজুদ রয়েছে?”
“পাঁচ দিনের মতো। খুব বেশি হলে এক সপ্তাহ চলবে।”
খাদ্যের পরিমাণ আরও কমাবার কোনো প্রশ্ন উঠে না। একজন সৈনিকের জন্য এখনই দৈনিক বরাদ্দ তিনকাপ শস্যদানা, পুরুষ নাগরিকের জন্য দুইকাপ এবং বাচ্চা আর মেয়েদের জন্য এক কাপ করে শস্য বরাদ্দ করা রয়েছে। শহরের অধিবাসীরা ইতিমধ্যে চোখের সামনে যা কিছু দেখছে তাই খেতে শুরু করেছে। গুলতি দিয়ে শিকার করা কাক থেকে আরম্ভ করে গাধা বা কুকুরের মাংস যেসব প্রাণী খাদ্যের অভাবে মারা গিয়েছে বা মাংসের জন্য তাদের জবাই করা হয়েছে। শাহী আস্তাবলের ভারবাহী প্রাণীদের অনেক আগেই সৈনিকদের মাংসের প্রয়োজনে হালাল করা হয়েছে। তার লোকেরা বাধ্য হয়ে এই সময়ের জন্য দারুণ মূল্যবান অশ্বারোহী বাহিনীর ঘোড়াগুলিকে গাছের পাতা আর কাঠের গুড়ো পানিতে গুলে খেতে দিচ্ছে ফলে প্রতিদিনই প্রাণীগুলোর অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়ে উঠছে। শীঘ্রই এমন সময় আসবে যখন তারা বাধ্য হবে ঘোড়াগুলিকে হত্যা করতে। একবার ঘোড়ার পাল শেষ হয়ে গেলে তারা শহরের চারপাশের দেয়ালে উজবেক অবরোধ ছিন্ন করে ঝটিকা বাহিনী পাঠিয়ে রসদের অন্বেষণ করতে ব্যর্থ হবে।
গত তিন মাস ধরে প্রতিটা দিন বাবর কেবল একটা বিষয়ই চিন্তা করেছে সাইবানি খান কি আদৌ আক্রমণ করবে। কিন্তু সে কেন আক্রমণ করবে? বাবরের আত্মসমর্পন যখন সে জানে এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। নিদারুণ খাদ্যকষ্টে দিন অতিবাহিত করা শহরের লোকদের চোখের সামনে সে প্রতিদিন দেয়ালের কাছে নিজের লোকদের জন্য ভূড়িভোজের আয়োজন করে সে বোধহয় বিকৃত আনন্দ লাভ করছে এবং আশেপাশের গ্রাম থেকে লুট করে আনা খাদ্যশস্যের স্তূপ অবরুদ্ধ শহরবাসীর চোখের সামনে পুড়িয়ে দিয়ে সে যেনো তাদের বলতে চায়, “নষ্ট করার মতো যথেষ্ট খাবার আমার রয়েছে- তোমাদের অবশ্য কিছুই নেই।”
এসবের চেয়েও জঘন্য বিষয়, তিন সপ্তাহ আগে বাবরের সেনাবাহিনীর ছয়জন পক্ষত্যাগী সদস্য তার হাতে ধরা পড়েছিলো যারা শহরের দেয়াল টপকে পালাতে চেষ্টা করেছিলো এবং তার আদেশে শহর রক্ষাকারী দেয়ালের ঠিক সামনে তার আদেশে বেচারীদের বিশাল তামার পাত্রে তেলে সিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের অন্তিম চিৎকারের একটা সুফল এসেছে আর কেউ এরপরে আর পালাবার চেষ্টা করেনি।
বাবর কাশিমকে বিদায় করে, সিঁড়ি দিয়ে আঙ্গিনায় নেমে এসে দেহরক্ষীসহ একটা ঘোড়া প্রস্তুত করতে বলে। ওয়াজির খানের মৃত্যুর শোক সে এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি- সে একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর অভাবই কেবল অনুভব করে না, সেই সাথে এই হতাশাব্যঞ্জক বিষণ্ণ সময়ে সে তার মতো একজন অভিজ্ঞ পরামর্শদাতার শূন্যতা। আজকাল তার সাথে যারা ঘোড়া নিয়ে বের হয় তাদের ভিতরে বাবুরী প্রধান। গত কয়েক মাসের অভাবের ফলে তার চোখের নিচের হাড় আরও উঁচু হয়েছে। কি ঘটছে সে বিষয়ে সে ভালই মূল্যায়ন করতে পারে এবং খোলাখুলি কথা বলতেও সে প্রস্তুত।
রেজিস্তান চত্ত্বরে স্থাপিত, রেশমের চাদোয়ার নিচে পান্নাশোভিত হয়ে মঞ্চে উপবিষ্ট হয়েছিলো যখন বাবর- উৎসবমুখর সেসব দিন থেকে আজকের দিন কতো আলাদা। সমরকন্দের চিত্তাকর্ষক টাইলসেশোভিত চাকচিক্যময় ভবনগুলোকে সেদিন কেমন ম্লান মনে হয়েছিলো।
বাবর যে রাস্তা দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যায় সেখানে পূতিগন্ধময় জঞ্জাল আর আবর্জনা জমে স্তূপ হয়ে আছে যা সরাবার মতো লোক নেই। যদি না কেউ খাবারের সন্ধানে সেখানে হাতড়াতে না আসে। বাবুরি তাকে বলেছে ক্ষুধার জ্বালায় মরিয়া হয়ে কিছু নগরবাসী গোবর ঝাঁঝরিতে ফেলে চেলে দেখেছে সিদ্ধ করার মত শস্যদানা পাওয়া যায় কিনা। অন্যেরা হাতের কাছে লতা পাতা যা পাচ্ছে তাই পানিতে সিদ্ধ করছে। বাবর যেদিকেই তাকায় সে চুপসে যাওয়া মুখ আর কোটরাগত মলিন চোখ দেখতে পায়। যে লোকগুলো এক সময়ে তাকে দেখে উফুল্ল হয়ে উঠতো আজ তারা তাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়।”
