বাবর সহসা উপলব্ধি করে ভূমির চড়াই উতরাইয়ের কারণে বাইসানগার শত্রু পক্ষের আগুয়ান বাহিনীকে দেখতে পাবে না। কিন্তু হামলাকারীদের চেয়ে সে নিজে বাইসানগারের নিকটে অবস্থান করছে। সে দ্রুত, ঘোড়া তাজা রয়েছে এমন এক যোদ্ধাকে নির্বাচিত করে। “বাইসানগারকে সতর্ক করে দাও- তাকে বল নিজের অবশিষ্ট বাহিনী নিয়ে সে যেনো সমরকন্দে ফিরে যাবার জন্য সর্বোচ্চ প্রয়াস নেয়। আমার কথা তুমি বুঝতে পেরেছো?”
তরুণ অশ্বারোহী ঢাল বেয়ে দ্রুত নেমে যায়। বার্তাবাহক আক্রমণরত উজবেক বাহিনীর নাগাল এড়িয়ে যেতে পারবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত বাবর সেখানে অপেক্ষা করে। তারপরে সে বাকিদের তার কাছাকাছি অবস্থান করতে বলে নদীর তীরের দিকে ধেয়ে যায় যেখানে ওয়াজির খানের বাহিনী নিজেদের প্রাণ বাঁচাবার মরণপণ লড়াইয়েরত।
আক্রমণকারী উজবেক যোদ্ধাদের সারি যেখানে দুর্বল, বাবর ঘুরে এসে সেখানে হামলা করে। তরবারির আঘাতে নিজের পথ করে নেয়। কিন্তু তার সাথে যে বিশজনের মতো যোদ্ধা ছিলো তাদের ভিতরে কেবল বারোজন ব্যুহ ভেদ করে বের হয়ে আসতে পারে। হতাশাব্যঞ্জক একটা পরিস্থিতি। ওয়াজির খানের বাহিনীকে আদতেই নদীর দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে উজবেকরা। তাদের কেউ ঘোড়ার পিঠে উপবিষ্ট অবস্থায় ক্রমাগত তীর নিক্ষেপ করছে, কেউ বালুময় নদী তীরে ঘোড়ার পায়ের নীচ থেকে সরে যাওয়া বালুর কারণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই হিমশিম খেতে থাকা মানুষ আর ঘোড়ার বিশৃঙ্খল টালমাটাল দঙ্গলের ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতের বাঁকানো তরবারির ধারের সদ্ব্যবহার করে। বাবর ওয়াজির খানকে ভীড়ের মাঝে সনাক্ত করতে পারে না।
বাবর সহসা অনুভব করে তার ঘোড়া থরথর করে কাঁপছে। বাদামী রঙের সুন্দর আজদাহা ব্যাথায় চিৎকার করে উঠে। দুটো তীর একইসাথে গলায় আর ঘাড়ে বিদ্ধ হতে এবং ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শিরা থেকে তাজা লাল রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়ে আসতে বেচারী ইতিমধ্যে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে শুরু করে সজোরে মাটিতে আছড়ে পড়ে। বাবর সময়মত জিন থেকে লাফিয়ে পড়ে বিশাল প্রাণীটার নিচে চাপা পড়ার হাত থেকে বেঁচে যায়। বাবর টলমল করতে করতে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাতে তখনও আলমগীরের বাঁট ধরা। কিন্তু খঞ্জর আর ঢাল কোথায় যেনো ছিটকে পড়েছে। মাতালের মতো টলতে টলতে এবং বাতাসে ক্রমাগত ছোবল দিতে থাকা তরবারির ফলা আর কস্তনীর মতো ঘোড়ার খুরের থাবা এড়িয়ে সে আরেকটা ঘোড়ার আশায় চারপাশে তাকায়।
“সুলতান।” বাবুরী ভূতের মত উদয় হয়, তার মুখ রক্তে আবৃত। চোখে বেপরোয়া দৃষ্টি। পর্যানের উপরে সামনে ঝুঁকে এসে, সে বাবরকে তার বিশাল ধূসর ঘোড়ার পিঠের পেছনে তুলে নেয়।
“নদীর দিকে চলো!” বাবর চিৎকার করে বলে। যতোজন সম্ভব যোদ্ধাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে আরেকদিন যুদ্ধের জন্য বেঁচে থাকাটাই এখন তাদের একমাত্র আশা। তরবারি মাথার উপরে আন্দোলিত করার ফাঁকে সে চারপাশে তার বাকি সেনাপতিদের দিকে তাকায় এবং চিৎকার করে নিজ নিজ বাহিনীসহ নদীর দিকে পিছিয়ে যেতে বলে। ওয়াজির খানকে সে এখনও দেখতে পায় না।
পাহাড়ের বরফ গলতে শুরু করায় নদী এখন কানায় কানায় পূর্ণ। ঘোড়া নিয়ে নদীর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লে দেখা যায় পানি প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর স্রোতও বেশ তীব্র। বাবুরীর ঘোড়া তাদের দুজনের ওজনের কারণে বেশ কষ্ট করে সাঁতার কাটে। তাদের দুজনকে নিয়ে বেচারা কখনও তীরে পৌঁছাতে পারবে না। আলমগীর কোষবদ্ধ করে বাবুরী কিছু করার আগেই সে পিছলে পানিতে নেমে যায়। কিন্তু মাত্র বিশ গজ দূরে অবস্থিত অপর পাড়ের উদ্দেশ্যে সাঁতার কাটতে আরম্ভ করলে একটা শক্তিশালী স্রোতের কবলে পড়ে সে ভাটির দিকে ভেসে যায়।
“সুলতান…” বাবর ওয়াজির খানের কণ্ঠস্বর চিনতে পারে। কিন্তু কানের কাছ দিয়ে বয়ে চলা হিমশীতল পানির স্রোত তাকে নিজের মাঝে টেনে নেবার হুমকি ক্রমাগত দিতে থাকলে সে চারপাশে তাকিয়ে দেখার মতো সময় পায় না। তারপরে সে পানিতে একটা পাতলা শক্তমতো কিছু অনুভব করে। সহজাতপ্রবৃত্তির বশে সে সেটা আঁকড়ে ধরে। জিনিসটা বর্শার হাতলের মতো অনেকটা। নদীর স্রোত এবার তাকে ধারালো পাথরের একটা দৃশ্যমান শিলাস্তরের মাঝে নিক্ষিপ্ত করতে সে বর্শার হাতল পাথরের সংকীর্ণ খাঁজে আটকে দেয়। বাবর এবার হাতলের উপরে ভর দিয়ে। নিজেকে পাথরের কাছে টেনে নিয়ে আসে এবং ক্ষতবিক্ষত আর রক্তাক্ত হাতে সে হাঁপাতে হাঁপাতে নিজেকে পানির উপরে উঠিয়ে নিয়ে আসে।
তার চারপাশের পানিতে বৃষ্টির মতো তীর এসে পড়তে থাকে। নদীর অপর পাড়ে উজবেক তীরন্দাজের দল সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে, পলায়নরত প্রতিপক্ষকে ধুয়ো দেয়, কেউ কেউ আবার তীর ছোঁড়ার মাঝে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করতে থাকে। সে একটা পাথরের পেছনে আড়াল নিতে গিয়ে ওয়াজির খানকে দেখতে পায়। বেচারা তখনও পানিতে নাস্তানাবুদ হচ্ছে। তার কালো ঘোড়ার পাঁজরে আর পাছার দাবনায় কয়েকটা তীর বিদ্ধ হয়েছে এবং আতঙ্ক আর যন্ত্রণায় বেচারার চোখ বড় বড় হয়ে আছে। ওয়াজির খান আপ্রাণ চেষ্টা করে ঘোড়াটাকে তীরের কাছে নিয়ে আসতে। কিন্তু এখনও অর্ধেক পথ বাকি। বাবরের প্রাণ বাঁচিয়েছে যে বর্শা, সেটা কি তারই ছুঁড়ে দেয়া? নিজের বিপদের কথা বিস্মৃত হয়ে, বাবর পাথরের আড়াল থেকে উঠে দাঁড়ায় এবং ওয়াজির খানের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকে। বুড়ো যোদ্ধা চোখ তুলে তাকায়।
