তরবারি উঁচু করে ধরে বাবর ঘামে জবজব করতে থাকা ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয় উজবেকদের মুখোমুখি হবার জন্য। আদতে তাদের সামনে অগ্রগামী হবার বেগ হ্রাস পেয়েছে এবং এখন রেচিত বেগে তারা সামনে বাড়ছে। তাদের ঠিক কেন্দ্রে লম্বা দুটো বেগুনী ঝাণ্ডার মাঝে সে একজন অশ্বারোহীকে সনাক্ত করে, যে কেবল সাইবানি খানই হতে পারে। অনেক দূরে অবস্থান করায় বাবর তার চেহারা ভালো করে বুঝতে পারে না। কিন্তু তার স্পর্ধিত আচরণ তার স্থিরতার ভিতরে কিছু একটা রয়েছে যা চোখে পড়ে। ছয় মাস আগে ঠিক যেমন সমরকন্দ থেকে অবরোধের আশঙ্কায় নিজের বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে আক্রমণের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাবার সময়ে সে দৃষ্টি কেড়েছিল। বাবর তাকিয়ে থাকার মাঝেই সাইবানি খান ধীরে ধীরে অনেকটা অভিবাদনের ভঙ্গিতে বাম হাত উঁচু করে এবং তার যোদ্ধাদের ভিতর থেকে রণহুঙ্কারের একটা তরঙ্গ ভেসে উঠে- এমন একটা শব্দ যা রক্ত শীতল করে ফেলে।
বাবরের যোদ্ধারা প্রত্যুত্তরে চেঁচিয়ে উঠে নিজেদের অবজ্ঞা প্রকাশ করে। কিন্তু তাদের অবজ্ঞা হুমকির মাত্রা লাভ করার আগেই নিজের তরবারির এক ঝাপটায় সাইবানি খান আক্রমণের সঙ্কেত দেয় এবং উজবেক খুরের দাপটে তারা বল্পিত বেগে সামনে এগিয়ে আসতে বাকি সব শব্দ চাপা পড়ে যায়। বাবরের চারপাশে তার লোকেরা একহাতে লাগাম ধরে ঘোড়া শান্ত রাখার পাশাপাশি ঢাল উঠিয়ে আকাশ অন্ধকার করে নেমে আসা তীরের বৃষ্টি ঠেকাতে হিমশিম খেয়ে যায়। বাবরের তীরন্দাজ বাহিনীও চুপ করে বসে না থেকে পাল্টা তীর ছোড়ে। আর সেগুলো লক্ষ্যভেদও করে। কিন্তু উজবেকদের ধেয়ে আসা কালো তরঙ্গের ছন্দময়তায় বিন্দুমাত্র ছেদ পড়ে না। এমনকি তীরের আঘাতে জিন থেকে ছিটকে ধাবমান খুরের নিচে যোদ্ধারা পিষে যেতেও গতির কোনো হেরফের হয় না।
উজবেক বাহিনী আরো কাছে এগিয়ে আসে। “সমরকন্দের জন্য!” বাবর চিৎকার করে উঠে এবং পাল্টা আক্রমণের জন্য ধেয়ে যেতে তার লোকেরা তাকে অনুসরণ করে। নিমেষ পরে, দু’দল যোদ্ধা ধেয়ে আসা দুটো স্রোতের মতো পরস্পরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধাতুর উপরে ধাতুর আপতনের শব্দের সাথে ঘোড়ার চিহি রব আর মানুষের আর্তনাদ, হুঙ্কার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সম্মুখ সমরের চাপ আর বিভ্রান্তির কারণে বলা কঠিন- যে আসলেই কি ঘটছে। কিন্তু কচুকাটার মতো করে ডানে বামে তরবারি চালাবার সময়ে বাবরের মনে হয় তার যোদ্ধারা বুঝি উজবেকদের চেপে ধরছে। ভাবনাটা তার ভিতরে নতুন উদ্যমের জন্ম দিতে সে লম্বা, বর্ম-ধারী এক উজবেকের দিকে ধেয়ে গেলে, তাকে মোকাবেলা করার বদলে সে ঘোড়া নিয়ে পিছু হটে। তার বাহিনীর চেয়ে উজবেক বাহিনীর সংখ্যা অনায়াসে বেশি হবে। কিন্তু চারপাশের পরিস্থিতি দেখে মনে হয় তারা পিছু হটছে। বাবর আর তার অমিত সাহসী যোদ্ধার দল স্থির সংকল্পে সামনে এগিয়ে যেতে উজবেক বাহিনী ডানে বামে ছিটকে যাচ্ছে।
কিন্তু তারপরেও তাকে দেখতে হবে আসল পরিস্থিতিটা কেমন। বাবর তার বাদামী আজদাহার পাঁজরে গুঁতো দিয়ে তার সামনে সহসা উন্মুক্ত হওয়া ফাঁকের ভিতর দিয়ে তাকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। তার আশেপাশের যোদ্ধাদের অনুসরণ করতে বলে সে একটা নিচু আগাছাপূর্ণ টিলার দিকে ঘোড়া হাঁকায়, যা সে যতোটা দেখতে পাচ্ছে- খালি রয়েছে এবং ভালো পর্যবেক্ষণ স্থান হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। সেখানে পৌঁছে সে নিচের যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে তাকায়। লড়াকু, পলায়নপর যোদ্ধাদের মাঝে একটা বিন্যাস তার সামনে আকৃতি লাভ করতে থাকে। সহসা সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠে এবং বাবর নিজের উপরে ক্ষোভে কটুকাটব্য করে উঠে। সে বুঝতে পারে উজবেকরা আসলে কি চাইছে। মোঙ্গলদের একটা প্রাচীন যুদ্ধরীতি তুলুগামার উপরে তারা নির্ভর করছে। সে কেবল পুস্তকে এর কথা পড়েছে কখনও চোখে দেখেনি।
বাবরের লোকদের আক্রমণের মুখে পিছু হটে যাবার ভান করে সাইবানি খানের যোদ্ধারা আসলে ডানে আর বামে দুটো আলাদা দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের ভিতরে তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে বাবরের সেনাবাহিনীর বাম আর ডান বাহু আক্রমণ করে কেন্দ্রের সেনাদলকে অরক্ষিত এবং বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। উজবেকরা এরপরে বাবরের বিচ্ছিন্ন দুই বাহিনী থেকে নিজেদের পৃথক করে নেবে কেন্দ্রে হামলা করার জন্য ব্যুহ তৈরি করতে। কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেয়ার পরে তারা তাদের সহযোদ্ধাদের সাথে পুনরায় যোগ দেবে, পূর্বে বিচ্ছিন্ন সেনাবাহিনীর ডান আর বাম বাহুকে নাশ করতে। ওয়াজির খানের অধীনস্ত যোদ্ধারা বাধ্য হবে নদীর দিকে এগিয়ে যেতে এবং তীরের ঢালু আর বালুময় ভূমিতে আটতে পড়বে। অন্যদিকে বাইসানগারের বাহিনী যদি এখনই পালাতে সক্ষম না হয় তবে তারা পুরোপুরি উজবেক বেষ্টনীর মাঝে আটকে যাবে।
বাবরের পেছন থেকে ভেসে আসা শিঙ্গা ধ্বনিতে যুদ্ধের ডামাডোল চাপা পড়ে যায়। সোয়া মাইল দূরে একটা পাহাড়ের পেছন থেকে উজবেক যোদ্ধাদের একটা বহর দুলকি চালে এগিয়ে আসছে। নেকড়ের পালটা সম্ভবত সেখানে লুকিয়ে অপেক্ষা করছিলো। দলটা নিকটবর্তী হতে কালো চামড়া মোড়া ঢালের উপরে রূপার গোলাকৃতি কারুকাজ দেখে বাবর চিনতে পারে তাদের: সাইবানি খানের দুর্ধর্ষ বাহিনী। তার নিজের গোত্রের, একই রক্ত বহন করা যোদ্ধার দল। বাইসানগারের অধীনস্ত বাহিনীর দিকে তারা এগিয়ে যায়। কোনো সন্দেহ নেই তাদের পালাবার শেষ সম্ভাবনাটুকুও তারা বন্ধ করে দিতে চায়।
