বাবর, ওয়াজির খান, বাইসানগার আর আলী ঘোসত, তার অশ্বারোহী বাহিনীর তিন অধিকর্তাকে আদেশ দেয়। বাবর আর তার অগ্রগামী বাহিনী, বর্শার আকৃতিতে বিন্যস্ত হয়ে বল্পিত বেগে ঘোড়া ছোটায়। তারা পাশ থেকে এসে উজবেকদের যাত্রা পথের কেন্দ্রে আঘাত করবে এবং দ্বিখণ্ডিত করে বের হয়ে যাবার আগে যতোটা সম্ভব ক্ষতি সাধন আর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে। তারপরে আবার বিপরীত দিক থেকে একই ভঙ্গিতে পুনরায় হামলা করবে। উজবেক বাহিনীর মাঝ দিয়ে তাকে তেড়েফুড়ে অতিক্রম করতে দেখামাত্র ওয়াজির খান তার মূল বাহিনী নিয়ে দ্রুত এগিয়ে এসো সৈন্যবাহিনীর সামনের অংশে আক্রমণ করবে। যখন বাইসানগার আরেকটা বাহিনী নিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরে এসে পেছন থেকে উজবেকদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আলী ঘোসতের অধীনে আরেকটা বাহিনী থাকবে অতিরিক্ত হিসাবে।
বাবর এখন তার সামনে অনুচ্চ ভূমিরেখা দেখতে পায় যেখান থেকে নদীটা দেখা। যায়। তার বাদামী আজদাহা ভূমিরেখার উপরে উঠে আসে এবং তার অগ্রগামী রক্ষীদলের সদস্যরা পাশে এসে দাঁড়াতে উজবেক অশ্বারোহী বাহিনীর লম্বা সারি সে দেখতে পায়। তার অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ দলটা নদীর তীর ধরে ধূলোর একটা মেঘ উড়িয়ে এগিয়ে চলেছে। এই ক্ষণটার জন্যই সে এতো প্রস্তুতি নিয়েছে। ঢাল বেয়ে প্রায় বারোশ গজ দূরে, শত্রুর দিকে ধেয়ে যাবার জন্য সে তার বাহিনীকে আদেশ দেয়। সে তার বাহনকে যখন সামনে এগোবার জন্য ইঙ্গিত করেছে ঠিক তখনই বাবর প্রথমবারের মতো এক নিঃসঙ্গ উজবেক অশ্বারোহী, মূল সারি থেকে সামান্য দূরে, সম্ভবত অনাহুত অতিথির উপস্থিতি সম্পর্কে আগেই সতর্ক করার জন্য নিয়োজিত প্রহরীকে দেখতে পায়। লোকটাও তাকে একই সাথে দেখে এবং সাথে সাথে নিরাপত্তার জন্য মূল বাহিনীর উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছোটাবার আগে শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে বিপদ সঙ্কেত ঘোষণা করে।
শিঙ্গার আওয়াজ শোনার সাথে সাথে, উজবেক বাহিনীর গতি মন্থর হয়ে আসে, এবং অশ্বারোহী যোদ্ধারা ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয় বিপদের মোকাবেলা করতে। কেউ কেউ ধনুক নামিয়ে তীরের একটা ঝাপটা বইয়ে দেবার মতো সময় পায় এবং উজবেকদের কাছাকাছি পৌঁছাবার আগেই বাবরের অগ্রগামী রক্ষীদলের কয়েকজন যোদ্ধা মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে। বাবরের নেতৃত্বে বাকি যোদ্ধারা প্রচণ্ড বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে শত্রুর সারিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং চারপাশে এলোপাথাড়ি ঘাই দিতে শুরু করে। উজবেক যোদ্ধাদের সারি পিছু হটতে শুরু করে। মনে হয় যেন। প্রত্যাশিতভাবেই ভাঙছে আর বাবরের মনে হয় বিজয় নিশ্চিত।
কিন্তু তারপরেই উজবেকরা তার সামনে বিক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে ছিটকে সরে যাবার বদলে তাকে তার বাহিনীসহ ঘিরে ফেলতে শুরু করে। বাবর তার তরুণ নিশান বাহককে ঘোড়া থেকে সামনে ছিটকে পড়তে দেখে। বেচারার মাথা উজবেকদের নিজস্ব ধাতব পাতযুক্ত কস্তনীর আঘাতে ছাতু হয়ে গেছে। বাবর তার ঘোড়ার মাথা প্রচণ্ড শক্তি ঘুরিয়ে নিয়ে তরুণ নিশানবাহকের দেহটা এড়িয়ে যায় এবং হাতের বর্শা দিয়ে তার হত্যাকারীকে গেঁথে ফেলে। কিন্তু আরও উজবেক যোদ্ধা মারমুখী ভঙ্গিতে তার দিকে এগিয়ে আসে। বর্শা ফেলে দিয়ে বাবর এবার আলমগীর কোষমুক্ত করে। উজবেক যোদ্ধাদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা আর চাপ তাকে তার দেহরক্ষীদের কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় এবং বুঝতে পারে সে আটকা পড়তে চলেছে। প্রাণে বাঁচতে হলে তাকে এই ব্যুহ ভেদ করে বের হতে হবে। আলগমীর ধরা ডান। হাত সোজা রেখে সে ঘোড়ার গলার উপরে ঝুঁকে আসে এবং তার চারপাশের উজবেক যোদ্ধাদের মাঝে যে সামান্য ফাঁক দেখতে পায় সেদিকে ঘোড়া ছোটায়।
মুহূর্ত পরে, ফাঁকা জায়গায় বেরিয়ে এসে সে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। কপালের উপরের এক কাটা স্থান থেকে রক্ত তার ডান চোখের উপরে গড়িয়ে পড়ে। এক উজবেক যোদ্ধা আরেকটু হলে বর্শা দিয়ে তার মাথা গেথে ফেলেছিল। বাবরের ক্ষিপ্রতা আর আঘাত পাশ কাটাবার দক্ষতা তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এবং যদিও বর্শার। তীক্ষ্ণ মুখ সে এড়াতে পারেনি। কপাল থেকে রক্ত মুছে ফেলার অবসরে চোখে। ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে সে বুঝতে চেষ্টা করে কোনো দিকে গেলে মূল বাহিনীর সাথে মিলিত হতে পারবে।
কয়েক মিনিট পরে তার দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে আসতে শুরু করে। যদিও ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়া তখনও বন্ধ হয়নি। বাবর দ্রুত ঘোড়ার পর্যানের কাপড় থেকে একটা ফালি কেটে নেয় খঞ্জর দিয়ে এবং মাথায় সেটা দিয়ে শক্ত করে পট্টি বেঁধে নেয়। চারপাশে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে তাদের চমকে দেবার অভিপ্রায়ে করা হামলা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং আতঙ্কিত আজদাহা তাকে কোণাকুণি উজবেক আর তার সঙ্গের অবশিষ্ট যোদ্ধাদের মাঝে একটা খালি প্রান্তরে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে। সে আবার একটা সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি নিজেকে আবিষ্কার করে। তার বাদামী ঘোড়ার পেটে গুতো মেরে সে দ্রুত বল্পিত বেগে নিজের বাহিনীর দিকে এগিয়ে যায়। প্রতিটা মুহূর্ত পেছন থেকে তীর বা বর্শা এসে বিদ্ধ হবার আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে থাকে। কিন্তু তার আশঙ্কা অমূলক প্রতিপন্ন হয়।
আলি ঘোসত তার ধুসর ঘোড়ায় উপবিষ্ট হয়ে আদেশ অনুযায়ী নিজের অধিনস্ত অতিরিক্ত সৈন্যদের নিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলো। বাবর সেখানে এসে যোগ দেবার পরে তার সেনাপতিদের সাথে নতুন কোনো পরিকল্পনা আলোচনার করার আর সুযোগ বা সময় কোনোটাই পায় না। বাবর তার পর্যদস্ত ঘোড়ার লাগাম টেনে থামার সময়েও পেছন থেকে ঢালের উপরে তরবারির আঘাতের আওয়াজ আর বুনো চিৎকার শুনতে পায়। আর কয়েক মুহূর্ত উজবেকরা তার বাহিনীর দফারফা করে ফেলবে। আমি এখানের নেতৃত্ব গ্রহণ করছি।” সে চেঁচিয়ে উঠে আলি ঘোসতকে বলে। “উজবেক যোদ্ধার সারি বরাবর ওয়াজির খান আর বাইসানগারের কাছে অশ্বারোহী বার্তাবাহক পাঠান। পূর্বের সব আদেশ তাদের ভুলে যেতে বলেন। উজবেকরা আমাদের তীরন্দাজদের আওতার ভিতরে আসা মাত্র তাদের উপরে নরক নামিয়ে আনতে আদেশ দেন। তারপরে, আমার নেতৃত্বে আমাদের পুরো বাহিনী আক্রমণে যাবে।”
