বাবর পারলে ওয়াজির খানকে দৃষ্টি দিয়ে ভস্ম করে দেয়। সম্ভবত এসব তার জানের শত্রু সেই বুড়ির কাজ বাবুরীর প্রতি এসান দৌলত তার বিতৃষ্ণা বা বাবুরীর সাথে তার মেলামেশার ব্যাপারে নিজের আপত্তির কথা কখনও গোপন করার চেষ্টা করেননি। বাবরের তারপরেই মনে পড়ে ওয়াজির খানের কাছে সে নানাভাবে ঋণী আর সম্প্রতি বুড়ো লোকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। “তৈমূরের রক্তের উত্তরাধিকারী আর একজন সুলতান এই দুটো বিষয় আমি কখনও ভুলবো না। বাবুরীর সঙ্গ আমার ভালো লাগে…কিন্তু তার পরামর্শ আমি গ্রহণ করি কারণ সেগুলো যুক্তিসঙ্গত। আপনার মতোই আমি যা শুনতে চাই বলে সে বিশ্বাস করে সেরকম মন রাখা কথা বলে না…বরং সে নিজে যা বিশ্বাস করে সেটাই কেবল বলে। তার মানে এই না যে সবসময়ে আমি তার সাথে একমত হই… আমি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেই…”।
“আপনার বয়োজ্যেষ্ঠ মন্ত্রণাদাতা হিসাবে আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। হতে পারে বাবুরী বিচক্ষণ, কিন্তু একই সাথে সে বদরাগী আর একটা হামবড়া ভাব তার মধ্যে রয়েছে। আপনি যদি তার সাথে আপনার বন্ধুত্বের ব্যাপারে এখনই সতর্ক না হন, অন্যরা তাহলে নিজেদের অবহেলিত মনে করে ঈর্ষান্বিত আর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে…আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই মাঝে মাঝে আমিও এর উর্ধ্বে উঠতে পারি না…”
ওয়াজির খানের চোখমুখের বিব্রতভাব লক্ষ্য করে বাবর আলতো করে তার কাঁধ স্পর্শ করে। “আপনি আমার সবচেয়ে বড় সহায় এবং অন্যসব ইচকিসের চেয়ে আমি আপনার পরামর্শ বেশি গুরুত্ব দেই। আমি সতর্ক থাকবো…এখন এসব নিয়ে আর শুধু শুধু বিব্রত হবেন না, মন্ত্রণা সভা আহ্বান করেন। তাদের জানা উচিত আমরা পাহাড়ের উপরে কি দেখেছি…”
পায়ের ব্যাথ্যা সত্ত্বেও ওয়াজির খান দ্রুত হেঁটে যায়। বাবর পুনরায় কোলবা পাহাড়ের দিকে তাকায়। কিন্তু কালো অবয়বগুলোকে আর দেখা যায় না। বাবুরীর ব্যাপারে তাকে সতর্ক করে ওয়াজির খানের বলা কথাগুলো কি যথার্থ, নাকি পুরোটাই কেবল তার যে নিজের বয়সী সঙ্গীর প্রয়োজন রয়েছে সেটা বুঝতে ওয়াজির খানের অপারগতা? ঘটনাপ্রবাহ ইতিমধ্যে তাকে দেখিয়েছে যে বাজারের ছেলের মতোই একজন সুলতানের জীবনও যথেষ্ট দৈবাধীন। তৈমূরের মতো সেও যদি সমৃদ্ধি আর সাফল্য অর্জন করতে চায়, তাহলে সবার সম্ভাব্য সাহায্য তার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ এবং সে ব্যাপারে বাবুরীর চেয়ে দক্ষ আর কেউ না…
বাবর দ্রুত তার দরবার কক্ষে প্রবেশ করে। সেখানে সে একটা নিচু টেবিলে তার আদেশে মাদার অব পার্ল দিয়ে সমরকন্দ আর তার আশেপাশের এলাকার মানচিত্র খোদাই করা দেখতে পায়। আধ ঘণ্টা পরে তার মন্ত্রণাদাতাদের সবাইকে টেবিলের চারপাশে বসে থাকতে দেখা যায়।
শহররক্ষা দেয়ালের ভিতরে আক্রমণের অপেক্ষা করার কোনো মানে হয় না। আমাদের বর্তমান লোকবল দিয়ে সাইবানি খানের হামলা প্রতিহত করা সহজ হবে না, বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো অবরোধ আমরা সামলে উঠতে পারবো না। বসন্তের শুরুতে আমরা যদি তাকে গিয়ে আক্রমণ করি নিজের বাহিনী পুরোপুরি গুছিয়ে নেবার আগে, তাহলে আমাদের সফল হবার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যদিও সংখ্যায় তখনও অনেক কম থাকবো। সে যখন একেবারেই আক্রমণের প্রত্যাশা করছে না তখন আমরা তাকে দ্রুত আর প্রবলভাবে আক্রমণ করতে পারি। সে যদি আমি যা ভেবেছি তাই করে, বোখারা থেকে সে সরাসরি আমাদের আক্রমণ করতে এগিয়ে আসে, তাহলে পূর্বদিক থেকে সমরকন্দের দিকে বহমান এই নদী বরাবর এগিয়ে আসলে সেটাই হবে তার দ্রুততম রাস্তা।” বাবর তার সোনার বাঁটযুক্ত খঞ্জরের ডগাটা দিয়ে প্রায় সোজা একটা পথ এঁকে দেখায়। “কিন্তু সমরকন্দে পৌঁছাবার আগে, তার অন্য বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের দিকে আসতে হলে তাকে কোথায় যাত্রাবিরতি করতে হবে…আর আমরা সেই সময়েই তাকে আক্রমণ করবো।”
তার মন্ত্রণাদাতারা সবাই বিড়বিড় করে সম্মতি প্রকাশ করে কেবল বাইসানগারকে উদ্বিগ্ন দেখায়।
“বাইসানগার, কি ব্যাপার…?”
“সাইবানি খানের মতিগতি বোঝা মুশকিল। আমরা তার বিষয়ে যা কিছু জানি তার ভিতরে এটা অন্যতম- সে জন্য আমাদের উপযুক্ত মূল্য দিতে হয়েছে। আমার মনে আছে কিভাবে বর্বরটা তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ভোজবাজির মতো পাহাড় থেকে নেমে এসে আপনার চাচাকে হত্যা করে, আমাদের বাহিনীকে কচুকাটা করেছিলো…”
“আর এজন্যই আমি বোখারায় গুপ্তচর পাঠাচ্ছি। আমি সাইবানি খানকে যেভাবে টোপ দিয়ে সমরকন্দের দেয়ালের ভেতর থেকে টেনে বের করেছিলাম- সেরকম কোনো ফাঁদে আমি নিজে পড়তে চাই না। কিন্তু আমি যখনই নিশ্চিত হবো সে আমাদের আক্রমণ করতে অগ্রসর হচ্ছে, আমি আমার সর্বশক্তি নিয়ে পশ্চিমে এগিয়ে গিয়ে তাকে চমকে দেবো। সে যদি নদীর তীর বরাবর এগিয়ে আসে, তাহলে আমি প্রস্তাব করছি আমরা এখানে তার জন্য ওঁত পেতে থাকবো।” মানচিত্রে সমরকন্দ থেকে ঘোড়ায় তিন দিনের দূরত্বে অবস্থিত একটা স্থানের উপরে বাবর তার খঞ্জরের ডগা রাখে। যেখানে সংকীর্ণ নিচু, পাথুরে পর্বতের মাঝ দিয়ে নদীটা প্রবাহিত হচ্ছে।
***
দশদিন পরে বাবরকে তার লোকদের একেবারে সামনে ঘোড়ায় চড়ে, মন্ত্রণা সভায় সে ঠিক যে জায়গাটার কথা বলেছিলো সেদিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। এক সপ্তাহ আগে তার গুপ্তদূতের দল খবর নিয়ে আসে যে সাইবানি খান তার দলবল নিয়ে এগিয়ে আসছে। সাথে বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী, নদীর দিকে সে এগিয়ে চলেছে। বাবর সমরকন্দে অপ্রত্যাশিত আক্রমণ প্রতিরোধের উপযুক্ত একটা বাহিনী রেখে, তার সেনাবাহিনীকে আদেশ দেয় অগ্রসর হতে। বাবর তার বাহিনী নিয়ে নদী থেকে দূরে অবস্থান করে এবং গুপ্তদূতের দল নদীর তীর ধরে উজবেকদের এগিয়ে আসার খবর তাকে নিয়মিত অবহিত করতে থাকে। সেদিন সকালে তারা খবর নিয়ে আসে যে উজবেক ইতিমধ্যে তাদের রাতের অস্থায়ী ছাউনি গুটিয়ে নিয়েছে এবং তারা যদি তাদের স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে আসা অব্যাহত রাখে তবে আজ দুপুর নাগাদ তারা সংকীর্ণ স্থানটার কাছে পৌঁছাবে।
