“সুলতান, আল্লাহতালা আমাদের প্রতি সদয় হয়েছেন। চিকিৎসক বিছানার কাছে এগিয়ে যায় এবং ওয়াজির খানের মুখ তার হাতের প্রদীপের ক্ষুদ্র আভায় আলোকিত হয়ে উঠে।
তাকিয়ায় ভর দিয়ে সে আধশোয়া হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। কাঁপুনি একেবারেই থেমে গেছে। টিকে থাকা এক চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল আর পরিষ্কার এবং ক্লান্ত মুখে বুঝি একটু হাসির আভাসও দেখা যায়। জ্বর ছেড়ে গেছে। বাবরের এক মুহূর্ত দেরি হয় চোখের সামনের দৃশ্যটার মর্ম অনুধাবন করতে। তারপরেই সে স্বস্তি আর শ্রদ্ধার বাণভাসি জোয়ারে আপ্লুত হয়ে বিছানার কাছে দৌড়ে গিয়ে ওয়াজির খানকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে।
“সুলতান, শান্ত হোন। আমার রোগী এখনও দুর্বল…” হাকিম প্রতিবাদের সুরে চেঁচিয়ে উঠে। তার কথা বাবর শুনতেই পায় না, সে কেবল প্রবল কতজ্ঞতায় ভারাক্রান্ত। ওয়াজির খানের জীবনের উপর থেকে বিপদ কেটে গিয়েছে…
তাকে বিশ্রাম করতে দিয়ে বাবর কক্ষ থেকে বাইরে আসে। শীতল বাতাস সুইয়ের মতো খোলা মুখে হামলে পড়ে কিন্তু সে পাত্তাই দেয় না। অসুস্থতা আর দুশ্চিন্তার মেঘ কেটে যেতে, সে নিজের ভেতরে আপন তারুণ্য আর শক্তির একটা জোয়ার অনুভব করে। আর সেই সাথে তরুণ এবং বেপরোয়া সঙ্গের জন্য সে উদগ্রীব হয়ে উঠে। পূর্ব দিগন্তে সকাল যদিও কেবল দিন শুরুর সব আয়োজন মাত্র আরম্ভ করেছে, সে তখনই বাবুরীকে ডেকে পাঠায়।
কয়েক মিনিট পরে, সদ্য ঘুমভাঙা চোখে ভেড়ার চামড়ার জারকিন বাঁধতে বাঁধতে সে এসে হাজির হয়। এত ভোরে ডেকে পাঠানোর কারণে স্পষ্টতই বিভ্রান্ত বাবর তার মুখ থেকে উষ্ণ নিঃশ্বাসের সাদা কুণ্ডলী নির্গত হতে দেখে। “এসো, অনেক ঘুমিয়েছো…আমরা একটু বাইরে যাচ্ছি।” বাবর তাকে ডেকে বলে।
“কি?…”
“আমার কথা তুমি ঠিকই শুনেছে- এবার চলো অলস কোথাকার…”
দশ মিনিট পরে, সবুজাভ-নীল তোরণদ্বারের নীচ দিয়ে তাদের ঘোড়া ছুটিয়ে বের হতে দেখা যায়। সূর্যের আলোয় রাতের তুষার গলতে শুরু করায় তাদের ঘোড়ার খুরের কারণে গুটি বসন্তের মত দাগ পড়ে মাটির বুকে। যা কিছুই হোক, বেঁচে থাকা আর তারুণ্যের চেয়ে মঙ্গলময় আর কিছুই হতে পারে না।
***
প্রথমে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। বছরের এই সময়ে, ধুসর প্রায় নিপ্রভ আলো মানুষের চোখকে অনায়াসে প্রতারিত করতে পারে। কোলবা পাহাড়ের দিকে বাবর চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকার মাঝেই সে ভাবে সে আরো লোক দেখতে পেয়েছে- হ্যাঁ: সে ঠিকই দেখেছে- দূরের কালো অবয়বগুলো ঘোড়সওয়ারের।
ওয়াজির খানও স্থির চোখে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
“উজবেক…?”
“আমারও তাই মনে হয়, সুলতান। সম্ভবত অগ্রগামী গুপ্তদূতের দল।”
বাবর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয়। গত তিন সপ্তাহ ধরে সমরকন্দে গুজব- প্রথম প্রথম অস্পষ্ট, ভিত্তিহীন তারপরে অনেক বিশদ বর্ণনা- ছড়াতে শুরু করেছে। সবাই দেখা যায় দুটো বিষয়ে একমত যে, সাইবানি খান সমরকন্দের পশ্চিমে বোখারায় অবস্থান করে ভাড়াটে বাহিনী গড়ে তুলছে আর শীতকালটা নিজের লোকদের সাথে একত্রে অতিবাহিত করা সব উজবেক যোদ্ধাকে মোটা পুরষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছেন।
বাবরের আদেশে সমরকন্দের অস্ত্র নির্মাতারা, পুরো শীতকালটা যারা কঠোর পরিশ্রম করেছে, এখন তাদের প্রয়াস বৃদ্ধি করে দিন-রাত নাগাড়ে কাজ করছে। বাতাসে এখন কেবল ধাতুর সাথে ধাতুর আঘাত করার শব্দ ভাসছে। তারা চুল্লীতে তীক্ষ্ণ প্রান্ত বিশিষ্ট ফলা আর বর্শার আকৃতি তৈরি করে সেটা নেহাইয়ে রেখে সেটাতে পান দিচ্ছে। অস্ত্রের কোনো কমতি তার নেই এবং সাধ্যমত চেষ্টা করেছে শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে। কিন্তু মানুষ কোথায় পাবে?
সে ভ্রূকুটি করে। শেষবার গণনা করার সময়ে সংখ্যাটা ছিল সাত হাজার। যার ভিতরে মাঙ্গলিঘ তীরন্দাজ বাহিনীও রয়েছে যারা পুরোটা শীতকাল শহরেই অতিবাহিত করেছে। উজবেকরা আক্রমণের পাঁয়তারা করছে জানার পরেই সে এই অঞ্চলের অন্য সর্দারদের কাছে দূত পাঠিয়েছে- এমন কি তামবাল আর জাহাঙ্গীরের কাছেও সে লোক পাঠিয়েছে। সমরকন্দের পতনের পরে তাদের সেনাবাহিনী আকশি ফিরে গিয়েছে- সম্মিলিতভাবে সাধারণ শত্রুকে প্রতিহত করার আবেদন জানিয়ে। এখন পর্যন্ত কারো কাছ থেকে কোনো উত্তর আসেনি।
“ওয়াজির খান, আমি উজবেকদের ফিরে আসতে দেখে মোটেই অবাক হচ্ছি না। আমি জানতাম তাদের ফিরে আসাটা কেবল সময়ের ব্যাপার। আপনি যখন অসুস্থ ছিলেন তখন বাবুরী আর আমি প্রায়ই বিষয়টা নিয়ে আলাপ করতাম…”
“আর সেই বাজারের ছোকরা কি বলতো?”
ওয়াজির খানের কণ্ঠের অপ্রত্যাশিত রুক্ষতায় বাবর অবাক হয়। “হতে পারে সে বাজারের ছেলে, কিন্তু তারপরেও তার কথায় যুক্তি আছে…এবং সে সমরকন্দ আর এর লোকদের ভালো করেই চেনে…”।
“সুলতান, তার ভুলে গেলে চলবে না সে কে, এবং আপনার ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য…আপনি হলেন আমাদের সরতাজ…তার মতো একজন ভুইফোড়ের সাথে আপনি পরামর্শ করছেন বয়োজ্যেষ্ঠ, বিজ্ঞ আর অভিজাত-বংশীয় কাউকে। বিবেচনায় না এনে সেটা ভালো দেখায় না…আল্লাহতালা যদি আপনার পিতার হায়াত দরাজ করতেন তাহলে এসব কথা তিনিই আপনাকে বলতেন…”
